নামটা শুনলে চমৎকৃত লাগবে। গম্ভীর (Gautam Gambhir) যাঁদের বিশ্বজয় উৎসর্গ করে গেলেন, তাঁরা ভারতীয় ক্রিকেটের দুই মহীরূহ। প্রথমজন, কোচের চেয়ারে গম্ভীরেরই পূর্বসূরি রাহুল দ্রাবিড়! দ্বিতীয় জন, জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রধান ভিভিএস লক্ষ্মণ! ভারতীয় ক্রিকেটের সাপ্লাইলাইন সরবরাহের দায়-দায়িত্ব যাঁর হাতে।
রবিবার বিশ্বজয় সম্পন্ন করে সাংবাদিক সম্মেলনে গম্ভীর বলছিলেন, “আমি রাহুল ভাইকে এই ট্রফি উৎসর্গ করতে চাই। কারণ, দায়িত্ব ছাড়ার আগে ও একটা দারুণ টিম তৈরি করে রেখে গিয়েছে। যে কারণে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশেষ সমস্যায় পড়তে হয়নি। একই রকম ভাবে বলব, ভিভিএসের কথাও। কারণ, ভারতীয় ক্রিকেটের আগামী দিনের প্রতিভা তুলে আনার কাজটা ভিভিএসই করে। সবার অলক্ষ্যে। অন্তরালে থেকে। সবাই হয়তো ওর কথা জানতে পারে না। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটকে আজ যে জায়গায় দেখছেন, তার নেপথ্যে ভিভিএসের অবদান অপরিসীম। তৃতীয়ত, আরও একজনের কথা বলব এখানে। যাকে আমি আলাদা করে ধন্যবাদ দিতে চাই। জয় ভাই (আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ)। মনে আছে, আমার যখন খারাপ সময় চলছিল, উনি আমাকে ফোন করে উৎসাহ দিয়েছিলেন। ওঁর কথা আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না। ভারতীয় ক্রিকেটে জয় ভাইয়ের অবদান বিশাল।”
কিন্তু কতটা ছিল দ্রাবিড়ের জুতোয় পা গলানো? এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বিশ্বজয়ী হয়েছিল ভারত। তাই গম্ভীর কোচ হয়ে আসার পর তাঁর সামনে সাফল্য শর্ত একটাই ছিল–বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রশ্ন শুনে ভারতীয় কোচ বললেন, ‘‘দেখুন, আমি আর রাহুল ভাই সম্পূর্ণ দু’জন আলাদা মানুষ। রাহুল ভাই এক রকম প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সাফল্য পেয়েছে। আমি আর এক পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। একটা কথা বলতে পারি। আমি কখনও ১৬০-১৭০ রানের ক্রিকেট খেলতে চাইনি। কারণ, তা আপনাকে কোথাও পৌঁছে দেবে না। আমরা চেয়েছিলাম, হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ড ক্রিকেট খেলতে। অর্থাৎ, ঝুঁকি থাকবে খেলায়। ঝুঁকি নেবও আমরা। তাতে যদি ম্যাচ হারতে হয়, অসুবিধে নেই। একশো অলআউট হয়ে গেলে আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ক্রিকেট আমরা খেলতে পারছি কি না? কারণ ঝুঁকি নিলে তবেই আপনি আড়াইশো তোলার কথা ভাবতে পারবেন। যা আমরা সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে পরপর করেছি।”
তবে দীর্ঘ সাংবাদিক সম্মেলনে একটা বিষয় বলে গিয়েছেন গম্ভীর। যা নিয়ে পরে বিতর্ক বাঁধলেও বাঁধতে পারে। ভারতীয় কোচ এ দিন রাতে রীতিমতো আহ্বান করে যান দেশজ ক্রিকেটে তারকা প্রথার অবসান ঘটাতে। ব্যক্তিগত কীর্তি নিয়ে নাচানাচি থামাতে। গম্ভীর বলে যান, “আমার কাছে ব্যক্তিগত মাইলস্টোন গুরুত্ব পায় না। মাইলস্টোন নিয়ে কথা বলা অনেক হয়েছে। আপনাদেরও বলব, মাইলস্টোন নিয়ে উৎসব করা বন্ধ করুন। বরং উৎসবটা ট্রফি জেতাকে ঘিরে হোক। দেখুন, দিন শেষে আপনি ক’টা ট্রফি জিতলেন, সেটাই আসল। ক’টা ব্যক্তিগত কীর্তি গড়লেন, তা নয়। সঞ্জুর ইনিংসটাই ধরুন উদাহরণ হিসেবে। ও যদি নিজের সেঞ্চুরি নিয়ে ভাবতে যেত, আমরা পারতাম আড়াইশো তুলতে? পারতাম না। আমার মতে, ছিয়ানব্বইয়ে দাঁড়িয়ে কোনও ক্রিকেটার যদি চারটে বল নেয় সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে, তা হলে তার কারণে টিমের অন্তত কুড়িটা রান কম হচ্ছে। আর সেই কুড়িটা রানই কিন্তু দিন শেষে ট্রফি জেতা আর না জেতার মধ্যে তফাত গড়ে দেয়। আমার ড্রেসিংরুমে যে সেঞ্চুরি করছে আর দলের স্বার্থে ছিয়ানব্বই করে আউট হচ্ছে, দু’জনের গুরুত্বই সমান। আর এটা মুখে বললে হয় না। মুখে তো কত কিছুই বলা হয়ে থাকে। কাজে করে দেখাতে হয়।”
কাকে বা কাদের উদ্দেশ্য করে কথাটা গম্ভীর বললেন, সরাসরি বলেননি। কিন্তু সর্বভারতীয় মিডিয়া দু’টো নাম পাচ্ছে–বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা! বলাবলি চলছে, বিশ্বজয়ের দিনে পরোক্ষে তাঁদেরই কথা শুনিয়ে গেলেন না তো গম্ভীর?
