Advertisement

সম্পর্কের ভিন্ন অর্থ বোঝাল ব্রাত্য বসুর ‘ডিকশনারি’, পড়ুন ফিল্ম রিভিউ

08:10 PM Mar 24, 2021 |
Advertisement
Advertisement

নির্মল ধর: পাঠকপ্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহ (Buddhadeb Guha) কোনোদিনই প্রযোজক ও পরিচালকদের প্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর লেখায় তথাকথিত জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক উপাদান কম থাকে না, তবুও টালিগঞ্জের তেমন কেউ ওঁর লেখার দিকে নজর ফেলেন না। এবার ফেললেন পরিচালক ব্রাত্য বসু এবং প্রযোজক ফেউদৌসুল হাসান। বুদ্ধদেবের লেখা পুরনো দু’টি গল্প ‘বাবা হওয়া’ আর ‘স্বামী হওয়া’কে সুন্দর ভাবে মিশিয়ে একটি গল্পের কাঠামোয় বেঁধেছেন দুই নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় ও ব্রাত্য নিজে। দুজনেই নাট্য জগতের হওয়ায় চিত্রনাট্যের বাঁধুনিতে রয়েছে নাটকের দৃশ্যান্তরের ছাপ। কাটা কাটা ছোট ছোট দৃশ্য নিয়ে সময়ের খেলা। তবে অবশ্যই সেই যাতায়াত খুবই মসৃণ, সাবলীল এবং স্বাভাবিক। এটাই ছবির গতিশীলতা বাড়িয়েছে।
পুরো ছবির দু’টো ভাগ – একদিকে কিশোরী কন্যাকে নিয়ে ফরেস্ট অফিসার অশোক (আবির চট্টোপাধ্যায়) ও স্মিতার (নুসরত জাহান) পুরুলিয়ায় সংসার। অন্যদিকে কলকাতায় ঢালাইয়ের ব্যবসা থেকে বড় শিল্পপতি হওয়ার লক্ষ্যে অর্ধশিক্ষিত মকরক্রান্তির (মোশারফ করিম) ব্যর্থ উত্থানের চেষ্টা। স্বামী শাসিত স্ত্রী শ্রীমতী (পৌলমী বসু) ও উঠতি বয়সের ছেলে রাকেশকে নিয়ে সাজানো উচ্চবিত্তের সংসার। যেখানে ছেলেকে সাহেবি কেতার ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করার স্বপ্ন বাবার। আর ছেলের ইচ্ছে ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার। এই দু’টি পরিবারের যোগসূত্র হয় শ্রীমতীর ছোট ভাই অধ্যাপক সুমন (অর্ণ মুখোপাধ্যায়)। যে কিনা পুরুলিয়ায় কলেজে পড়াতে গিয়ে লোকাল গার্জেন হিসেবে পেয়ে যায় কলেজের সিনিয়র অশোক ও তাঁর স্ত্রী স্মিতাকে।

Advertisement

[আরও পড়ুন: লাঠির জবাবে লাড্ডু! এসএফআইয়ের অভিনব প্রতিবাদের ভিডিও শেয়ার করলেন শ্রীলেখা]

স্মিতা ও সুমনের প্রেম যে কখন হল সেটা কিন্তু পরিষ্কার নয়। তবে ব্রাত্যর চিত্রনাট্য সেখানে জোর দেয়নি। তার বদলে যোগসূত্রটি নিয়েই খেলেছেন পরিচালক-চিত্রনাট্যকার। ভাইকে বউদির আঁচল থেকে সরিয়ে নিজের পছন্দের নবনীতার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয় দিদি শ্রীমতী। সুমনও তেমন আপত্তি করে না। সুমনের প্রতি স্ত্রীর দুর্বলতার বিষয়টি বুঝতে পেরেও অশোক নীরবে গুমরে থাকে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সুমনের বিয়ে হলে স্মিতা অনুতাপ নিয়ে ফিরে আসে স্বামীর কাছেই। আর বাবার ভুল ইংরেজির জ্ঞান ভাঙিয়ে দিয়ে ছেলে রাকেশ বাবাকে প্রকৃত বাবা করে তোলে। সেখানে অবশ্য অভিধান অর্থাৎ ‘ডিকশনারি’র (Dictionary) ভূমিকাটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘নেভ’ (Knave) শব্দটির প্রকৃত অর্থ (চিটিংবাজ) জানার পর বাবার দৃষ্টিভঙ্গি পালটায়। তবে পাশাপাশি অভিধান খুলে ‘স্বামী’ শব্দের অর্থ ‘মাস্টার’ জানিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল কি? ওখানেই ‘ডিকশনারি’ ব্যবহার করা যেত মনে হয়। ‘স্বামী’ শব্দের অর্থ খুঁজতে অভিধান না দেখিয়ে কম্পিউটার দেখালে সঠিক হত। 
কলকাতার ঘরোয়া পরিবেশ এবং পুরুলিয়ায় রুক্ষ গ্রামের একধরনের কনট্রাস্ট তৈরি করা হয়েছে ছবির চেহারায়। শীর্ষ রায়ের ক্যামেরা সেই পার্থক্যকে চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সুন্দর কাজে লাগিয়েছেন। তবে সকলের ট্রেনে কলকাতায় গিয়ে আবার সন্ধ্যার ট্রেনে পুরুলিয়ায় ফেরার জন্য সুমনের হতে অত বড় একটা ট্রলিব্যাগ কেন? সন্ধ্যা ও রাতের কন্টিনিউইটির ব্যাপারটায় একটু গণ্ডগোল রয়েছে। শাল-পিয়ালের জঙ্গলে সুমন-স্মিতার নীরব রোমান্টিক দৃশ্যের সঙ্গতে প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসংগীতের ব্যবহার সুপ্রযুক্ত।
তবে এই ছবির প্রধান আকর্ষণ দু’জন – মকরক্রান্তির চরিত্রে বাংলাদেশী অভিনেতা মোশারফ করিম (Mosharraf Karim) এবং অশোকের ভূমিকায় আবির চট্টোপাধ্যায় (Abir Chatterjee)। মোশারফ ছাড়া মকরক্রান্তির চরিত্রটি অন্য কেউ করতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর আবিরের অত্যন্ত সংযত ধীর স্থির অভিনয় অশোককে বিশ্বস্ত করে তুলেছে। তবে নুসরতের (Nusrat Jahan) সঙ্গে তাঁর বয়সের ফারাকটা বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। অর্ণ সুমন হিসেবে স্বাভাবিক। শ্রীমতীর চরিত্রে পৌলমী বসু শান্ত, ভীতু, পরিপাটি স্ত্রীর চরিত্রে সাবলীল। ব্রাত্যর পুরনো ছবি ‘রাস্তা’র স্মৃতি মনে এলে এই ‘ডিকশনারি’ নিশ্চয়ই বাণিজ্যের সঙ্গে সমঝোতার ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়, আবার একই সঙ্গে তাঁর ভারসাম্য রেখে কাজ করার প্রয়াসের প্রশংসা সরিয়ে রাখা যায় না। ভারসাম্যের এই খেলায় তিনি এই কয়েক বছরে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছেন, স্বীকার করতেই হবে।

[আরও পড়ুন: সলমন খানের ‘ঘোড়া’ কিনতে গিয়ে ১২ লক্ষ টাকা খোয়ালেন রাজস্থানের মহিলা!]

Advertisement
Next