শঙ্কা ছিল, বস্টন থেকে দিল্লি এলেই অভিজিৎ দিপকে-কে পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। আশঙ্কার কথা অভিজিৎ নিজেই জানিয়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে। ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, ‘কে জানে, হয়তো দেশে ফিরলে তিহার জেল হবে আমার ঠিকানা।’ যেদিন দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন, সেদিনও লেখেন, ‘ভারতে যাচ্ছি। দেশের সংবিধানের হাতে নিজের ভাগ্য সঁপে দিয়েছি।’ সুখের কথা, তাঁর শঙ্কা সত্য হয়নি। অভিজিৎ যন্তর মন্তরে গিয়েছেন। পুলিশ তাঁকে বাধা দেয়নি।
প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশের পর মহারাষ্ট্রে নিজের বাড়িতে গিয়েছেন। তার আগে জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা না দিলে আগামী শনিবার আবার তাঁরা বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন। অভিজিতের শঙ্কা একেবারে অমূলক ছিল না। শাসক দল সচেষ্টও ছিল। বিভিন্ন নেতা বলাবলি করেছেন, অভিজিৎদের তৈরি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র (সিজেপি) নেপথ্যে পাকিস্তানি মদত রয়েছে। টাকাকড়ি দিয়ে সাহায্য করছেন মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরস, যিনি নাকি ভারতের অগ্রগতি স্তব্ধ করে দিতে চান। মদতদারেরা চায় জেন জি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক। সরকার দুর্বল হোক। নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো। আরশোলাদের রুখতে তাই দিল্লি হাই কোর্টে মামলাও রুজু হয়। যদিও লাভ হয়নি।
অচেনা, অজানা মহল থেকে অপ্রত্যাশিত কেউ বা কারা উঠে এসে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানালে এদেশের রাজনীতিকেরা অনেক কিছু কল্পনা করে নেন। প্রথমেই একটা চক্রান্ত তত্ত্ব খোঁজা হয়। সেটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা গেলে প্রয়োগ করা হয় কোনও না কোনও কালা কানুন, যাতে ধরা হলে পড়লে ৫-৬টা বছর কারাগারের অন্তরালে থাকাটা কোনও ব্যাপার নয়। অভিজিৎদের সৌভাগ্য, এখনও তেমন বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়নি।
সরকার অস্বীকার করতে পারে, তবে কর্মসংস্থানের হাল মোটেই মনগড়া নয়। ‘আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়’ তাদের ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’-র সর্বশেষ রিপোর্টে দেখাচ্ছে– দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ৩৭ কোটি ৭০ লাখ।
না-হওয়ার কারণ সম্ভবত আরশোলাদের প্রতি সামাজিক মাধ্যমে উপচে পড়া সমর্থন। ওই সমর্থনই প্রথম দিকে সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নইলে সিজেপির ‘এক্স’ হ্যান্ডল ব্লক করা হত না। ‘পাকিস্তান-সোর্স চক্রান্ত তত্ত্ব’ প্রচার করা হত না। নতুনভাবে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর মাথাচাড়া দেওয়ার জুজু দেখানো হত না।
কিন্তু তা সত্ত্বেও দেখা গেল, দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি দিল। কাউকে গ্রেপ্তার করা হল না। এই সুবুদ্ধির একটা কারণ, আরশোলা আন্দোলনের আন্তর্জাতিকতা। ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ায় কিছু অসন্তোষ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে সম্প্রতি বিদেশে তার মোকাবিলাও করতে হয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আরশোলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে, সমাবেশে বাধা দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। দ্বিতীয় কারণ দলেরই একাংশের পরামর্শ, যাঁরা মনে করেন, গণতন্ত্রে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া দরকার। প্রথমেই কড়া ব্যবস্থা না নিয়ে দেখা দরকার আন্দোলন কোনদিকে গড়ায়।
ওই মহল সরকারকে এই পরামর্শও দেয়, নির্ভয়া কাণ্ড বা আন্না হাজারের ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ আন্দোলন শুরু হতেই তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের হাঁটু কেঁপে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিয়ে সরকার তার দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলেছিল। সেটা ছিল মারাত্মক ভুল। মোদি সরকারের তেমন কোনও ভুল করা ঠিক হবে না। সবচেয়ে বড় যুক্তি ছিল, ‘নিট’-এর পেপার লিক ও সিবিএসই-র রেজাল্ট কেলেঙ্কারি নিয়ে বিরোধীরা এখনও তেমন জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। আরশোলাদের সমর্থনেও তারা এগচ্ছে না। তারাও জল মাপতে চাইছে। কাজেই সরকারের উচিত অপেক্ষায় থাকা। পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করা। পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
এই তথ্যের বিপরীতে রয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম’ ও ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বডার্স’–এর পরিসংখ্যান, যা দেখাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫৭!
ভারতীয় গণতন্ত্র, সমাজ ও তার অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে পশ্চিমি পরিহাস হল, আপনি যে পরিসংখ্যানই দাখিল করুন না কেন তার বিপরীতটাও একইরকম সত্য। এই যেমন, সরকার বারবার বলে আসছে মোদি জমানায় ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি হয়েছে, আর কিছু বছরের মধ্যেই তৃতীয় হবে। এই দাবি মোটেই অসত্য নয়। ভারতের বিশালত্ব, তার মোট গড় উৎপাদন হিসাবে আনলে সেটা সত্যিই। ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল’-এর (আইএমএফ) কাছে তা স্বীকৃতও। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্যি, আইএমএফের হিসাবে মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বে ভারতের অবস্থান ১৪৯! মাথাপিছু খরচের হিসাবে আরও নিচে।
দুই সত্যের কোনটি আপনি কোনভাবে দেখবেন আপনার ব্যাপার। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিকটাও তেমনই। দেশে নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার। বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত প্রভাতী দৈনিক প্রায় ১০ হাজার। সম্মিলিত প্রচারসংখ্যা দৈনিক প্রায় ২৪ কোটি। এই ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। সরকারি ও বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল রয়েছে ৯ শতাধিক। ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল ৩ হাজার ৭০০। সরকারি ভাষ্য, দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে এত সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম থাকে কী করে?
এই তথ্যের বিপরীতে রয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম’ ও ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বডার্স’–এর পরিসংখ্যান, যা দেখাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫৭! কোনটা আপনি গ্রহণ করবেন আপনার বিষয়। বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি হওয়ার দাবি কিংবা মাথাপিছু আয়-ব্যয়ের নিরিখের অবস্থান যাকেই গুরুত্ব দিন, সত্যি হল দেশের বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। বেকারত্বের গহন কালো মেঘের মধ্যে বজ্রপাত ঘটাচ্ছে ‘নিট’-সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসই রেজাল্ট কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা এবং সেজন্য কারও দায় গ্রহণ না করা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে এই অনাচার বাড়ছে বই কমছে না। অথচ মন্ত্রীরা আপাত নির্বিকার। সেই নির্বিকার ভাব ও দায়গ্রহণে অনিচ্ছা যুব সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। দেশের প্রধান বিচারপতির আলটপকা মন্তব্য, বেকারদের ‘আরশোলা ও পরজীবী’ বলা, ক্ষোভের সেই আগুনে ঘৃতাহুতি।
দেশের জনসংখ্যার গড় বয়স এখন ২৯.২। ৭০ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। অথচ কর্মহীনতার হাহাকার দেশজুড়ে। কেন্দ্র ও রাজ্যে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের দখল এমনই যে, গত ১২ বছরে সরকার বিরোধী কোনও আন্দোলন দানা বাঁধেনি।
যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দেশের বিরোধী দলগুলির করার কথা, সরকারের হুঁশ ফেরানোর যে দায়িত্ব বিরোধীদের নেওয়া উচিত ছিল, সেই কাজ কোনও এক অজ্ঞাতকুলশীল অভিজিৎ দিপকে করে দেখালেন। যুব সমাজকে তিনি আন্দোলিত করতে পেরেছেন। এটা বিরোধীদের ব্যর্থতাই শুধু নয়, শাসক ও বিরোধীদের প্রতি যুব সমাজের অনাস্থারও প্রকাশ।
সরকার অস্বীকার করতে পারে, তবে কর্মসংস্থানের হাল মোটেই মনগড়া নয়। ‘আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়’ তাদের ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’-র সর্বশেষ রিপোর্টে দেখাচ্ছে– দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ৩৭ কোটি ৭০ লাখ। এরা দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে ২৬ কোটি ৩০ লাখের অবস্থান শিক্ষার আলোকবর্তিকার বাইরে। যাঁরা শিক্ষিত, ডিগ্রিপ্রাপ্ত, গত পাঁচ বছরে তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করা যায়নি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি শিক্ষিত ও স্নাতকদের ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২০ শতাংশ বেকার। যাঁরা বেকার নন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে তাঁদের বেতন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দেশের জনসংখ্যার গড় বয়স এখন ২৯.২। ৭০ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। অথচ কর্মহীনতার হাহাকার দেশজুড়ে। কেন্দ্র ও রাজ্যে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের দখল এমনই যে, গত ১২ বছরে সরকার বিরোধী কোনও আন্দোলন দানা বঁাধেনি। হাহাকার দূর না করে, হতাশার মেঘ না কাটিয়ে এক শ্রেণির বেকারদের ‘আরশোলা ও পরজীবী’ বলা ছিল ক্ষতের উপর নুনের ছিটে। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ মার্ক ব্লাউগ ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য কজেস অফ গ্র্যাজুয়েট আনএমপ্লয়মেন্ট ইন ইন্ডিয়া’-য় স্নাতক বেকারদের উচ্চহারের যে কারণগুলি ব্যাখ্যা করেছিলেন, সেই থেকে দেশ এখন অনেক এগিয়েছে। এখন বছরে স্নাতক হচ্ছে ৫০ লাখ। চাকরি জুটছে ২৮ লাখের!
যে আন্দোলন বিরোধীদের করার কথা, সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছে ‘আরশোলা’-রা। হতাশগ্রস্ত জেন-জি বেপরোয়া হলে ক্ষতি দেশেরই।
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com
