দীপক চট্টোপাধ্যায় আক্ষরিক অর্থে দিন কাটাচ্ছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া অতীতের সন্ধানে। নিজের ছেলেবেলা তাঁর স্মৃতিতে। বেঁচে আছে শুধু দু'-একটি আবছা চিহ্ন নিয়ে। মা, বাবা, দিদি আর দুই ভাই- ফিকে হতে হতে প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে। বাড়ির কাছে ধানখেত, খেতের আলপথে চার ভাইবোন খেলে বেড়াচ্ছে এই স্মৃতিটুকু এখনও ঝরেনি। মনে আছে বাবার হাত থেকে রোজ চকোলেট পাওয়ার আনন্দ। আর মনে আছে মা-বাবার ঝগড়া।
একদিন বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মা বাড়ি ছাড়ল। মায়ের সঙ্গে ছোট্ট দীপক যে নতুন জায়গায়, সেখানে একটা রেল ইয়ার্ড, ইয়ার্ডে মালগাড়ি দাঁড়িয়ে, কয়েকটা জংলি গাছ থেকে টমেটো ছিঁড়ে খাওয়া। তারপর একদিন মায়ের কাছ থেকে চকোলেট না পাওয়ার অভিমানে বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে আর ফিরতে না পারা। সে ঠিকানা জানে না। বলতে পারেনি বাবা-মা-র নাম। শেষ পর্যন্ত তার স্থান আড়িয়াদহের হোমে।
দীপকের মতো হৃতশিকড় মানুষ নোবেলজয়ী।
১৯৯৪ সালে দীপককে দত্তক নেন সোদপুরের দম্পতি বরুণ ও কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। তাঁদেরই 'পুত্র' পরিচয়ে দীপক রামকৃষ্ণ মিশনে শিক্ষিত হয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ে, আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। কাজের ফাঁকে বহু বছর আগে হারানো শিকড়ের সন্ধানী হন। সম্প্রতি, লেকটাউনের কাছে দক্ষিণদাঁড়িতে দেখা পান ফাঁকা মাঠের মাঝে যেন চেনা-চেনা রেল ইয়ার্ড, দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়ি, জংলি টমেটো গাছ। নিজের খুদেবেলার ছবি-সহ খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দীপক সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি তাঁর হারিয়ে যাওয়া বাবা-মা, ভাই-বোনকে খুঁজছেন। অতীতের কৃষ্ণাহার থেকে কোনও আলোর সাড়া কি মিলবে।
আত্মপরিচয়ের সন্ধানে মিলন কুন্দরা।
দীপকের মতো হৃতশিকড় মানুষ নোবেলজয়ী। সাহিত্যিক ভিএস নয়পল এসেছিলেন তাঁর অতীত পরিচয় খুঁজতে, ভারতে, যে-দেশ থেকে ক্রীতদাস হয়ে ত্রিনিদাদে যান তাঁর পূর্বপুরুষেরা। সেই সন্ধান বৃথা হয়েছিল। তিনি কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা খুঁজে পাননি এ-দেশে। ব্রিটেনেও ছিলেন 'আউটসাইডার'। সামাজিক আউটসাইডারদের আর-এক ঠিকানার আমরা দেখেছি আলব্যের কামুর উপন্যাসে, দার্শনিক লেখায়। একটি মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে তার তার সঠিক সামাজিক অবস্থান এবং ব্যর্থ হচ্ছে এই বিষয়টি ফিরে-ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়।
দেশ-সমাজ-পরিচিত পরিবহে নিজের ঠিকানা এবং পরিচয়ের অন্তহীন সন্ধানী দুই রুশ সাহিত্যিক। ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি, বরিস পান্তেরনাক।
মিলান কুন্দেরা তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসে ফিরে ফিরে গিয়েছেন ঠিকানাসন্ধানের বিষয়টিতে।
নিজবাসে এঁরা আজীবন নিঃসঙ্গ, নির্বাসিত, বহিরাগত। এ যুগের আরও এক বিখ্যাত চিন্তক-লেখক মিলান কুন্দ্ন্দেরা তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসে ফিরে ফিরে গিয়েছেন আত্মপরিচয় এবং নিজের ঠিকানাসন্ধানের বিষয়টিতে। এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর একটি উপন্যাসের নামে উচ্চারণ করেছেন এই সন্ধানের ব্যর্থতা: 'লাইফ ইজ এলস্হোয়্যার।' মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের পঙক্তি: 'তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার/ তাই জনম গেল, শাস্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার।'
