দল ‘নিষিদ্ধ’। আওয়ামি লিগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকো তাই অচল। দেশান্তরী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্তা দিয়েছেন ভোট বয়কটের। জামাতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রচারে যেতে। এতে পরোক্ষে সমর্থন করা হল বিএনপিকে। যারা গণতন্ত্রী, ‘মুক্তিযুদ্ধ’-র বিরুদ্ধে নয়।
২৪ ঘণ্টা পরই শুরু বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন (Bangladesh Election)। শেখ হাসিনার বিতাড়ন ও আওয়ামি লিগের কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ার পরে এই নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা ও আগ্রহ তুঙ্গে। হাসিনার আমলে ভোটের নামে তিন-তিনবার দেশবাসী যে-প্রহসনের সাক্ষী থেকেছে, এবারের ভোট তা থেকে আলাদা হয় কি না দেখতে বাংলাদেশের পাশাপাশি গণতন্ত্রী বিশ্বও মুখিয়ে আছে। ২১টি দেশের দুই শতাধিক সাংবাদিক ভোট দেখতে বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ভারতীয়, ৫৮ জন পাকিস্তানি।
ভোট নিয়ে অলুক্ষণে একটা ধারণা এখনও কারও কারও মনে গেঁথে আছে। সংশয়ী সেই মহল মনে করে, শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও অজুহাতে ভোট স্থগিত হয়ে যেতে পারে। জোরালো ফিসফাস, না অঁাচালে বিশ্বাস নেই। গণতন্ত্রী বাংলাদেশে নির্বাচনী লড়াই সবসময়ই দুই শিবিরে বিভাজিত। আওয়ামি লিগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। দুই দলই নির্বাচনী কৌশল হিসাবে সমমনাদের সঙ্গে রেখেছে। জোটবদ্ধ হয়েছে। ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসাবে থেকেছে জামাত। এককভাবে ও বিএনপির সঙ্গে জোট করে তারাও ভোটে লড়েছে। প্রাপ্ত ভোটের হার যদিও কখনও ৮ শতাংশের গণ্ডি টপকায়নি। এবার আওয়ামী লীগ ময়দানে না থাকায় লড়াই দ্বিমুখী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ দেড় বছরেই ছত্রাখান। তাদের দল এনসিপি প্রাসঙ্গিক থাকতে জামাতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। দলত্যাগী নেতাদের কেউ কেউ নির্দল হিসাবে লড়লেও মূল লড়াই বিএনপির সঙ্গে জামাতের।
আওয়ামি লিগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। দুই দলই নির্বাচনী কৌশল হিসাবে সমমনাদের সঙ্গে রেখেছে। জোটবদ্ধ হয়েছে। ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসাবে থেকেছে জামাত। এককভাবে ও বিএনপির সঙ্গে জোট করে তারাও ভোটে লড়েছে।
বিএনপি নেতা তারেক রহমান ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দেশশাসনের অভিজ্ঞতা তঁাদের আছে। রয়েছে বিরাট সমর্থনও। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দেহাবসান-জনিত সহানুভূতির হাওয়া। জামাতের অতীত, তাদের আদর্শ ও স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা ছাড়া তারেক ব্যক্তিগত আক্রমণের রাস্তায় হঁাটছেন না। শুরু থেকেই তিনি ‘নতুন’ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। নতুন ধরনের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছেন। শেষবেলায় জাতির প্রতি ভাষণে তিনি অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন।
উল্টোদিকে জামায়াতের প্রচারে নিয়মিত এসেছে বিএনপির লাগামছাড়া চঁাদাবাজি ও দুর্নীতিবাজ চরিত্র। জামায়াতের আবেদন একটাই– আওয়ামী লীগকে দেখেছেন, বিএনপিকে দেখেছেন, একবার আমাদের সুযোগ দিয়ে দেখুন। আমরা দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন উপহার দেব। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বয়স ৬৭। এমবিবিএস ডাক্তার। রাজনীতি শুরু করেছিলেন বামপন্থায় আকৃষ্ট হয়ে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে জামায়াতে শামিল। প্রচারে তিনি বলছেন, তঁাদের রাজনীতিতে ধর্ম-বর্ণর বিভেদ নেই। জুলাই অভ্যুত্থানের পর হিন্দু এলাকা ও মন্দির তঁাদের কর্মী-সমর্থকেরা পাহারা দিয়েছেন। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে হাজির হয়ে সংখ্যালঘুদের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চেয়েছেন। এবার এক হিন্দুকেও প্রার্থী করেছেন তঁারা। ভোটে জিততে ১১ দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে জামাত।
৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ৭০ কেন্দ্রে বিএনপির লড়াই বিএনপিরই বিরুদ্ধে। তারেকের নেতৃত্ব নিয়ে এটা কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন। ১৭ বছর পর দেশে ফিরলেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে তিনি ব্যর্থ।
বিএনপি ধরে নিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শেষে সরকার তারাই গড়বে। প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। সব সমীক্ষার ইঙ্গিতও তেমন। তবে জামায়াতেও তাদের সম্ভাব্য সাফল্য ও রমরমার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে। জয় নিয়ে নিশ্চিত হলেও বিএনপির বড় দুশ্চিন্তা বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ৭০ কেন্দ্রে বিএনপির লড়াই বিএনপিরই বিরুদ্ধে। তারেকের নেতৃত্ব নিয়ে এটা কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন। ১৭ বছর পর দেশে ফিরলেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে তিনি ব্যর্থ।
জামাতের বড় চ্যালেঞ্জ ধর্ম ও নারী নিয়ে তাদের আদর্শ ও বিশ্বাস। শফিকুর রহমান-সহ শীর্ষনেতাদের নারী সমাজের ক্ষোভ সামলাতে হচ্ছে। শফিকুর প্রথমে বলেন, ক্ষমতায় এলে চাকুরিজীবী নারীদের কাজের সময় আট থেকে কমিয়ে পঁাচ ঘণ্টা করে দেবেন। কারণ, নারীদের সংসারেও কাজ করতে হয়। ওই তিন ঘণ্টা তারা ব্যয় করবে সংসারে। ওই মনোভাব যে নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে, তাদের ঘরবন্দি করে রাখা, তা বুঝতে দেরি হয়নি। বিতর্কটা বেড়ে যায়, যখন আর-একজন শীর্ষনেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠন ‘ডাকসু’-কে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ‘বেশ্যাখানা’ বলেন! প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন শফিকুর রহমানের ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে এক পোস্টে কর্মরত নারীদের কাজকে ‘পতিতাবৃত্তি’-র সঙ্গে তুলনা করা হয়!
এ নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হলে শফিকুর তাঁর ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ হওয়ার দাবি করেন। জামাতের নারীবিদ্বেষী মনোভাব গোপন থাকে না যখন আমির নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বুঝিয়ে দেন, কোনও নারী কোনও দিন জামাতের ‘আমির’ হতে পারবেন না। নারীবিদ্বেষের নকাব খুলে যাওয়ায় জামাতের নির্বাচনী সম্ভাবনা যথেষ্ট ধাক্কা খেয়েছে। নারী সমর্থনের বেশিটাই পাবে বিএনপি। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প পুরোটাই নারীনির্ভর।
ছবি সংগৃহীত
ভোটে আওয়ামি লিগ নেই, কিন্তু না থেকেও লিগ সমর্থকেরাই হতে চলেছেন নির্ণায়ক। দেশত্যাগী হাসিনা বারবার বলেছেন, নৌকোহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। ভারতও শুরু থেকেই ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচনের কথা বলছে, যদিও ভাল করেই জানা, দাবি পূরণ হওয়ার নয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত জনা দশেক লিগ নেতা হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। নেত্রী তঁাদের দু’টি বার্তা দিয়েছেন। এক) নির্বাচন বর্জন, দুই) জামায়াতে-বিরোধিতা হতে হবে সর্বাত্মক।
দেশে থাকা লিগ নেতা-সমর্থকদের দুর্দশা কহতব্য নয়। বন্দিরা নিজেদের ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়েছেন। মুক্তদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে কারও-না-কারও দয়া ও কৃপার উপর। কোথাও বিএনপি, কোথাও জামায়াতে, কোথাও-বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাঁদের ঢাল। রক্ষক। জীবন ও সম্পত্তিরক্ষার মূল্য ও মাশুল চোকাতে হচ্ছে প্রত্যেককে। এই পরিচিতদের পক্ষে ভোট বর্জন সম্ভব নয়। বিএনপি ও জামাতের মধ্যে কাউকে-না-কাউকে তাঁদের বেছে নিতেই হবে। লীগ সমর্থকদের মন-জয়ের চেষ্টায় দুই দল তাই বিন্দুমাত্র খামতি রাখছে না। জামায়াতে নেতারা বলছেন, আওয়ামি লিগের কাউকে হয়রানি করা হবে না। প্রাণে বাঁচতে তাঁদের চাঁদা দিতে হবে না। বিএনপি নেতৃত্ব বলছে, লিগ নেতারা কর্মী-সমর্থকদের অকুল পাথারে ফেলে দেশ ছেড়েছে। আমরা তঁাদের পাশে আছি। আমরাই তঁাদের রক্ষক।
লিগ সমর্থকেরা কী করবেন তা নিয়ে বেসরকারি সংস্থা ‘পিপল্স ইলেকশন পাল্স সার্ভে’ সম্প্রতি এক সমীক্ষা করেছে। তাতে দেখাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেবেন, জামাতকে ১৩ শতাংশ, ৪১ শতাংশ হয় সিদ্ধান্ত নেননি, নয়তো বর্জনের পক্ষে। সর্বাত্মক জামায়াতে বিরোধিতার যে-বার্তা হাসিনা দিয়েছেন, তা শুধু তাঁর একার ইচ্ছা নয়, ভারতেরও। বিএনপির সঙ্গে সংলাপের দরজা ভারত অনেক দিন আগেই খুলেছে। প্রত্যাবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একটিও কটুকথা তারেক রহমান এখনও বলেননি। দুই দলের তিক্ত অতীত নিয়ে কোনও কুমন্তব্য করেননি। ইউনূস সরকারের কর্তা কিংবা ছাত্র নেতাদের মতো অন্ধ ভারত-বিরোধিতার সুরও চড়াননি। বরং, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবাইকে নিয়ে দেশগঠনের কথা শোনাচ্ছেন। বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে কোনও সমঝোতা নয়। তাদের রাজনীতি দেশকে পিছিয়ে দেবে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা ধর্মান্ধ, দেশের মঙ্গল করা তাদের কম্ম নয়।
রাজনীতির প্রবাহ বড়ই অদ্ভুত। জামাতকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে এই বিএনপি-ই একদা আওয়ামি লিগের বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশের নির্বাচনে আওয়ামি লিগ কখনও ৩০ শতাংশের কম ভোট পায়নি। সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ৪৭ শতাংশ। হাসিনা তো বটেই, ভারতেরও বিশ্বাস, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামি লিগের রাজনীতিতে ফেরা সম্ভবত সহজতর হবে। হয়তো সেই আশাতেই জামায়াতের সর্বাত্মক বিরোধিতার বার্তা দিয়েছেন হাসিনা। তিনি জানেন, জামাতের বিরোধিতার অর্থ প্রকারান্তরে বিএনপিকে সমর্থন। আর যাই হোক, বিএনপি গণতন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও তারা করেনি। তারা সরকার গড়লে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামি লিগের উপর ‘নিষেধাজ্ঞা’ প্রত্যাহৃত হবে।
