মরুভূমির মৃত্যু! মরু-গরিমায় মুগ্ধ হওয়ার দিন কি ফুরিয়ে আসছে?

04:43 PM Nov 12, 2022 |
Advertisement

১৯৮৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত রাজস্থানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। আর্দ্র ও সবুজ হতে শুরু করেছে রাজস্থান। এর ফলে মরু অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রাণী ও উদ্ভিদের বাস্তুতন্ত্রে ধরা পড়ছে লক্ষণীয় বদল। লিখছেন সুমন প্রতিহার

Advertisement

ত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’-র মুকুল ভুয়ো ফোটোগ্রাফারকে বলেছিল- ‘আমার হাসি পাচ্ছে না।’ আমাদেরও তাই দশা। হাসি পাচ্ছে না। এই মুকুল আমাদের স্মৃতির প্রেক্ষাপটে বয়ে আনে রাজস্থান, মরুভূমি, কেল্লা, উট। অথচ ধূসর সেই মরুভূমি ক্রম-সবুজের পথে। মরুভূমির আবেগের জোয়ার কতদিন আর থাকবে, নিশ্চয়তা নেই। রাজস্থানের মরু-গরিমায় মুগ্ধ হওয়ার দিন কি তবে শেষ হয়ে আসছে?

মুকুলের মতো বাকি ভারতবাসীর হাসি মিলিয়ে যেতেই বা আর কতদিন? ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত রাজস্থানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। রাজস্থানের পশ্চিমাঞ্চল ভিজছে বেনিয়মে। চিন্তা এই যে, বেনিয়মের বৃদ্ধিটাও যে আবার নিয়ম মেনে!

Advertising
Advertising

প্রতিবছর রাজস্থানের পশ্চিমাঞ্চলে ২ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ২০২২-এর জুলাই মাসে রাজস্থানের ৩৩টি জেলার ৮টিতে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয়। যেখানে দিনে ৬৫ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই ‘ভারী বর্ষণ’ বলা হয়, সেখানে এ বছর যোধপুরে জুলাই মাসে একদিন ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে! উদ্ভূত পরিস্থিতি অভূতপূর্ব। এ কেমন রাজস্থান? যেখানে বদলে যাচ্ছে প্রাণীদের বাস্তুবিন্যাস, পরিযায়ী পাখিদের চেনা আনাগোনা, তৎসহ মরুভূমি বেঁধে রাখার উদ্ভিদগুলোও কেমন দ্রুত খেই হারাচ্ছে।

[আরও পড়ুন: হরফ দেখে রহস্যভেদ! শার্লক-ব্যোমকেশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন এক মার্কিন গোয়েন্দা]

সামান্য ভারী চেহারার ছটপটে পাখি কালো তিতির। হঠাৎ রাজস্থানের কালো তিতিরের সংখ্যা বেড়েছে। কারণ খুঁজতে নেমে হিমশিম বিজ্ঞানীরা চমকে উঠলেন। কালো তিতির মূলত আর্দ্র অঞ্চলের পাখি। কিন্তু জয়সলমিরেও কালো তিতিরের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। বছর ৩০ আগে কালো তিতির মূলত গঙ্গানগর অঞ্চলে পাওয়া যেত। কালো তিতিরের দলবল ক্রমশ বিকানেরের দিকে এগোচ্ছে, আপাতত চুরু-তে। চুরু অঞ্চল থর মরুভূমির প্রবেশপথ। তাহলে বদলে যাওয়া বৃষ্টিপাতে ভর করেই কি আর্দ্র অঞ্চলের পাখি কালো তিতির ক্রমশ থর মরুভূমিমুখী হচ্ছে? আশঙ্কা তাহলে অমূলক নয়, ক্রমশ ভিজছে যে মরুভূমি!

মরুভূমির শুষ্কতায় দেশি মুরগির মতো আকৃতির ঘুঘু প্রজাতির আর-একটি পাখির অহরহ দেখা মেলে- স্যান্ডগ্রাউস। এই পাখিগুলি পেটের পালকের সাহায্যে বাচ্চাগুলোর জন্য দূরান্ত থেকে জল বয়ে নিয়ে আনে। ভারতে ৭ রকমের স্যান্ডগাউস পাখির দেখা মেলে, মরুভূমির জলবায়ুর বদলে ক্রমশ কমছে তাদের সংখ্যা। হাঁড়িচাচা দক্ষিণবঙ্গে তাণ্ডব চালিয়ে ফসল নষ্ট করে। রাজস্থানেও কিন্তু অগোচরে বাড়ছে হাঁড়িচাচার সংখ্যা, শুধু তা-ই নয়, ধনেশ পাখিরও বাড়বাড়ন্ত।

এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। এই দুই প্রজাতির পাখির সংখ্যা এই অঞ্চলে বাড়বে কেন? নানারকমের যুক্তি পরিক্রমা সেরে ঘুরে-ফিরে চোখ সেই আটকাচ্ছে- বাড়তে থাকা বৃষ্টিপাতের দিকে। থর মরু অঞ্চলে ১৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসে, বিগত ২ বছর তারা সময়ের কিছুটা আগেই পৌঁছচ্ছে। রাজস্থানে রয়েছে বিপন্নতার দরবারে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্টার্ড পাখি। ভারতে এই পাখির সংখ্যা মাত্র ২০০, তার মধ্যে রাজস্থানেই ১০০। জাতীয় পাখি নির্বাচনের টেবিলে সেলিম আলি সাহেবের ভোট ছিল এই বাস্টার্ড পাখিতেই, যদিও ময়ূরের কাছে বিচিত্র এক কারণে পিছিয়ে বাদ পড়ে। বাস্টার্ড পরিবারের আর-এক পাখি হাউবারা বাস্টার্ড এ অঞ্চলে মেলে, যদিও সংখ্যায় প্রায় হাতেগোনা।

জলের উপস্থিতিতে সবুজের আহ্বানে ভারতীয় ধেড়ে ইঁদুরের সংখ্যাও বেড়েছে মারাত্মক। শস্যের বিপুল ক্ষতি করে চাষিদের ত্রাস তৈরি করেছে এই ধেড়ে ইঁদুরের দল। মরুভূমি অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ৮ হাজার মরু-শিয়াল। বর্তমানে বেশ কিছু চিত্রগ্রাহকের ছবিতে ধরা পড়েছে তাদের হতশ্রী অবস্থা। কিছু শিয়ালের তো গায়ে সমস্ত লোম ঝরে গিয়েছে, পিঠে বাসা বেঁধেছে এক ধরনের চাম-উকুন জাতীয় পোকা। তারা চামড়া ভেদ করে ডিম পাড়ছে আনন্দে আর শিয়ালগুলোর লোম উজাড় হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে মরুভূমিতে অভ্যস্ত শিয়ালরা কিন্তু পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলেও মানিয়ে নিচ্ছে। বনবিড়ালের সংখ্যা বেশ কমছে। রাজস্থানের ‘ডেসার্ট ন্যাশানাল পার্ক’-এ ১২ বছর আগে হাজারের বেশি বনবিড়াল ছিল, এখন কমে ৮০০-র কাছাকাছি। তবে সমসময়ে পার্কের বাইরে বনবিড়ালের সংখ্যা বেড়েছে। সাধারণভাবে বনবিড়াল শুষ্ক অঞ্চলে থাকতে অভ্যস্ত নয়। জলবায়ুর বদলকে সম্বল করে তারা সংখ্যায় বাড়ছে পার্শ্ববর্তী এলাকায়। এসব বনবিড়ালের থেকেই বিবর্তনের ধারায় ঘরোয়া বিড়ালের আবির্ভাব।

বন্য নেকড়ের একটা হৃষ্টপুষ্ট সাম্রাজ্য ছিল রাজস্থান (Rajasthan) অঞ্চলে। শেষ ১০ বছরে সংখ্যা কমতে কমতে অর্ধেক, ২০২০-র পরিসংখ্যান বলছে নেকড়ে রয়েছে ৭০০-র কিছু কম। পশুচারণকারীদের সংঘর্ষে নেকড়েরা ইতিউতি ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য ও বাসস্থান সংকুলানে। আপাতত আরাবল্লি পর্বতের নিচে ও লুনি নদী বরাবর এদের বসতি। ধূসর মরুভূমিতে সবুজপ্রেমী প্রাণীদের সংখ্যাও বেড়েছে লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে শেষ ৫ বছরে। নীলগাইয়ের সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার, হরিণও ঊর্ধ্বমুখী।

২০২০ সালে রাজস্থানের ৮টি জেলা পঙ্গপালের খপ্পরে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমার সন্ত্রস্ত হয়ে রাজ্যসভায় জানান- ভারতে দেড় লাখ হেক্টর জমির সিংহভাগ ফসল পঙ্গপালের আক্রমণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। অনিল শর্মা পঙ্গপাল নিয়ে প্রায় সারা জীবন ব্যস্ত থাকার পর জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, আর পঙ্গপালের সংখ্যা ক্রমশ অগণন হয়েছে। বৃষ্টির জল শুষ্ক অঞ্চল থেকে গড়িয়ে সৌদি আরব, ওমান, ইয়ামেনে পৌঁছেছে। পঙ্গপালেরাও মহা-উৎসাহে বালির সামান্য নিচে আর্দ্রতার সুযোগ নিয়ে ডিম পাড়ছে। পঙ্গপালের বংশ গুবলেট করেছে মানব লাভক্ষতির চুলচেরা হিসাব। ক্ষুধার্ত পঙ্গপাল দঙ্গল বেঁধে এগোচ্ছে ভারতের দিকে। এতদিন রাজস্থানের মরু অঞ্চলে এসে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত তারা, খাদ্যের অভাবে সামনে না-এগিয়ে পিছু হটত। এখন রাজস্থান সবুজের পথে। পঙ্গপালের দঙ্গল এখন রাজস্থান বেয়ে, দিল্লি চলো-র হুংকার দিচ্ছে তাই। থর মরুভূমি পঙ্গপালের ডিম পাড়ার আদর্শ হয়ে উঠছে।

গাছপালা লাগিয়ে সবুজায়নের প্রচেষ্টা রাজস্থানে বরাবর ছিল। ১৯৫২ রাজস্থানে সেচ ও পানীয় জলের মাইলস্টোন প্রকল্প ‘ইন্দিরা গান্ধী নাহার প্রোজেক্ট’ শুরু হয়েছিল। রাজস্থানের বালিয়াড়ির বৈশিষ্ট্য লম্বাটে ঘাসের ঝোপ সেওয়ান। নাহার জলপ্রকল্প বরাবর সেই ঘাসের খোঁজ এখন মিলছে না। রাজস্থানের ঢিপিগুলোকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে বিশেষ গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ ফগ। বাড়তে থাকা বৃষ্টিপাতের তোড়ে দেখা মিলছে না ফগের। বিগত ৪০ বছরের রাজস্থানের বালিয়াড়ির চড়াই-উতরাই ১৬ শতাংশ কমেছে। ক্রমে সমান্তরাল হচ্ছে মরুভূমি। আসছে সেদিন, যেদিন মরীচিকা ভ্রমেই মরুভূমির দর্শন হবে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক গবেষক, অধ্যাপক
pratihar_vu@rediffmail.com

[আরও পড়ুন: ‘আমরা ২৩৫, ওরা ৩০’, ঔদ্ধত্যই ছিল সিপিএমের ‘ঐতিহাসিক ভুল’]

Advertisement
Next