'মা'। এ শব্দের প্রভাব আবিশ্বে একইরকম। কেননা সমাজ মাতৃরূপের সৌন্দর্য ও সন্তানের সঙ্গে মায়ের সম্পর্কের একটি সর্বজনীন 'সংজ্ঞা' স্বতঃই তৈরি করেছে। এহেন প্রচলিত চিত্রায়নের একটি আদর্শ প্রতিকৃতি আমরা ফি-বছর "মাদার'স ডে"-তে ঝলসে উঠতে দেখি। দুর্ভাগ্য, বর্তমানে 'মেটারনিটি লিভ' বা মাতৃত্বকালীন অবকাশেরও হয়তো একটি সর্বজনীন ও সর্বদেশীয় চরিত্র তৈরি হয়ে উঠছে। যে-ছবিতে 'মা' শব্দের প্রতি মমত্ব ও ভালোবাসার অভাব খুবই প্রকট। যে-ছবিতে মাতৃত্বের মহিমা ভুলুণ্ঠিত। যে-ছবিতে পুরষতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার নিগড়ে মা এবং সন্তানের সম্পর্কটি ছটফট করছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া এবং পাওয়ার যে
সহজ সামাজিকতা তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
পশ্চিম জাপানের ছোট শহর ওয়াটা। ৬৯ হাজার মানুষের বাস। শান্ত শহর, উপদ্রব কম। শোকো কাওয়াতা এ শহরে 'মেয়র' বা পৌরপ্রধান নির্বাচিত হন ২০২৩ সালে। তিনিই ওয়াটার সর্বকনিষ্ঠ মহিলা পুরমাতা। কিন্তু ওয়াটা শহরের মহিলা কর্মীদের জন্য ১৬ সপ্তাহ বা ৪ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন থাকলেও, 'মেয়র' পদের জন্য মনোনীত মহিলাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা এত দিন ছিলই না! বিস্ময়কর শোনালেও সত্যি। শোকো কাওয়াতার জন্য প্রথম ওয়াটা শহরের নিয়ম বদলাল। সর্বকনিষ্ঠ মহিলা মেয়র মাতৃত্বের ছুটি পেলেন।
কিন্তু যে-মন্তব্যটি তিনি এ প্রসঙ্গে করেছেন, তা স্মরণীয়: 'প্রথম মেয়র রূপে মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলাম, এর থেকে প্রমাণ হয়, ইতিপূর্বে যেসব মহিলা মেয়র হয়েছেন এ শহরে, তাঁরা কোন বয়সে পৌঁছে এই পদ অলংকৃত করছেন।'
প্রথমবার মা হয়ে স্বরপা রানি ছুটি পান। দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠান তা দিতে অস্বীকার করে।
সানাই তাকাইচি, প্রথম মহিলা রূপে, জাপানের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন ২০২৫ সালে। জাপানি সমাজ ভীষণভাবে পুরুষপ্রধান। ফলে দেশটি মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেলেও 'জেন্ডার গ্যাপ' বা সামাজিক পরিসরে লিঙ্গ ব্যবধানের নিরিখে ১৪৮ দেশের ক্রমতালিকায় জাপানের অবস্থান ১১৮। আর, যেসব মহিলা রাজনৈতিক সক্ষমতার লড়াই লড়ছেন পদে থেকে, তাঁদের জন্যও জাপান সুখবর শোনাচ্ছে না। জাপান সে ক্রমতালিকায় বিশ্বে ১২৫।
ভারতই-বা কম কীসে? জে. স্বরূপা রানি 'তেলেঙ্গানা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার রেসিডেনশিয়াল এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস সোসাইটি'-তে কর্মরত। সরকারি কর্মীরা এ-দেশে 'মাতৃত্বকালীন অবকাশ' পান ২৬ সপ্তাহের (৬ মাস ২ সপ্তাহ)। প্রথমবার মা হয়ে স্বরপা রানিও তা পেয়েছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠান তা দিতে অস্বীকার করে। কেননা, প্রথমবার স্বরূপা রানির যমজ সন্তান হয়। বঞ্চিত স্বরূপা তেলেঙ্গানা হাই কোর্টে মামলা করেন। বিচারপতি, বলা বাহুল্য, দ্বিতায় সন্তানের ক্ষেত্রেও ধার্য মাতৃত্বকালীন অবকাশ অনুমোদন করেছেন। বিচারপতির পর্যবেক্ষণে, যমজ সন্তান হওয়া মায়ের ইচ্ছা-নিরপেক্ষ জৈবিক ঘটনা। হায়, এটুকু সত্য ১৪০ কোটির মাতৃজঠর-ভূমিষ্ঠ দেশটি বুঝতে পারে না।
