উইম্বলডনে ডাবলস থেকে সরে দাঁড়ানোর পর টেনিস কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস (Serena Williams) এমন একটি ছবি প্রকাশ করেছেন, যা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর হাঁটু থেকে সিরিঞ্জের মাধ্যমে বের করা হয়েছে জমে থাকা তরল। সঙ্গে আবেগঘন বার্তায় তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও নিজেকে কোর্টে ফেরানোর মতো অবস্থায় আনতে পারেননি।
সেরেনা লেখেন, 'সিঙ্গলস ম্যাচের পর আমার হাঁটু থেকে যে তরল বের করা হয়েছিল, সেটাই এই সিরিঞ্জগুলোতে রয়েছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে আর এতটা তরল জমবে না। কিন্তু যতই চেষ্টা করি না কেন, ডাবলস খেলার মতো ফিট হয়ে উঠতে পারিনি।'
এই একটি পোস্টের পরই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে 'নি ইফিউশন' (Knee Effusion) বা হাঁটুর জয়েন্টে অতিরিক্ত তরল জমার সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনও সাধারণ ফোলা নয়, বরং হাঁটুর ভেতরে চলতে থাকা প্রদাহ বা আঘাতের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
হাঁটুর সমস্যায় কাবু। ছবি: সংগৃহীত
নি ইফিউশন কী?
হাঁটুর জয়েন্টের ভেতরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তরল জমে গেলে তাকে নি ইফিউশন বলা হয়। অনেকেই একে 'হাঁটুতে জল জমা' বলে থাকেন। এটি নিজে কোনও রোগ নয়, বরং শরীরের একটি সংকেত, যা জানায় হাঁটুর ভেতরে কোনও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘদিনের অনুশীলন বা হঠাৎ চোটের পর এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কেন হাঁটুতে তরল জমে?
চিকিৎসকদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন-
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম
- কার্টিলেজের ক্ষয় বা আঘাত
- মেনিস্কাস ছিঁড়ে যাওয়া
- লিগামেন্টে টান বা ক্ষতি
- সাইনোভিয়ামে প্রদাহ
এই প্রদাহের ফলেই জয়েন্টে অতিরিক্ত তরল তৈরি হয় এবং হাঁটু ফুলে যায়।
চেনা ছন্দে। ছবি: সংগৃহীত
কেন তরল বের করতে হয়?
সেরেনার হাঁটু থেকে যে তরল বের করা হয়েছে, সেই চিকিৎসা পদ্ধতির নাম জয়েন্ট অ্যাসপিরেশন বা আর্থ্রোসেন্টেসিস। এই পদ্ধতিতে একটি জীবাণুমুক্ত সূঁচের সাহায্যে জয়েন্টের ভেতর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করা হয়। এতে হাঁটুর চাপ কমে, ব্যথা ও অস্বস্তি হ্রাস পায় এবং হাঁটু নাড়ানো সহজ হয়। পাশাপাশি ওই তরল পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, প্রদাহ বা অন্য কোনও অন্তর্নিহিত রোগ আছে কি না, তাও নির্ণয় করা সম্ভব।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, তরল বের করে দেওয়া মানেই রোগ সেরে যাওয়া নয়। এটি সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু মূল সমস্যার চিকিৎসা আলাদাভাবে করতে হয়।
এই অবস্থায় খেলা কি নিরাপদ?
অনেকেই ভাবেন, ফোলা কমে গেলেই আবার মাঠে ফেরা সম্ভব। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। হাঁটুতে প্রদাহ থাকলে পেশির নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে, ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, নড়াচড়া সীমিত হয় এবং ব্যথা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে লিগামেন্ট বা কার্টিলেজে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়।
বিশেষ করে টেনিসের মতো খেলায়, যেখানে প্রতিটি পয়েন্টে দ্রুত দৌড়, হঠাৎ দিক পরিবর্তন এবং বারবার লাঞ্জ করতে হয়, সেখানে হাঁটুর সামান্য অস্থিরতাও বড় চোটের কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিযোগিতা থেকে বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বাধ্য হলেন সরে দাঁড়াতে। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসা কী?
নি ইফিউশনের চিকিৎসা নির্ভর করে এর মূল কারণের উপর। সাধারণত চিকিৎসায় থাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বরফ সেঁক, কমপ্রেশন, পা উঁচু করে রাখা, প্রয়োজনে প্রদাহনাশক ওষুধ, ফিজিওথেরাপি এবং কার্টিলেজ, লিগামেন্ট বা মেনিস্কাসে আঘাত থাকলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা।
সেরেনা উইলিয়ামসের এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন তারকা ক্রীড়াবিদের সমস্যা নয়। এটি আমাদেরও মনে করিয়ে দেয়, হাঁটুতে দীর্ঘদিন ফোলা, ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামই ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
