বনভূমি রক্ষা বা পুনরুদ্ধারের জন্য যে-প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল, এক দশক পরে তার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে 'ক্যাগ'-এর রিপোর্ট। 'গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন' (Green India Mission) -এর উদ্দেশ্য শুধু বৃক্ষরোপণ ছিল না, সেই সঙ্গে দেশের বনভূমির গুণমান উন্নত করা, জীববৈচিত্র ফিরিয়ে আনা, জলধারণ ক্ষমতা বাড়ানো এবং কার্বন শোষণের পরিমাণ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যও ছিল। কিন্তু ১০ বছর পর দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্যপূরণের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি প্রকল্পটি। যেখানে ১.৪ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমির গুণমান উন্নত করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বাস্তবে কাজ হয়েছে মাত্র ০.১১ মিলিয়ন হেক্টরে। বনভূমির পরিধি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও সাফল্য লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি।
আরও উদ্বেগের বিষয়, বন সংরক্ষণে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয়ের যে-কথা ছিল, তা কার্যত কিছুই হয়নি। শিল্প সংস্থার কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে বনসৃজনের জন্য ব্যবহৃত ক্যাম্পা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের মতো ব্যবস্থার সঙ্গে 'গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন'-এর সমন্বয় ঘটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিফলন দেখা যায়নি।
২০০৮ সালে জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনার ৮টি স্তম্ভের অন্যতম হিসাবে 'গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন' গড়ে উঠেছিল।
এই ব্যর্থতা নিছক সরকারি প্রকল্পের হিসাবের ঘাটতি নয়। এর সঙ্গে দেশের জলবায়ু নীতি এবং পরিবেশগত ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে। ২০০৮ সালে জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনার ৮টি স্তম্ভের অন্যতম হিসাবে 'গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন' গড়ে উঠেছিল। 'প্যারিস চুক্তি'-র অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টন কার্বন শোষণের যে-প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছে, তার সঙ্গেও এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ বন পুনরুদ্ধারের কাজটি পরিবেশরক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বাস্তবে সেই লক্ষ্য ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে।
কত কোটি চারা লাগানো হল, তার হিসাব কষলে পরিবেশরক্ষার আসল চিত্র ধরা পড়বে না।
বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান। গাছের চারা রোপণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু একটি চারা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বনের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য, সেটি ভুলে গেলে চলবে না। 'বন' মানে শুধু অসংখ্য গাছের সমষ্টি নয়; জল, পোকামাকড়, পাখি, পশু, স্থানীয় উদ্ভিদ, জলবায়ু এবং বহু বছরের তৈরি একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের সবুজ এলাকা ১,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। তার মধ্যে 'প্রকৃত' বনভূমি বেড়েছে মাত্র ১৫৬ বর্গকিলোমিটার। বাকি ১,২৮৯ বর্গকিলোমিটার হল নথিভুক্ত বনভূমির বাইরে থাকা গাছপালা। অর্থাৎ গাছের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বন বাড়ছে না।
এই পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে শুধু কত কোটি চারা লাগানো হল, তার হিসাব কষলে পরিবেশরক্ষার আসল চিত্র ধরা পড়বে না। এখানেই কেন্দ্রীয় পরিবেশনীতির মূল সমস্যা। বনকে যদি শুধু জমির পরিমাণ এবং গাছের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে প্রকৃত বন সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি 'বন রক্ষা'-র নিরন্তর উদ্যোগ। দরকার। স্থানীয় প্রজাতির গাছ ফিরিয়ে আনা, জলাধার ও মাটির পুনরুদ্ধার, অবৈধ খনন ও দখল বন্ধ করা, বনবাসী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের অর্থ ও কাজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।
