বিষ্ণুপুরের তরুণ বিপ্লবী সুরেন কর ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯১৬ সালে গ্রেফতারের পর পুলিশি হেপাজতে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু সে-সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি পুলিশি হেপাজতে মৃত্যুবরণকারী প্রথম দিকের বিপ্লবীদের অন্যতম হিসাবে স্মরণীয়। ১৪ জুলাই ছিল তাঁর ১২৯ তম জন্মবর্ষ। লিখছেন, বিশ্বজিৎ সরকার।
পুলিশি হেপাজতে এনকাউন্টারে মৃত্যু নিয়ে রাজ্য-রাজনীতি সরগরম। পুলিশি হেপাজতে মৃত্যু নতুন নয়, তবে এনকাউন্টারে মৃত্যু–এ রাজ্যে বিরল ঘটনা। পুলিশের হেপাজতে থাকাকালীন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানাই যায় না। তাই হইচই বিশেষ হয় না। তবে ১৯৮৪ সালে গার্ডেনরিচ এলাকায় ডি. সি. বিনোদ মেহেতা হত্যার মূল আসামি ইদ্রিস মিয়ার পুলিশি হেপাজতে মৃত্যু নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল সেই সময়কার রাজনীতিতে। পুলিশি অত্যাচারের ফলেই যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, সে-কথা কোনও কোনও পুলিশকর্তা আড়ালে স্বীকারও করেছিলেন।
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলায় পুলিশি হেপাজতে মৃত্যুর ঘটনা বিশেষ জনসমক্ষে আসত না। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী বাংলায় প্রথম পুলিশি হেপাজতে মৃত্যুর ঘটনাটি জনসমক্ষে আসে ১৯১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর। যদিও ব্রিটিশ পুলিশ এই মৃত্যুকে আত্মহত্যার ঘটনা বলে বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর কারণ যাই থাকুক না কেন, পুলিশের হেপাজতে থাকালীন যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল– এটা ঐতিহাসিক সত্য। সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী সুরেন কর। গত ১৪ জুলাই তাঁর ১২৯ তম জন্মবর্ষ পেরিয়ে গেল (১৮৯৭)। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত তামাক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। বিষ্ণুপুরের তামাক শিল্পের অন্যতম স্থপতি ছিলেন ঢেলাদুয়ার নিবাসী গঙ্গানারায়ণ ধর। তাঁর দুই পুত্র পতিচরণ কর ও কেশবচন্দ্র করের সুপরিচালনায় অম্বুরি তামাক ব্যবসা প্রসিদ্ধি লাভ করে সমগ্র বাংলায়। এই কেশবচন্দ্র করের ষষ্ঠ সন্তান সুরেন কর। ১৯১৪ সালে বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাস করে কলকাতায় পড়তে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের বিএসসি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর থেকেই বাঁকুড়ায় যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি, শ্রীসঙ্ঘের প্রচার ও প্রসার হতে থাকে। বাঁকুড়া জেলার বর্তমান রানিবাঁধ থানার অন্তর্গত ছেঁদাপাথর এলাকায় বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, নরেন গোস্বামী, বিভূতি সরকার প্রমুখ বিপ্লবীরা বন ও পাথর ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে গুপ্ত এলাকা গড়ে তোলেন।
১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনও এক ভোরে পুলিশ তাঁদের হোস্টেল অভিযান করে। সুরেন করের বাক্সপ্যাঁটরা সার্চ করে পুলিশ একটি পিস্তলের সন্ধান পায়। আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অপরাধে পুলিশ তাঁকে হেপাজতে নেয়। পরে তাঁকে দুর্গম এবং জল-জঙ্গলে ঘেরা কাকদ্বীপের ডেটিনিউ ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কয়েক মাস বন্দি থাকার পর একদিন সুরেন করের দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। দিনটি ছিল ১৯১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর, বাংলার ১৩২৩ সালের ২৩ শে অঘ্রান।
খোদ বিষ্ণুপুরে রাজনৈতিক দলের অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেও ডাক লুটের ঘটনা ঘটে। এই রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে সম্ভবত ছাত্র অবস্থাতেই যুগান্তর দলের সংর্স্পশে আসেন এই তরুণ। কলকাতা আসার পর বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সংর্স্পশ গাঢ় হয়। তাঁদের হোস্টেলে আসতেন বিপ্লবী নেতারা। পুলিশের নজরে আসে সেই ঘটনা। পরিবারও জানতে পেরে ছেলেকে সংসারী করার জন্য মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তাঁর বিবাহ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেন। পারিবারিক উদ্যোগে মা সারদার কাছে তিনি দীক্ষিতও হন। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির সংস্পর্শ ত্যাগ করেননি। ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনও এক ভোরে পুলিশ তাঁদের হোস্টেল অভিযান করে। সুরেন করের বাক্সপ্যাঁটরা সার্চ করে পুলিশ একটি পিস্তলের সন্ধান পায়। আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অপরাধে পুলিশ তাঁকে হেপাজতে নেয়। পরে তাঁকে দুর্গম এবং জল-জঙ্গলে ঘেরা কাকদ্বীপের ডেটিনিউ ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কয়েক মাস বন্দি থাকার পর একদিন সুরেন করের দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। দিনটি ছিল ১৯১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর, বাংলার ১৩২৩ সালের ২৩ শে অঘ্রান। ঘটনাটি সেই সময় যথেষ্ট সাড়া ফেলে।
এই মৃত্যু সারদা মায়ের মধ্যেও যথেষ্ট রেখাপাত করে। সারদা সংশ্লিষ্ট বইপত্রে তার পরিচয় মেলে। ‘শতরূপে সারদা’, স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ সম্পাদিত ‘শ্রীশ্রী মায়ের পদপ্রান্তে’ এবং কিছু পত্রপত্রিকায় তার সাক্ষ্য আছে। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে মায়ের কাছে দীক্ষা নিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র দীনেশ দাশগুপ্ত (স্বামী নিখিলানন্দ)। বৈপ্লবিক কার্যকলাপের অভিযোগে এই বছর আগস্ট মাসে দু’-বছরের জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে তাঁকে অন্তরিন করে রাখা হয়। ওই একই স্থানে অন্তরিন ছিলেন মায়ের মন্ত্রশিষ্য সুরেন কর। বন্দিজীবনের কঠোরতা সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বযুদ্ধের অবসানে মুক্তিপ্রাপ্তির পর মায়ের সঙ্গে দেখা করলে মা দীনেশ দাশগুপ্তর কাছে পুলিশি নির্যাতন সর্ম্পকে খোঁজখবর নেন। সুরেন করের আত্মহত্যার খবরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মা বলেন– 'হে ঠাকুর আর কতদিন তুমি এই সরকারের অনাচার সইবে?’ (‘শতরূপে সারদা’, পৃষ্ঠা. ৪৬৪ ) পুলিশি অত্যাচারের ফলে এই আত্মহত্যা– এই অনুমানের সত্যতা বাঁকুড়ার অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরেশ্বর ঘোষের ‘চলার পথে’ বইয়ে উল্লেখ। স্মৃতিচারণমূলক এই গ্রন্থে তিনি লিখছেন– ‘সেই সময় বিষ্ণুপুরে আমার কাকারা এবং সমবয়সী আরো অনেকে মিলে যুগান্তর পাটির একটি শক্তিশালী শাখা গড়ে তোলেন। এঁদের সাথে বিখ্যাত বিপ্লবী অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় ছিল এবং সম্ভবত নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (পরবর্ত্তী কালে মানবেন্দ্রনাথ রায় ) সে সময়ে একবার বিষ্ণুপুরে এসেছিলেন...। সেই সময় যুগান্তর পাটির ছেলেরা একটি বন্দুক চুরি করে এবং আমার দুই কাকাও অন্য কয়েকজনের সঙ্গে বন্দুক চুরির অভিযোগে ধরা পড়েন। তিন চার মাস পরে প্রমাণাভাবে মামলাটি খারিজ হয় এবং সবাই মুক্তি পান। তাঁদেরই একজন সহকর্মী, বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত কর পরিবারের সুরেন কর প্রেসিডেন্সি কলেজের হোস্টেলে থাকাকালীন সেখানে ধরা পড়েন ও বন্দি অবস্থায় মারা যান। কী করে বা কীসে তিনি মারা যান– তা বলতে পারছি না, তবে তাঁর উপর বন্দি অবস্থায় প্রচণ্ড নির্যাতন হয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তাঁর এই মৃত্যুর সঙ্গে এই নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সর্ম্পক ছিল।’
এই মৃত্যু সারদা মায়ের মধ্যেও যথেষ্ট রেখাপাত করে। সারদা সংশ্লিষ্ট বইপত্রে তার পরিচয় মেলে। ‘শতরূপে সারদা’, স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ সম্পাদিত ‘শ্রীশ্রী মায়ের পদপ্রান্তে’ এবং কিছু পত্রপত্রিকায় তার সাক্ষ্য আছে।
ওই সময়ের রাজনীতিতেও এই নিয়ে চাঞ্চল্য শুরু হওয়ায় সরকারি ভাবে পুলিশ বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার এক অধিবেশনের প্রশ্নোত্তরে রাষ্ট্রসচিব এই মৃত্যুকে আত্মহত্যার ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। ১৯১৮ সালের ৫ জুলাই এই বিবৃতি প্রকাশিত হয় ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-য় (সূত্র ‘The Roll Of Honour-Kali Charan Ghosh’)।
তিনি রাজবন্দি ছিলেন এবং কাকদ্বীপে অন্তরিন থাকার সময় তাঁর মৃত্যু হয়, এই ঘটনা সর্বজন স্বীকৃত। এই তথ্যকে সামনে রেখে তাঁর ভাইপো, শহিদ সুরেন করের ন’-দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ করের পুত্র সমীরকুমার কর নানা তথ্য সহযোগে নয়ের দশকে বিষ্ণুপুর মহকুমা তথ্য ও সাংস্কৃতিক বিভাগে এই ঘটনা জানান। ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে বিষ্ণুপুর মহকুমা তথ্য ও সাংস্কৃতিক বিভাগ সমীরকুমার করের তথ্যের ভিত্তিতে সুরেন কর-কে মরণোত্তর সম্মানে ভূষিত করেন। সমীর কর জীবিত। বেশ কিছু নথি আজও তাঁর কাছে মজুত।
