সংঘ ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বলছে– এই লুট ‘চরম লজ্জার ও অসম্মানের’– দোষীরা ছাড়া পাবে না। দু’টি জিনিস তারা প্রতিপন্ন করতে চাইছে। এক, চুরি হয়েছে নিচু পর্যায়ে, সংঘ বা সরকারি কর্তারা এর সঙ্গে যুক্ত নন। দুই, এরপর মন্দির পরিচালনায় আরও কঠোর ব্যবস্থা গৃহীত হবে। কিন্তু ধর্মপ্রাণ হিন্দুর মনে উৎসর্গিত টাকাপয়সা লুটের ধারণা কায়েম হলে, তা কি ভোট-অঙ্কে উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে সুবিধা করে দেবে?
অযোধ্যায় রাম মন্দিরের লুটের (Ram Mandir Donation Theft Case) খবর জানাজানি হয়েছে জুন মাসের গোড়ায়। দেরি না করে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার বিশেষ তদন্তকারী দল (‘সিট’) গঠন করল। কয়েকজনকে ধরা হল। চুরি যাওয়া অর্থের খানিকটা উদ্ধারও হল। মন্দির পরিচালনার দুই কর্তা পদত্যাগ করলেন। তাঁদের ইস্তফা গৃহীত হল। দেশে, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে, এ নিয়ে তুলকালাম চলছে। মন্দিরের দানপাত্র থেকে কোটি কোটি টাকা, সোনা-রুপোর গয়না চুরির দায়ে তুলোধোনা হচ্ছে ‘আরএসএস’ ও ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’। তীব্র সমালোচিত কেন্দ্রীয় সরকার, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মন্দির নির্মাণ ও পরিচালন ট্রাস্ট তারই তৈরি। ট্রাস্টে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতি বিশ্বস্ত আমলা নৃপেন্দ্র মিশ্র ও কেন্দ্র-রাজ্যের প্রতিনিধিরা। অথচ, প্রধানমন্ত্রী নীরব! দেড় মাস কেটে গিয়েছে, রামকোষে চুরি নিয়ে একটি শব্দও নরেন্দ্র মোদি উচ্চারণ করেননি!
কেন তিনি ‘মৌন’ কেউ জানে না। তাঁর বিস্ময়কর নীরবতা নিয়ে রাজনৈতিক জল্পনার যদিও শেষ নেই। জল্পনার ফানুস উড়ছে আড়াই দশক ধরে যিনি মোদির ছায়া, তাঁর ‘ম্যান ফ্রাইডে’ কিংবা এক অর্থে প্রধানমন্ত্রীর ‘অল্টার ইগো’– সেই অমিত শাহকে নিয়েও। কারণ, মন্দির নির্মাণ ও বিগ্রহে প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর একবারও তিনি অযোধ্যা যাননি। পুরুষোত্তম রামচন্দ্রর দর্শন করেননি। কেন এই অনীহা, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সেই প্রশ্ন তুলেছেন। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে জানতে চেয়েছেন, কেন আপনি রাম মন্দিরে যাননি? আপনার কি ভগবান রামচন্দ্রকে দর্শনের ইচ্ছা হয় না? তঁার আশীর্বাদ পেতে ইচ্ছা করে না? আপনারা কি রামচন্দ্রকে ঈশ্বর মনে করেন? এই লোকজনেরা তা মনে করলে দানের নৈবেদ্য চুরি করত না। কেজরিওয়ালের উপসংহার, ‘বিজেপির কাছে সনাতন ধর্ম শুধু ক্ষমতা দখল ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যম।’
তীব্র সমালোচিত কেন্দ্রীয় সরকার, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মন্দির নির্মাণ ও পরিচালন ট্রাস্ট তারই তৈরি। ট্রাস্টে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতি বিশ্বস্ত আমলা নৃপেন্দ্র মিশ্র ও কেন্দ্র-রাজ্যের প্রতিনিধিরা। অথচ, প্রধানমন্ত্রী নীরব!
সংকট ও সমালোচনায় নীরব থাকা প্রধানমন্ত্রীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কখনও তরিৎ প্রতিক্রিয়া তিনি দেন না। মণিপুর নিয়ে তাঁর নীরবতা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিও, যেমন: নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসসি-র দুর্নীতি, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ‘জমি কেলেঙ্কারি’, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলন ও সোনম ওয়াংচুকের অনশন, কোনও বিষয়েই তিনি মুখ খোলেননি। অযোধ্যা নিয়েও নয়। তিনি মুখ খোলেন জল নাকের নিচ দিয়ে বইতে শুরু করলে। মানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে। অতীতে বারবার এমন হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
অন্য ঘটনাগুলি থেকে অবশ্য অযোধ্যা সংকট আলাদা। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মন্দির নির্মাণ ও পরিচালনার ট্রাস্ট দু’টি প্রধানমন্ত্রীই গড়েছেন। ট্রাস্টের সদস্যদের তিনিই বেছেছেন। প্রত্যেকে বিজেপি, আরএসএস ও সংঘ পরিবারের বিশ্বস্ত। সংঘ পরিবার মোদি-শাহর নিয়ন্ত্রণে আসে আট বছর আগে, যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের শীর্ষ নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়া অপসারিত হন। মন্দিরের দৈনন্দিন কাজকর্মের রাশ ক্রমেই চলে আসে চম্পত রাইদের হাতে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ হয়ে ওঠে মোদির আজ্ঞাবহ। এতটাই যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রকে বিজেপির দিল্লি সভাপতি করতে সবচেয়ে সচেষ্ট ছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক সভাপতি অলোক কুমার, যিনি আরএসএসের দিল্লি শাখার সংঘচালক। এই ঘনিষ্ঠতার কারণেই চম্পত রাই, অনিল মিশ্র এখনও গ্রেফতার হননি। তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআরও দাখিল হয়নি।
সংঘ ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বলছে– এই লুট ‘চরম লজ্জার ও অসম্মানের’। বলছে– দোষীরা ছাড়া পাবে না। দু’টি জিনিস তারা প্রতিপন্ন করতে চাইছে। এক, চুরিটা হয়েছে নিচু পর্যায়ে। সংঘ বা সরকারি কর্তারা এর সঙ্গে যুক্ত নন। দুই, এরপর থেকে মন্দির পরিচালনায় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যেমন: সিইও নিয়োগ ও অছি পরিষদের পুনর্গঠন, যাতে চুরির অবকাশ থাকবে না। বিরোধীরা অবশ্য বলতে ছাড়ছেন না, সরকার এমন ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও দিন চুরি ধরা না পড়ে।
মন্দিরের দৈনন্দিন কাজকর্মের রাশ ক্রমেই চলে আসে চম্পত রাইদের হাতে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ হয়ে ওঠে মোদির আজ্ঞাবহ। এতটাই যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রকে বিজেপির দিল্লি সভাপতি করতে সবচেয়ে সচেষ্ট ছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক সভাপতি অলোক কুমার, যিনি আরএসএসের দিল্লি শাখার সংঘচালক।
এই লুট-কাণ্ডে প্রকাশ্যে যা ঘটে চলেছে, যা দৃশ্যমান, তার বাইরে রয়েছে রাজনীতির অন্তঃসলিলা সরস্বতী। তীব্রতর হয়ে উঠেছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রেষারেষি। দেশের বৃহত্তম রাজ্যের রাজনীতি এই মুহূর্তে এই টানাপোড়েনে জেরবার। মোদি-শাহ বনাম যোগীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মনগড়া নয়। যোগী কোনও দিনই মোদিভক্ত ছিলেন না। হওয়ার চেষ্টাও করেননি। সংঘের সঙ্গে যোগাযোগও তাঁর কস্মিনকালে ছিল না। গোরক্ষধামের মহন্ত রূপে রাজনীতিটা তিনি করে এসেছেন নিজের দমে। ২০১৭-র বিধানসভা ভোটের পর মোদি চেয়েছিলেন মনোজ সিন্হাকে মুখ্যমন্ত্রী করতে। কিন্তু যোগীর কাছে তাঁকে হারতে হয়। মনোজকে করা হয় জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিপর্যয়ের দায়ও মোদি-শাহকে নিতে হয়েছিল, যেহেতু যোগীকে উপেক্ষা করে টিকিট বণ্টন তাঁরা করেছিলেন। সেই ভোটের দু’-বছর আগে যোগীকে চাপে রাখতে মোদি লখনউ পাঠিয়েছিলেন স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া অতি বিশ্বস্ত আমলা অরবিন্দ শর্মাকে। যোগী তাঁকে মন্ত্রী করলেও এখনও দাঁত ফোটাতে দেননি। অতঃপর অনগ্রসর নেতা কেশবপ্রসাদ মৌর্য ও ব্রাহ্মণ ব্রজেশ পাঠককে উপ-মুখ্যমন্ত্রী করে যোগীর ডানা ছাঁটার চেষ্টা চলেছে– যেহেতু যোগী নিজেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের উপযুক্ত মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে মন্দির লুট খবরের শিরোনামে এল।
মন্দির নির্মাণে ৪০ শতাংশ কমিশন, ট্রাস্টকে ২ কোটির জমি ২০ কোটিতে বিক্রি কিংবা দানপাত্র লুট নিয়ে কানাঘুষো শুরু থেকেই শোনা যাচ্ছিল। বিধানসভা ভোটের আগের বছর হঠাৎ কেন তা এভাবে হইচই ফেলে দিল? এতে কার মুখ পোড়ার কথা? মন্দির উপাখ্যানের সর্বাধিনায়ক মোদিরই তো? তাহলে এটা কার কারসাজি? এসব প্রশ্ন উঠছে। আবার, এই কেলেঙ্কারিতে দল হিসাবে ক্ষতির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বিজেপির। বিধানসভা ভোটের আগে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি নড়বড়ে হলে বিপদ বাড়বে যোগীর। তাতে চওড়া হবে অমিত শাহর হাসি। যেহেতু জনপ্রিয় ধারণা, তিনিই মোদির উত্তরাধিকারী। এই আলোচনাও সমানে চলছে। অন্য প্রশ্ন, হিন্দুত্ববাদে ফাটল ধরলে, সংঘ পরিবার প্রশ্নবিদ্ধ হলে ও উত্তরপ্রদেশে বিজেপি বিপন্ন হলে দিল্লির মসনদও কি নড়বড়ে হবে না? সেক্ষেত্রে ২০২৯ এর নির্বাচনের সামাল দেওয়া কি মোদি-শাহর পক্ষে সম্ভবপর হবে?
দিল্লি-লখনউ এই টানাপোড়েনে রাজনীতি টানটান। যোগী বুঝছেন, এই কেলেঙ্কারির দরুন লোকসভার তুলনায় বিধানসভার ভোটের চ্যালেঞ্জ বেশি ক্ষুরধার। ‘হিন্দু যুবা বাহিনী’কে তাই তিনি তৈরি থাকতে বলেছেন। রাজ্যপাট ঠিক রাখা তাঁর পক্ষে জরুরি, যেহেতু মোদি-উত্তর বিজেপির রাশ হাতে নেওয়ার দাবিদার তিনিও। সেই কারণে মথুরায় কৃষ্ণ জন্মভূমি উদ্ধারের ডাক দিয়েছেন, যাতে সমাজবাদী পার্টির সমর্থনের ভিত নড়বড়ে করে দেওয়া যায়। ৯ বছর ধরে ক্ষত্রিয় উত্থানে কোণঠাসা রাজ্যের ব্রাহ্মণ সমাজ পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে। কংগ্রেস তাদের কাছে লাইটহাউস হতে পারবে কি? মোদি-শাহ জানেন, দিল্লির মসনদে পৌঁছনোর রাস্তা উত্তরপ্রদেশ ঘুরে আসে। ভগবানের সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠেছে বদ্রিধাম, কেদারনাথেও। বিরোধীরা বসে নেই। হিন্দুত্ববাদে আস্থা টলে গেলে ক্ষমতা ধরে রাখা কতটা কঠিন মোদি-শাহর তা জানা। অযোধ্যা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে সুপ্রিম কোর্ট। ‘সিট’-কে স্টেটাস রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। তারা তদারকি শুরু করলে মোদির বলিরেখা গাঢ় হতে পারে। সবসময় সবকিছু ম্যানেজ করা কঠিন। বোফর্স কেনাবেচায় ঘুষের অভিযোগ রাজীব গান্ধীর সর্বনাশের কারণ ছিল না। খারাপ কামান কিনে জওয়ানদের তিনি মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছেন, এই ‘অপরাধ’-এর মাশুল তাঁকে দিতে হয়েছিল। ভগবানকে ‘উৎসর্গ’ করা সোনা-রুপো-টাকা চুরি ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের বিশ্বাস ও আস্থা নড়িয়ে দিলে বিজেপি তার মোকাবিলা করতে পারবে তো? এমন পরীক্ষা নরেন্দ্র মোদিকে আগে দিতে হয়নি।
(মতামত নিজস্ব)
