shono
Advertisement

Breaking News

Wild Life

‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’: কেন বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের ‘বিরোধিতা’র সম্পর্ক দরকার হল?

মানুষ দেখাতে চায়, সে অন্য সব জীবজন্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
Published By: Biswadip DeyPosted: 02:04 PM Aug 10, 2026Updated: 02:04 PM Aug 10, 2026

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের এই যে ‘বনাম’ বা ‘বিরোধিতা’র সম্পর্ক, তার কেন দরকার হল? ধৃতিমানের বক্তব্য: মানুষ নিজেকে ‘সুপিরিয়র’ দেখাতে চায়। মানুষ দেখাতে চায়, সে অন্য সব জীবজন্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। লিখছেন ভাস্কর লেট।

Advertisement

১৯৭৫ সালে বেরিয়েছিল স্টিভেন স্পিলবার্গের সিনেমা ‘জস’ (Jaws)। সেখানে ‘গ্রেট হোয়াইট শার্ক’ প্রজাতির একটি হাঙরকে ‘ভিলেন’ রূপে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। লুইস লোসা-র সিনেমা ‘অ্যানাকোন্ডা’ রিলিজ করে ১৯৯৭ সালে। সেখানে ‘ভিলেন’ একটি ভয়াল অ্যানাকোন্ডা। অথচ বাস্তব তথ্য– গ্রেট হোয়াইট শার্ক বা অ্যানাকোন্ডা– কেউই অত আগ্রাসী নয়। মানুষের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলতে ভালোবাসে এরা। পুরুষ অ্যানকোন্ডা মাপে ছোট। ৪ থেকে ৫ ফুট। স্ত্রী অ্যানাকোন্ডা ২০-২২ ফুটের হতে পারে। তবে স্বভাবে অত্যন্ত নির্বিরোধী। আসলে, হাঙর হোক বা সাপ বা অন্য প্রজাতির পশুপাখি– যতক্ষণ না তারা ‘বিপন্ন’ বোধ করছে, বা যতক্ষণ না মানুষ তাদের ‘হ্যাবিট্যাট’ বা বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঢুকে পড়ছে– মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয় না কেউ। অথচ, মানুষের তৈরি ন্যারেটিভে হামেশাই জীবজন্তুর ভয়াল ও বীভৎস স্বভাবের প্রদর্শন ঘটানো হয়। এর কারণ কী?

৮ আগস্ট, শনিবার, সায়েন্স সিটির মিনি অডিটোরিয়ামে এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার ও সংরক্ষণবিদ ধৃতিমান মুখোপাধ্যায়ের লেকচারের বিষয় ছিল– ‘নেচার ফোটোগ্রাফি: মিথ, রিয়েলিটি অ্যান্ড পারপাস’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নেচার ক্লাব’ ও রোটারি সদনের যৌথ উদ্যোগে সাধিত এই অভিভাষণ শুনতে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। এই লেকচারে ধৃতিমান ‘মিথ’ অর্থে যে-বিষয়টিকে চিনিয়ে দিতে তৎপর হয়েছিলেন, তা হল, ‘ন্যারেটিভ’ নির্মাণের কৌশল। মানুষের তৈরি ন্যারেটিভে– মানুষ রয়েছে পূর্ণ কর্তৃত্ববাদী অবস্থানে। প্রকৃতির সঙ্গে পারস্পরিক সহাবস্থানের সম্পর্ক থেকে সরে এসে মানুষ এক ধরনের রেষারেষি ও বৈরী মনোভাবের প্রকাশ ঘটাতে চায় তার তৈরি ন্যারেটিভে। ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’– সুকৌশলে বানানো তেমনই একটি ন্যারেটিভ।

হাঙর হোক বা সাপ বা অন্য প্রজাতির পশুপাখি– যতক্ষণ না তারা ‘বিপন্ন’ বোধ করছে, বা যতক্ষণ না মানুষ তাদের ‘হ্যাবিট্যাট’ বা বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঢুকে পড়ছে– মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয় না কেউ।

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের সঙ্গে এই যে ‘বনাম’ বা ‘বিরোধিতা’-র সম্পর্ক, তার কেন দরকার হল? ধৃতিমানের বক্তব্য: মানুষ নিজেকে ‘সুপিরিয়র’ বা উন্নত দেখাতে চায়। মানুষ দেখাতে চায়, সে অন্য সব জীবজন্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, প্রত্যেককে বশীভূত বা তাঁবেতে রাখতে সক্ষম। ক্ষমতার কাঠামোয় মানুষই শীর্ষে। সিনেমায় যখন একটি হাঙর বা সাপের ভীতিপ্রদ চিত্র তুলে ধরা হয়, তখন আসলে বলতে চাওয়া হয়, মানুষ এ ধরনের বেয়াদব ও বেয়াক্কেলে জীবজন্তুকে শায়েস্তা করতে সক্ষম।

এই ন্যারেটিভের নেপথ্যে রয়েছে বৃহৎ পুঁজির কারসাজি। একটি হাঙর বা সাপের নামে ‘ত্রাস’ তৈরি করে বিনোদনের যে ভিয়েন চাপানো হয়, সে তো পুঁজির অঙ্গুলিহেলনেই ঘটে। আর, এরকম সিনেমা যখন বাচ্চাদের নিয়ে দেখতে যাওয়া হয়, তখন নরম শিশুমনে প্রথমেই ছাপ পড়ে যায়: গ্রেট হোয়াইট শার্ক ভয়ংকর একটি প্রাণী! এমন ভুয়া ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সত্যসন্ধান করা দরকার। দরকার পাল্টা কোনও ন্যারেটিভের, যা ‘বনাম’ কথাটিকে সরিয়ে দিয়ে ‘সহাবস্থান’-কে প্রাধান্য দেবে। শিশুরা জানবে– ‘ম্যান উইথ ওয়াইল্ড’।

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের সঙ্গে এই যে ‘বনাম’ বা ‘বিরোধিতা’-র সম্পর্ক, তার কেন দরকার হল? ধৃতিমানের বক্তব্য: মানুষ নিজেকে ‘সুপিরিয়র’ বা উন্নত দেখাতে চায়। মানুষ দেখাতে চায়, সে অন্য সব জীবজন্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, প্রত্যেককে বশীভূত বা তাঁবেতে রাখতে সক্ষম।

ধৃতিমান বস্তুত অ্যাক্সিডেন্টাল ফোটোগ্রাফার। বাইরের দুনিয়ার অ্যাক্টিভিটি তাঁর ছোট থেকেই ভাল লাগত। তবে ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার হবেন, এমন ভাবতেন না। তারপর জীবনের পথচলায় একদিন মোড় বদলে গেল। ঝাঁপিয়ে পড়লেন ফোটোগ্রাফির জগতে। অনেকখানি সময় নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। আক্ষরিক অর্থেই ‘সেল্‌ফ-টট’, স্বশিক্ষিত। ভুল ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। আর চেয়েছেন ‘নেচার ফোটোগ্রাফি’-কে বিশুদ্ধতম ফর্মে উত্তীর্ণ করতে। ধৃতিমান কোনও ধরনের ওয়ার্কশপ করান না। নিজের নাম বা কালচারাল ক্যাপিটালের বিপণন করেন না। অর্থের বিনিময়ে ফোটোগ্রাফির প্রচারে উৎসাহ দেখান না। ‘নেচার ফোটোগ্রাফি’-কে তিনি ধরে রাখতে চান একমাত্র ছবির মাহাত্ম্যে।

সেজন্য ছবিকে দিয়ে তিনি কথা বলাতে চান। ছবিকে করে তুলতে চান সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ‘মাধ্যম’। ছবির মধ্যে দিয়ে তিনি মানুষের ‘ইমোশন’ বা আবেগের ক্ষরণ ঘটাতে চান। তারপর তৈরি করতে চান ‘অ্যাওয়ারনেস’ বা সচেতনতা। যা প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের ‘বৈজ্ঞানিক সংযোগ’ বা ‘সায়েন্টিফিক কানেকশন’ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। একজন সাধারণ মানুষ তখন দেশের ‘পলিসিমেকার’ বা সংসদীয় কাঠামো ও আমলাশাহির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বোঝাতে পারে– প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য কী কী করণীয়, বা কী কী করণীয় নয়। দেশের উন্নয়নের জন্য ‘সিটিজেন সায়েন্স’-এর চর্চা জরুরি।
এও এক ধরনের আলোকচিত্রীয় দর্শন।

‘মানুষ’-কে অন্য জীবজন্তুরা সমঝে চলে। কারণ, মানুষ বিপজ্জনক! আবার, মানুষ যদি বন্ধুসুলভ আচরণ করে, সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে জীবজন্তুরাও বন্ধু হয়ে ওঠে মানুষের।

লেকচারের সঙ্গে সংগতি রেখে ধৃতিমান দেখান বেশ কিছু স্টিল ফোটোগ্রাফ এবং ভিডিও ফুটেজ। ‘মিথ’ ভাঙেন। ‘রিয়েলিটি’ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করে তুলতে চান শ্রোতৃমণ্ডলীকে। আর, সবচেয়ে জোর দেন, তাঁর ‘নেচার ফোটোগ্রাফি’-র অভিপ্রায় বা ‘পারপাস’ ব্যাখ্যা করতে। তিনি যখন কোনও ভিডিও তৈরি করেন, তার জন্য কোনও সাজানোগোছানো স্ক্রিপ্ট রাখেন না। পরিবেশে সমস্যা কোথায় তা শনাক্ত করতে চান সাংবাদিকসুলভ মন ও অপার ঘ্রাণশক্তি নিয়ে। তারপরে মানুষের স্বার্থে, প্রকৃতির স্বার্থে যা করা বিধেয়– সেই ঔচিত্যবোধ সামনে রেখে শুট শেষ করেন, সেটিকে নির্মেদ চিত্রনাট্যের আধারে তুলে ধরেন।

ছবি তোলার নেশায় বিশ্বের প্রায় সব আনাচকানাচ ঘুরে ফেলেছেন। পছন্দসই ছবির জন্য বারবার গিয়েছেন একই জায়গায়। বুঝেছেন, ‘মানুষ’-কে অন্য জীবজন্তুরা সমঝে চলে। কারণ, মানুষ বিপজ্জনক! আবার, মানুষ যদি বন্ধুসুলভ আচরণ করে, সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে জীবজন্তুরাও বন্ধু হয়ে ওঠে মানুষের। ধৃতিমানের আরও উপলব্ধি: ভারতের যে প্রাকৃতিক বৈচিত্র, তা অতুলনীয়। নব্যপ্রজন্মের দায়িত্ব, এই বৈচিত্রকে রক্ষা করা। এর জন্য ‘বনাম’ জাতীয় শব্দকে আস্তাকুড়ে পাঠাতে হবে। ‘ভরসা’ ও ‘ভালবাসা’-র মতো শব্দ দিয়ে গড়তে হবে আস্থার উপনিবেশ।

(মতামত ব্যক্তিগত)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement