রক্তদান একটি সামাজিক আমানত। কিন্তু গত এক দশকে ভারতের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর প্রসারের সঙ্গে রক্তের ‘প্রসেসিং ফি’, বেসরকারি হাসপাতালের বাণিজ্যিকীকরণ ও নজরদারির ঘাটতি নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। রক্তের জোগান, খরচ ও ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক নয়, সামাজিক দায়ও। লিখছেন সুনীল মাইতি।
ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবা খাতে বিগত এক দশকে যে অভাবনীয় পরিকাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে– তা যেমন বহু জীবন রক্ষা করেছে– তেমনই চিকিৎসাব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে একগোছা প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল– ‘রক্ত’। মানব দেহের যে-উপাদানটির কোনও ‘বিকল্প’ কৃত্রিম রসায়নাগারে তৈরি সম্ভব নয়, যা সম্পূর্ণভাবে রক্তদাতার সহমর্মিতা এবং সেবামূলক মানসিকতার উপর নির্ভরশীল– তা বেসরকারি হাসপাতাল বা ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির হাতে পৌঁছে কি তবে স্রেফ ‘পণ্য’-য় পরিণত হয়েছে? বিগত দশকে ভারতে রক্ত আন্দোলন এবং তার আড়ালে চলা বিপুল পরিমাণ টাকার কারবারের সমীকরণটি বিশ্লেষণ করলে একটি জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ফুটে উঠে।
দেশের ‘জাতীয় রক্ত সঞ্চালন পরিষদ’ (NBTC) এবং ‘কেন্দ্রীয় ওষুধ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’-র (CDSCO) নিয়ম অনুযায়ী, রক্ত বা রক্ত-উপাদান ক্রয়-বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। অর্থাৎ রক্তের ‘বিক্রয় মূল্য’ হতে পারে না। হাসপাতাল বা ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি যে-টাকা রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে দাবি করে– তা হল, ‘প্রসেসিং চার্জ’ বা প্রক্রিয়াকরণ খরচ। এর মধ্যে রয়েছে রক্তে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস বা ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের উপস্থিতি পরীক্ষা (Testing), তাপমাত্রা বজায় রেখে সংরক্ষণ ( Storage), এবং রক্তকে উপাদান অনুযায়ী ভাগ করার (Component Separation) খরচ।
নথি অনুযায়ী, সব ঠিক থাকলেও বিপত্তি ঘটে খরচের সীমা নিয়ে। সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও বহু কর্পোরেট ও বেসরকারি হাসপাতাল ‘প্রসেসিং ফি’-এর নামে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করে। যেখানে একটি সরকারি সেন্টারে বা রেডক্রস ব্লাড ব্যাঙ্কে এক ইউনিট রক্তের জন্য হয়তো কয়েকশো টাকা নেওয়া হয়– সেখানে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রাইভেট ব্লাড ব্যাঙ্ক রক্ত উপাদান-ভেদে (যেমন: প্লাজমা, প্লেটলেট, প্যাকড লোহিত রক্তকণিকা) ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা বা তারও বেশি আদায় করে। বিগত এক দশকে প্লেটলেট রিচ প্লাজমা বা ডাব্ল ফ্রোজেন প্লাজমার মতো বিশেষায়িত উপাদানের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খরচের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা ব্যবসার মূল অভিযোগটি শুধু প্রক্রিয়াকরণ ফি-তেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে রয়েছে পরিষেবার আনুষঙ্গিক বহু ক্ষেত্র–
১. বাধ্যতামূলক ইন-হাউস ক্রয়
বহু বেসরকারি হাসপাতাল বাইরের অনুমোদিত ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে আনা রক্ত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। রোগীর পরিবারকে বাধ্য করা হয় সেই হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকেই চড়া দামে রক্ত বা রক্ত উপাদান কিনতে।
২. ক্রস-ম্যাচিং ও ট্রান্সফিউশন ফি
রক্ত পরীক্ষার মূল খরচের বাইরেও ক্রসম্যাচিং চার্জ, ট্রান্সফিউশন সেট চার্জ এবং নার্সিং ফি-এর নামে আলাদা মোটা অঙ্কের বিল তৈরি করা হয়।
জাতীয় স্তরে ভারতের প্রয়োজন বার্ষিক প্রায় ১.৫ কোটি ইউনিট রক্ত– যেখানে ঘাটতি থেকে যায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
৩. অপ্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালন
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ-তে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্ত উপাদান প্রেসক্রাইব করার একটা প্রবৃত্তি দেখা যায়– যা ব্লাড ব্যাঙ্কের রাজস্ব বৃদ্ধিতে সরাসরি সাহায্য করে।
ভারতে স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনের কর্মী ও সংগঠনগুলির অভিযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট। সাধারণ মানুষ যে-রক্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে দান করছে– তা হাসপাতালে পৌঁছানোর পর একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসার সামগ্রীতে পরিণত হচ্ছে। রক্তদাতারা ভাবেন তাঁরা কোনও মুর্মূষু রোগীর জীবন বাঁচাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে সেই রক্ত ‘প্রসেসিং ফি’-র আড়ালে মোটা মুনাফার উৎস হয়ে উঠছে।
জাতীয় স্তরে ভারতের প্রয়োজন বার্ষিক প্রায় ১.৫ কোটি ইউনিট রক্ত– যেখানে ঘাটতি থেকে যায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এই ঘাটতিকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠেছে এক অলিখিত ‘সাপ্লাই-ডিমান্ড’ বাজার। জরুরি প্রয়োজনে বা বিরল রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে দিশেহারা পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বিগত এক দশকে বহুবার শিরোনামে এসেছে।
২০১৬ সালে ‘এনবিটিসি’ প্রসেসিং চার্জের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিয়ে একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল, কিন্তু রাজ্য পর্যায়ে তার কঠোর বাস্তবায়নের অভাব স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্বাস্থ্য নিয়ামক সংস্থাগুলির নজরদারিতে গলদ থাকার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনায়াসেই এই নিয়ম এড়িয়ে যেতে পারে। রক্তদান শিবির আয়োজনের খরচ জোগায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা– অথচ সেই সংগৃহীত রক্তের প্রসেসিং করে লাভের মুখ দেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
রক্ত সংগ্রহের উৎস থেকে শুরু করে রোগীর শরীরে প্রবেশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ‘ই রক্তকোষ’-এর মতো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে ১০০% ট্র্যাক করা উচিত, যাতে প্রতিটি ইউনিটের খরচের স্বচ্ছ অডিট সম্ভব হয়।
স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয় এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বজায় রাখতে হয়– তবে এই পরিকাঠামোয় অবিলম্বে কিছু কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রসেসিং ফি-র স্বচ্ছতা ও একমুখী নীতি
দেশে রক্ত ও তার উপাদানগুলির প্রক্রিয়াকরণ খরচের একটি নির্দিষ্ট জাতীয় ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং তা সব বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বাইরের ব্লাড ব্যাঙ্কের অনুমোদন
অনুমোদিত রেজিস্টার্ড ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে আনা রক্তের উপর বেসরকারি হাসপাতালগুলির নিষেধাজ্ঞা জারির প্রবণতা ‘আইনি অপরাধ’ বলে গণ্য করা উচিত।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও অডিট
রক্ত সংগ্রহের উৎস থেকে শুরু করে রোগীর শরীরে প্রবেশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ‘ই রক্তকোষ’-এর মতো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে ১০০% ট্র্যাক করা উচিত, যাতে প্রতিটি ইউনিটের খরচের স্বচ্ছ অডিট সম্ভব হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকীকরণে বেসরকারি হাসপাতালের ভূমিকা অনস্বীকার্য, কিন্তু রক্তের মতো জীবনদায়ী উপাদানের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ মানবতার গোড়াতেই আঘাত করে। রক্তদান একটি সামাজিক আমানত। এটিকে মুনাফা অর্জনের ‘মাধ্যম’ হতে দিলে সাধারণ মানুষের স্বেচ্ছায় রক্তদানের আগ্রহ কমতে বাধ্য। বিগত এক দশকের অভিযোগ ও বাস্তবতার আলোকে এখন সময় এসেছে রক্ত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং কঠোর সরকারি নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার– যাতে রক্তের অভাবে যেমন কারও মৃত্যু না হয়, তেমনই রক্তের নামে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ হয়।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক
sunilmaiti11@gmail.com
