মুম্বই থেকে আহমেদাবাদগামী বিমানে প্রবল হট্টগোল। দু'একটা শব্দ বাদে মারাঠি বোধগম্য হয় না। কিন্তু বার কতক একখানা নাম শোনার পর বুঝতে অসুবিধে হল না যে, গণ্ডগোল বাঁধিয়েছেন অভিষেক শর্মা! বলা হয়নি। যে দুই মধ্যবয়সীর মধ্যে অভিষেককে নিয়ে বিতণ্ডা বেঁধেছে, তাঁরা দু'জনেই ভারতীয় টিমের জার্সি পরহিত। মুম্বইয়ে সেমিফাইনাল দেখে আহমেদাবাদ ঢুকছেন। এবং ভাবগতিক দেখে বুঝলাম, দু'জনেই অভিষেককে নিয়ে অত্যধিক অসন্তুষ্ট।
অবশ্য অভিষেক খেলছেন যা, তাতে এ মুহূর্তে তাঁকে নিয়ে ক্রিকেট জনতার রুষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। সত্যি, ক্রিকেট এক মায়াদয়াহীন খেলা বটে! বিশ্বকাপ পূর্ববর্তী সময়ে যে দুইকে টুর্নামেন্টে টিমের সবচেয়ে বিশ্বস্ত 'সেনানী' দেখাচ্ছিল, মহাশক্তি লাগছিল, তাঁরাই অদৃষ্টের পাকেচক্রে পড়ে টিমের কাছে দুই মূর্তিমান 'আতঙ্ক' হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গৌতম গম্ভীররা স্বীকার করুন কিংবা না করুন, পাড়ার পঞ্চাও জানে যে, রবিবার নিউজিল্যান্ড ফাইনালে ভারতের দুর্ভাবনা কারা? না। ফিন অ্যালেন কিংবা টিম সাইফার্ট নন। তাঁরা-অভিষেক এবং বরুণ চক্রবর্তী!
আহমেদাবাদে এসে শুনলাম, আড়াই বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ান ডে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে টিম যে হোটেলে উঠেছিল, এবার সেখানে ওঠেনি। অন্য হোটেল নিয়েছে। কেন, তা চন্দ্রগ্রহণের কারণে ট্রেনিং পিছনোর পর বুঝতে সময় লাগে না! কিন্তু এত করেও ফাইনালের আগে টিমের দুই পথ হারানো পথিককে সাফল্য-সড়কে ফিরিয়ে আনা যাবে তো? ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চার ওভারে ৬৮ রান দিয়ে মাত্র এক উইকেট পেয়েছেন বরুণ! নামের পাশে রহস্য স্পিনার ইচ্ছে করেই লিখলাম না। কারণ টুর্নামেন্ট যত এগোচ্ছে, রহস্য-উন্মোচন বারবার হয়ে যাচ্ছে। ভাবা যায়, গত চার ম্যাচে ১৯০ রান দিয়েছেন তিনি।
জনপ্রিয় মতবাদ হল, আহমেদাবাদে ফাইনালে বরুণকে বসিয়ে কুলদীপ যাদবকে খেলানো হোক। আহমেদাবাদের মাঠ বড়। বরুণের ফর্ম বাদেও কুলদীপকে খেলালে লাভ বেশি। তবু তামিলনাড়ু স্পিনার প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। ঐচ্ছিক ট্রেনিং সেশনও ছাড়ছেন না। কিন্তু অভিষেক? না আসছেন, তিনি ঠিকমতো নিত্য ট্রেনিংয়ে। না মাঠে করছেন কিছু। উল্টে বাউন্ডুলে সমস্ত শট মেরে রোজ আউট হচ্ছেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পুনারয় কুৎসিত শটে আউট হওয়ার পর ক্ষোভ-বিক্ষোভের উদ্গীরণ ঘটে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভারতীয় সমর্থকরা পর্যন্ত রেগে কাঁই হয়ে লিখে দিয়েছেন, অভিষেক ব্যাটার নন, পরিষ্কার 'স্লগার'। লিখে দিয়েছেন, এর পরেও কেন রিঙ্কু সিংকে ভাবা হবে না?
এ হেন অবস্থায় যে কোনও টিম সাধারণত যা করে, ভারত তাই করছে। গত রাতে অভিষেককে নিয়ে ওয়াংখেড়েতে সঞ্জু স্যামসন বলে যান, "কয়েকটা ছয় পেয়ে গেলেই অভিষেক পুরনো ফর্মে চলে আসবে।" বরুণকে নিয়ে আবার অক্ষর প্যাটেল বললেন, "বরুণ এখনও এক নম্বর টি-টোয়েন্টি বোলার। কে বলতে পারে, ফাইনালেই পুরনো বরুণকে দেখতে পাবেন না?" তা, সঞ্জু বা অক্ষরের বক্তব্য নয়, ইন্টারেস্টিং বিষয় সঞ্জু এবং অক্ষর স্বয়ং। মনে রাখা ভালো, সহঅধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও, টিম থেকে ক'দিন আগে বাদ পড়তে হয়েছিল অক্ষরকে। আর সঞ্জুর ভাগ্যের 'নাগরদোলা' নিয়ে নতুন কিছু আর লেখার নেই। না হে, ক্রিকেট শুধু মায়াদয়াহীনই নয়, মজাদার খেলাও বটে। এ খেলা কখন যে কাকে আকাশে তোলে আর কাকে পাঠায় পাতালে, বিধাতা পর্যন্ত বুঝতে পারেন না। মনুষ্য তো সেখানে নস্যি মাত্র!
