কলকাতার বুকে এক মায়াময় সন্ধ্যা। যেখানে সুরের সেতু বেয়ে মিলে গেল লন্ডন আর কলকাতা। উপলক্ষ? উপনিষদের আলোয় রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে চেনা। বিশ্বকবির গানের অন্তরে যে গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে, তার উৎস তো উপনিষদের মন্ত্রেই। গত ২৬ মে ভারতীয় জাদুঘরের প্রেক্ষাগৃহে যেন সেই সত্যই মূর্ত হল এক বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানে। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ডাঃ আনন্দ গুপ্ত এবং তাঁর সংস্থা ‘দক্ষিণায়ণ ইউকে’-র যৌথ উদ্যোগে পরিবেশিত হল ‘টেগোর অ্যান্ড জার্নি উইথ দ্য উপনিষদ’।
বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ডাঃ আনন্দ গুপ্ত।
রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গান মানেই এক নিরাকার, সর্বব্যাপী ঈশ্বরের আরাধনা। জলে, স্থলে, শূন্যে বিরাজমান সেই পরম ব্রহ্মের বন্দনাই বারে বারে ফিরে এসেছে কবির সৃষ্টিতে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে রাজা রামমোহন রায়ের একেশ্বরবাদের ভাবধারা কবিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ২২ মে ছিল রামমোহনের জন্মবার্ষিকী। সেই আবহকে ছুঁয়েই এদিন জাদুঘরের মঞ্চে ধ্বনিত হল ব্রহ্মসঙ্গীতের পবিত্র সুর।
লন্ডনের মাটিতে বসেও দীর্ঘ দুই দশক ধরে রবীন্দ্রচর্চাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছেন ডাঃ আনন্দ গুপ্ত। কলকাতার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘দক্ষিণী’-র আদলে ২০০২ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘দক্ষিণায়ণ ইউকে’। শৈলজারঞ্জন মজুমদার, মায়া সেন থেকে শুরু করে সুদেব গুহ ঠাকুরতা, রণো গুহ ঠাকুরতার যোগ্য উত্তরসূরি আনন্দবাবু এদিনও শ্রোতাদের মুগ্ধ করলেন। তাঁর গলায় ‘চিরসখা ছেড়ো না’ গানটি যেন এক অন্য আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে গেল উপস্থিত সকলকে। সঙ্গে রঘুনাথ দাসের অনবদ্য নৃত্য পরিবেশনা চোখ জুড়িয়ে দিল।
নিজস্ব ছবি।
অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনাতেই ছিল আন্তরিকতার ছোঁয়া। রণিত কুড়ির কণ্ঠে ‘তোমার অসীমে’, সৌগত শঙ্খ বণিকের ‘শৃণ্বন্ত বিশ্বে’ এবং শ্রীধারা গুপ্তর গলায় ‘সোনার পাখি ছিল’ গানগুলি শ্রোতাদের মনে গভীর রেখাপাত করে। গানের পাশাপাশি ডোনা গাঙ্গুলি ও রঘুনাথ দাসের পরিচালনায় ‘দীক্ষা মঞ্জরি’-র শিল্পীদের কোরিওগ্রাফি গোটা অনুষ্ঠানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। সমগ্র অনুষ্ঠানের সঙ্গীত আয়োজনে সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তালবাদ্যে বিপ্লব মণ্ডলের যুগলবন্দি ছিল অনবদ্য। সুর আর দর্শনের এই মেলবন্ধন কলকাতার সংস্কৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে বহু দিন থেকে যাবে।
