shono
Advertisement
Sugar Price

উৎসবের মরশুমের আগে চিনির স্বাদ তেতো! আকাশছোঁয়া দামের নেপথ্যে আসল কারণ কী?

জুন মাসেও পাইকারি বাজারে এক কুইন্টাল, মানে ১০০ কেজি চিনির দাম ছিল ৩,৮০০ টাকা। অর্থাৎ, ৩৮ টাকা কেজি। খোলা বাজারে সেটা বিক্রি হচ্ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পাইকারি দাম গিয়ে পৌঁছয় ৬,৮০০ টাকা কুইন্টালে। খোলা বাজারে দাম ওঠে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজিতে।
Published By: Subhodeep MullickPosted: 05:33 PM Aug 25, 2026Updated: 05:33 PM Aug 25, 2026

চিনির দাম আকাশছোঁয়া- ২ মাসে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। আখের ফলন কমা, ইথানল উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি- কোনটা আসল কারণ? উৎসবের মরশুমের আগে সরকার কীভাবে এই সংকট সামাল দেবে- এখন সেটাই বড় উদ্বেগ।

Advertisement

গৃহস্থের হেঁশেলে চিনির স্বাদ তেতো হতে শুরু করেছে। খোলা বাজারে এখন চিনি ৭০ থেকে
৭৫ টাকা কেজি। মুদি দোকানের মালিকের হুঁশিয়ারি– ‘আগামী সপ্তাহে ৮০ টাকা কেজি ধরে রাখুন।’ এ তো সবে আগস্টের শেষ! অক্টোবরে উৎসবের মরশুম জাঁকিয়ে বসলে চিনির দাম
কোথায় পৌঁছবে?

আমাদের কৈশোরে পুজোর সময় চিনির দাম ছঁ‌্যাকা মারতে শুরু করলে বাড়িতে স্যাকারিন আসত। শনিবার দুপুরে তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে ফিরলে– চিনির জন‌্য রেশন দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অভ‌্যাস ছিল। রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত বিকেলের খেলা যে মাটি হয়েছে, তার হিসাব নেই! হাহাকারের সেসব দিন আবার ফিরবে না কি? বাজারে তো এখন সহজে স্যাকারিন মেলে না! রেশন কার্ডও কবে চুলোয় গিয়েছে! তাছাড়া চিনির দামের ধাক্কা তো এবার অন্য সব খাদ্যসামগ্রীর ঘাড়ে গিয়ে পড়বে! সরকার কি পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট তৎপর? কত দিন চলবে এই সংকট? কীভাবে তৈরি হল এই পরিস্থিতি? এর জন্য কি শুধুই ইথানলের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা দায়ী? না কি মূল কারণ গত বছর উত্তর-পশ্চিম ভারতে অতিবৃষ্টির কারণে ‘রেড রট’ ও ‘টপ বোরা’-র অাক্রমণে আখের ফলন কমে যাওয়া? উঠছে নানা প্রশ্ন।

জুন মাসেও পাইকারি বাজারে এক কুইন্টাল, মানে ১০০ কেজি চিনির দাম ছিল ৩,৮০০ টাকা। অর্থাৎ, ৩৮ টাকা কেজি। খোলা বাজারে সেটা বিক্রি হচ্ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পাইকারি দাম গিয়ে পৌঁছয় ৬,৮০০ টাকা কুইন্টালে। খোলা বাজারে দাম ওঠে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজিতে। মাত্র ২ মাসে ৮০ শতাংশ বেড়েছে চিনির দাম। নিঃসন্দেহে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিনিকলগুলিতে সেভাবে উৎপাদন হয় না। কারণ এই সময়টায় আখের ফলন থাকে না। চিনিকলে আখ মাড়াই শুরু হয় অক্টোবর থেকে। দেওয়ালির ছুটি কাটিয়ে শ্রমিকরা মিলে ফিরলে কনভেয়ার বেল্টের গতি বাড়ে। উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। এটা চলে টানা মার্চ পর্যন্ত। যেবার আখের ফলন বাম্পার হয়, সেবার আখ মাড়াই মে মাস পর্যন্তও চলতে থাকে। বর্তমান বছরে, তথা ২০২৫-’২৬ সালে প্রাথমিকভাবে সরকার এবং চিনিকল মালিকদের প্রত্যাশা ছিল আখের ফলন বাম্পার হবে ও মে মাস পর্যন্ত আখ মাড়াই চলবে। মে মাস পর্যন্ত আখ মাড়াই চললে চিনি উৎপাদন ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কেজির অঙ্কে সংখ‌্যাটা দঁাড়ানোর কথা ৩,৪৩০ কোটি কেজিতে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন তার ধারেকাছেও পৌঁছল না।

এর প্রধান কারণ গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের বর্ষায় উত্তর ও পশ্চিম ভারতে অতিবৃষ্টি। ২০০১ সালের পর গত ২৪ বছরে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এত বৃষ্টি হয়নি। মৌসম ভবনের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে স্বাভাবিকের থেকে ২৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজস্থান ও পাঞ্জাবে স্বাভাবিকের থেকে ৬০-৭০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। ভয়াবহ বন্যা হয় পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে। মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশেও গত বর্ষায় ১৫ থেকে ২১ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এই অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আখ চাষ। একদিকে আখ খেতে লাল পচা রোগ তথা ‘রেড রট’-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ও ‘টপ বোরা’ পোকার আক্রমণ ঘটে, তাতে প্রচুর অাখ নষ্ট হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় জলে ডুবে থাকার কারণে আখে শর্করার মাত্রা কমে যায়। অাখে শর্করার মাত্রা কমলে রসের ঘনত্ব কমে যায়। কম ঘনত্বের আখের রসে কম চিনি তৈরি হয়। এই দুইয়ের জেরে এ বছরের গোড়ায় চিনিকলগুলোয় প্রত্যাশার তুলনায় উৎপাদন ১০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছে। এছাড়াও চিনি উৎপাদন এইভাবে কমে যাওয়ার জন‌্য সরকারের ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে।

বাম্পার আখের ফলন হবে ধরে নিয়ে যে ৩,৪৩০ কোটি কেজি চিনি উৎপাদনের অঙ্ক সরকার ও চিনিকল মালিকরা কষেছিল, তা এ বছরের মার্চে আখ মাড়াইয়ের শেষে দাঁড়ায় ৩,০০৬ কোটি কেজিতে। ঘাটতি প্রায় ৪২৪ কোটি কেজি। এদিকে, বাম্পার আখ ফলন হচ্ছে ধরে নিয়ে সরকারি হিসাবেই ৩০০ থেকে ৪০০ টন কেজি চিনি আগেভাগেই লাগিয়ে দেওয়া হয় ইথানল তৈরির কাজে। আখ মাড়াইয়ের পর যে ঘন রসটা বেরয়, তা থেকে চিনি না বানিয়ে সেটি গঁাজিয়ে উন্নত মানের ইথানল তৈরি করা যায়। আবার চিনি বের করার পর উচ্ছিষ্ট রস ও আখের ছোবরা থেকেও ইথানল বের করা যায়। গত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রোলে মেশানোর জন্য ইথানল উৎপাদনে জোর দিয়েছে। পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোয় দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খরচে সাশ্রয় হয়েছে। কিছু বিদেশি মুদ্রা বেঁচেছে। কিন্তু এ বছর দেখা যাচ্ছে সেই লাভের গুড় পিঁপড়েতে খাচ্ছে। আখ মাড়াই করে চিনির বদলে ইথানল তৈরি করার ক্ষতি পোষাতে এখন উল্টে মহার্ঘ বিদেশি মুদ্রা খরচ করে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করতে হচ্ছে। উপরন্তু দেশের বাজারে তৈরি হয়ছে এই অভূতপূর্ব চিনির সংকট। যা আগামী ২-৩ মাসে চিনির দামকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে কেউ জানে না। এর জের পড়বে অন্য সবকিছুর দামে।

কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছে, ইথানল উৎপাদনে আখের চেয়ে ভুট্টা বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। ইথানলের জন্য চিনির সংকট হয়নি। কিন্তু এটা তো বাস্তব যে, আরও ৩০০-৪০০ কোটি কেজি চিনি তৈরি হতে পারত এমন আখের রসকে ইথানল তৈরিতে কাজে না লাগালে গত ১০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবার ভারতকে বিদেশ থেকে চিনি কিনতে হত না। সরকারের তরফে পাল্টা জবাব আসতে পারে, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে গত বছর অতিবৃষ্টির জেরে আখের ফলন মার না খেলে এই পরিস্থিতির উদ্ভবই হত না। এখানেই আখ চাষি, চিনিকল মালিক ও সরকারের সমন্বয়ের প্রশ্ন আসে। ‘কৃত্রিম মেধা’-র যুগে কেন সম্ভাব‌্য পরিস্থিতির আগাম অঁাচ করা যাবে না?

অবস্থা সামাল দিতে সরকার চিনিকলগুলিকে বিদেশ থেকে ১০০ কোটি কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করার অনুমতি দিয়েছে। এই আমদানির উপর সরকার কোনও শুল্ক নেবে না। চিনি রফতানি বন্ধ রাখা হয়েছে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চিনি ব্যবসায়ীরা ৪০০ টনের বেশি চিনি মজুত করতে পারবেন না বলে সরকার ফতোয়া দিয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কোনও বড় উপভোক্তা তার ১৫ দিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় চিনির বেশি মজুত করতে পারবে না। ‘বড় উপভোক্তা’ বলতে সেসব শিল্প ও প্রতিষ্ঠানকে বোঝাচ্ছে– যাদের অন‌্যতম কাঁচামাল চিনি। অন‌্যতম কাঁচামালের দাম বাড়ায় এসব শিল্প ও প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম যে বাড়াবে তা বলা বাহুল‌্য।

কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয় মিলে মজুতদারদের উপর ইতিমধ্যে নজরদারি শুরু করেছে। বাজারে যাতে ‘কৃত্রিম’ ঘাটতি না তৈরি করা হয় তা দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, ব্রাজিল-সহ আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ১৬ শতাংশ বেড়েছে। সেটাও বিচারে থাকা উচিত। কিন্তু বিশ্ববাজারের প্রভাব দেশের ঘরোয়া বাজারে পড়ার কথা ছিল না। কারণ গত এক দশক ভারত চিনি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বছরে ৩,৫০০ লক্ষ কোটি টন চিনি সাধারণভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল। অামাদের কৈশোরের দিনগুলির মতো পরিস্থিতি আর ছিল না। ইথানল উৎপাদন না বাড়ালে এবারও সেটা হতে পারত। এবার অাবার বিদেশি চিনি খেতে হবে। তবে গ্লুকোজের মতো সেই মার্কিনি মিহি চিনি নয়। সরকার অপরিশোধিত চিনি অামদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলি ফের দেশীয় মিলগুলিতে প্রক্রিয়াকরণ করে দানা চিনি বানানো হবে। এই প্রক্রিয়াকরণ সময়সাপেক্ষ। বিদেশি চিনি রাতারাতি বাজারে আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে দামও দ্রুত কমার সুযোগ নেই। এখন দেখতে থাকা অর্থনীতিতে কী কী ঘটতে থাকে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement