এমন একটি সময় দুই ভাগ্যবান ‘বাংলাদেশি’-কে নিয়ে আলোচনা করছি যখন ‘অনুপ্রবেশ’, ‘এনআরসি’-‘সিএএ’ এই বাংলার বড় ইস্যু। ঘটনাচক্রে দুই নারী ধর্মে মুসলিম হলেও শরণার্থীর সমাদরে রয়েছেন।
প্রথমে ‘অমিল’গুলি বলি। না কি ‘মিল’গুলি আগে বললে অমিলটা সহজে অনুমেয় হবে? দু’জনই বিতর্কিত নারী, নিজের দেশ থেকে পলাতক। দু’জনই নিজ ধর্মের কট্টর মৌলবাদীদের রোষানলে। দুই নারী বাঙালি, তাঁদের আশ্রয় দিয়ে সসম্মানে রেখেছে ভারত সরকার। নিজ-দেশ বাংলাদেশে ফেরার পথ এখনও বন্ধ। একজনের ফাঁসির হুকুম হয়েছে। অপরজনের মাথার দাম অঘোষিতভাবে নির্ধারিত। ফলে নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভারতও চায় না তাঁরা বাংলাদেশে ফিরুন। দু’জনকে এদেশে অতিথির সমাদর দেওয়া হয়েছে।
বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা রয়েছে। আরও একটি মিল না বললেই নয়, দু’জনেই কিন্তু এখনও শত্রুপক্ষের হুমকির সামনে মাথা নত করেননি। ধর্মীয় মৌলবাদের কাছে চাননি ‘ক্ষমা’। অমিলও অনেক। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, একজন নিজের দেশে আশা দেখেন না, অপরজন বাংলাদেশে ফিরতে মরিয়া। একজন পদ্মাপাড়ে আর কোনও ‘কাজ’ বাকি থাকার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী নন। অপরজন অবশ্য মনে করেন, তাঁকে ফিরতেই হবে নিজের ভিটেয়। আবার হাতে নিতে হবে দেশের দায়িত্ব। রক্ষা করতে হবে দল ও দলীয় কর্মী-নেতাদের। ফেরাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ভাবনা আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক অনেক। ঠিক যেমন ফারাক একজন লেখিকা ও একজন রাজনীতিবিদের কার্যকলাপে। তাই একজন কলকাতাকে ‘ঘর’ ভেবে কবিতা লেখেন ঢাকার কথা ভুলে। অপরজন হয়তো লক্ষ্যপূরণে প্রকাশ্যে আসতে তৎপর। এই বৈপরীত্বে অবশ্যই কূটনৈতিক অভিঘাত লুকিয়ে। যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিছু মিল থাকলেও আদতে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) ও তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin) বিপরীত মেরুর মানুষ।
একজনের ফাঁসির হুকুম হয়েছে। অপরজনের মাথার দাম অঘোষিতভাবে নির্ধারিত। ফলে নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভারতও চায় না তাঁরা বাংলাদেশে ফিরুন। দু’জনকে এদেশে অতিথির সমাদর দেওয়া হয়েছে।
হাসিনার এক বিরাট রাজনৈতিক পরিচয় আছে। তিনি বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শুধু নন, বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের নায়ক ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ৩২ ধানমন্ডির বাড়িতে সপরিবার বঙ্গবন্ধু খুন হলেও দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানা বেঁচে যান বিদেশে থাকায়। সেই তুলনায় তসলিমা নাসরিন একজন প্রগতিশীল লেখিকা। তাঁর বংশ পরিচয় আলোচিত হয় না। প্রথম উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর যে অকথ্য অত্যাচার হয়েছিল, তা বইয়ে তুলে ধরে মৌলবাদীদের কোপে পড়েন। তাঁকে হত্যা করার ছক কষা হয়। দেশত্যাগ করে ইউরোপ, অবশেষে ভারতে আশ্রয় নেন বিতর্কিত লেখিকা।
ফাইল ছবি
সাহিত্য মাধুর্যে তসলিমার কলম কালোত্তীর্ণ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি তাঁর লেখার ভক্তও নই। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই তাঁর কলম দুঃসাহসী। মৌলবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ থেকে ‘মেয়েবেলা’, তিনি অকপট। কালক্রমে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও জনপ্রিয় বঙ্গ লেখিকা। আন্তর্জাতিক খ্যাতি এতটাই লাভ করেন যে, গ্রন্থ প্রকাশমাত্র ২০-২৫টি ভাষায় তা অনূদিত হতে থাকে। সেই অর্থে ‘বঙ্গবন্ধু’-কন্যাকে সারা বিশ্ব যেমন চেনে, তেমনই তসলিমারও বিদেশে প্রভূত খ্যাতি। এমন একটি সময় দুই ভাগ্যবান ‘বাংলাদেশি’কে নিয়ে আলোচনা করছি যখন ‘অনুপ্রবেশ’, ‘এনআরসি’ বা ‘সিএএ’ এই বাংলার বড় ইস্যু। পালাবদল হয়েছে। নতুন সরকার এসে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে। ওপার বাংলা থেকে আসা মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে পুশব্যাক করা হচ্ছে, পক্ষান্তরে হিন্দু আশ্রয়প্রার্থীরা পাচ্ছেন নাগরিকত্বের দলিল, ‘শরণার্থী’-র সম্মান। এক্ষেত্রে অবশ্য উলটপুরাণ। ঘটনাচক্রে দুই নারী ধর্মে মুসলিম হলেও শরণার্থীর সমাদরে রয়েছেন। তাঁদের বাকি জীবন যদি ভারতেও কাটে, তাতে কোনও সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। যদিও হাসিনার বয়স প্রায় ৮০-র কাছাকাছি, তুলনায় অনেকটা জীবন পড়ে আছে ৬৩-র তসলিমার।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ৩২ ধানমন্ডির বাড়িতে সপরিবার বঙ্গবন্ধু খুন হলেও দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানা বেঁচে যান বিদেশে থাকায়। সেই তুলনায় তসলিমা নাসরিন একজন প্রগতিশীল লেখিকা।
আজ ৫ আগস্ট। ২ বছর আগে এদিনই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েও দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। আবার ঠিক এই সময় ১৯ বছর পর কলকাতায় অবস্থান করছেন তসলিমা। ১৫ আগস্টের মতোই আজকের দিনটি শেখ হাসিনার কাছে বিভীষিকাময়। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ভারতে পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন ‘গণভবন’ থেকে। একটু দেরি হলে উন্মুক্ত জনতার রোষে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে যেতে পারত। ‘ভারতবন্ধু’ হাসিনাকে কার্যত বাঁচিয়ে দেয় নয়াদিল্লিই। ঠিক সময় এয়ার লিফটিং করে তাঁকে সীমান্ত পার করা হয়। তারপর থেকে দিল্লির একটি গোপন জায়গায় যথাযোগ্য মর্যাদায় রয়েছেন। কিন্তু তিনি এবার দেশে ফিরতে চান। নিজে ঘোষণা করেছেন ডিসেম্বরে ফিরবেন।
হাসিনা পালানোর পর জামায়াতে ইসলামি ও কিছু অর্বাচীন ছাত্রনেতার হাতে পড়ে বাংলাদেশ রসাতলে যাচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতা দখল করে। ১৭ বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান প্রয়াত খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। জামাতের হাত থেকে বাঁচতে নিষিদ্ধ আওয়ামি লীগের সমর্থক ও নেতা-কর্মীরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছিল এই আশায় যে তাঁদের নেত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে। কিন্তু ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর তারেক আওয়ামি লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলেননি। বরং তাঁর সরকার জানিয়ে দিয়েছে– হাসিনা ফিরলেই তাঁকে গ্রেফতার করে ফাঁসির আদেশ কার্যকর হবে। তারেক সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে ভারত সরকার সমর্থন করে না সেটা সবার জানা।
দুই নারী ধর্মে মুসলিম হলেও শরণার্থীর সমাদরে রয়েছেন। তাঁদের বাকি জীবন যদি ভারতেও কাটে, তাতে কোনও সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। যদিও হাসিনার বয়স প্রায় ৮০-র কাছাকাছি, তুলনায় অনেকটা জীবন পড়ে আছে ৬৩-র তসলিমার।
৫ মাস পর সরকারের ‘মধুচন্দ্রিমা’ পর্ব শেষ। বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে ক্রমশ সমস্যার মুখে পড়ছেন তারেক। ঢাকা যেভাবে দিল্লিকে এড়িয়ে চলছে, তাতে ভারত খুশি নয়। আবার তারেকের চিনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে আমেরিকাও ক্ষুব্ধ। তারেকের চিন সফরের পরই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা সফররত ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নয়াদিল্লির রাষ্ট্রদূত দিনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। সমস্যা বাইরে শুধু নয়, ঘরেও। সরকার চালাতে গিয়ে প্রবল সংকটে পড়েছে বিএনপি। নানা কারণে জনরোষ বাড়ছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ছিল বড় ইস্যু। এর সঙ্গে জুড়েছে গ্যাস ও তেলের অপ্রতুলতা। বিদ্যুৎ কতক্ষণ থাকবে ঠিকঠিকানা নেই। জেন জি-সহ সাধারণ দেশবাসীর মধ্যে ক্ষোভ চড়ছে। ঠিক এই সময় হাসিনা ইস্যু ও আমেরিকার ভূমিকা ঢাকার মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারেক মনেপ্রাণে চান না হাসিনা ঢাকায় আসুন। কারণ, তাতে সমস্যা বেশি। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি হাসিনা ঢাকায় এলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করতে গেলে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সেই প্রেক্ষিতে বলা যায়, ২ বছর অন্তরালে থাকার পর একটু হলেও সুবিধাজনক জায়গায় ফিরতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। আগামী কয়েক মাস তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঠিক এই সময়ই কলকাতায় এলেন তসলিমা নাসরিন। বাম আমলে তাঁকে এই শহর ছাড়তে হয়। তৃণমূল আমলেও তিনি ফিরে আসার ডাক পাননি। তাঁকে কলকাতা ফেরার সুযোগ করে দিল নতুন বিজেপি সরকার। মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে সরব তসলিমাকে বরাবর পছন্দ করে আরএসএস। পালাবদলের সুযোগে তাঁকে অবশেষে কলকাতায় আনা হল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে স্বাগত জানালেন।
তসলিমা নাগরিক সংবর্ধনা পেলেন, কফি হাউসে গেলেন, আড্ডা দিলেন, কলকাতাকে নিয়ে নিজের কবিতা পাঠ করলেন। তাঁর মঞ্চে জয় গোস্বামীর উঠতে না-পারা নিয়ে বিতর্কের অংশটুকু বাদ দিলে প্রিয় শহরে ভালই কাটল তসলিমার। কিন্তু এও সত্য, তাঁকে নিয়ে সামান্য আগ্রহ দেখাল না এখনকার নবীন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। তেমন অনুরণন নেই কবি-সাহিত্যিক মহলেও। সেটা একটা দিক, অন্য দিকটাও হল এই যে, বাংলাদেশে হিন্দু নিধন নিয়ে তসলিমার লেখা এখন ৩০ বছর পরও প্রাসঙ্গিক। এখনও অত্যাচার হচ্ছে। উপমহাদেশে সমান প্রাসঙ্গিক মৌলবাদ।
সাম্প্রদায়িকতার ‘দ্বিখণ্ডিত’ সমাজে শেখ হাসিনা আর তসলিমা নাসরিনের মধ্যে কোথাও একটা মিলে আমাদের স্বার্থ আছে। বিপরীত পরিবেশ হলেও সময় তাঁদের মিলিয়ে দিল। অমিল আর মিলের ভিড়ে দুই বাংলাদেশি নারী এবং ভারত, কূটনীতির চেয়েও এগিয়ে রাখলাম রাজনীতিকেই।
