নাগা কিং চিলি দুনিয়ার অন্যতম ঝাল মরিচ। খাবারে অল্প পরিমাণে দিলেই জিভ লাল। কেউ বলেন ভূত জলকিয়া, কারও কথায় চাইনিজ ক্যাপসিকাম। যে নামেই ডাকুন নাগা মরিচ বিপাকক্রিয়া বাড়ায়। অসুখ-বিসুখেও উপকারী। লিখেছেন মেঘালয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গ্রামোন্নয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈকত মজুমদার
নাগা কিং চিলি বিশ্বের অন্যতম ঝাল মরিচ। এটি ভারতের নাগাল্যান্ড ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চলে উৎপন্ন হয়। এর ঝাল মাত্রা খুব বেশি হওয়ায় অল্প পরিমাণেই খাবারে তীব্র ঝাল যোগ হয়। কাঁচা অবস্থায় মরিচটি সবুজ এবং পাকলে লাল রং ধারণ করে। স্থানীয় মানুষজন এটি তরকারি, আচার ও চাটনি তৈরিতে ব্যবহার করে। স্বাদে তীব্র ঝাল হলেও এর বিশেষ গন্ধ ও স্বাদ এটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
নাগা মরিচ (King Chilli), যা ভূত জলোকিয়া (Bhut Jolokia), চাইনিজ ক্যাপসিকাম বা গোস্ট পেপার নামেও পরিচিত, বিশ্বের অন্যতম ঝাল মরিচ। এটি মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে নাগাল্যান্ড, অসম এবং মণিপুরে চাষ হয়। নাগাল্যান্ড সরকার এই মরিচের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) ট্যাগ পেয়েছে। নাগা মরিচে স্কোভিল হিট ইউনিট (SHU): প্রায় ১০ লাখ (1,000,000+) তুলনা হিসাবে, সাধারণ কাঁচা মরিচের ঝাল থাকে প্রায় ৩০,০০০–৫০,০০০ SHU।
রান্নায় ভূত জলোকিয়ার ব্যবহার খুবই সীমিত হলেও এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক। অল্প পরিমাণেই খাবারে তীব্র ঝাল যোগ করতে পারে। এটি আচার, চাটনি ও বিভিন্ন মাংসের পদে ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে শুকিয়ে গুঁড়ো করেও সংরক্ষণ করা হয়। তবে ব্যবহার করার সময় হাতমোজা পরা উচিত, কারণ এর ঝাল ত্বক ও চোখে তীব্র জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকে ভূত জলোকিয়ায় ক্যাপসাইসিন নামক উপাদান থাকে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়াতে সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। তবে অতিরিক্ত সেবনে পেটের সমস্যা, জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই বাঞ্ছনীয়।
সবশেষে বলা যায়, ভূত জলোকিয়া শুধু একটি মরিচ নয়, বরং এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি ও কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর তীব্র ঝাল ও বিশেষ স্বাদের কারণে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ও সমাদৃত। নাগা মরিচ ২০০৫ সালে নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল লঙ্কা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
নাগা মরিচ ও স্বাস্থ্য প্রভাব
ভালো দিক:
- নাগা মরিচ বিপাকক্রিয়া বাড়ায়।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই নাগা মরিচ সর্দি-কাশিতে সাময়িক আরাম দিতে পারে।
সতর্কতা:
- অতিরিক্ত খেলে পেট জ্বালা, বমি, ডায়েরিয়া হতে পারে নাগা মরিচ বেশি খেলে।
- চোখ বা ত্বকে লাগলে তীব্র জ্বালা করে যদি নাগা মরিচের গুড়ো লাগে।
নাগা মরিচ চাষ পদ্ধতি
নাগা মরিচ চাষের জন্য কিছু বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়:
মাটি ও জলবায়ু
মাটি: গভীর, আলগা দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটি এই চাষের জন্য উপযুক্ত। মাটিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ থাকতে হবে এবং মাটির pH ৫.৫-৬.০-এর মধ্যে হলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
জলবায়ু: নাগা মরিচ উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মায়। এটি সরাসরি প্রখর রোদ সহ্য করতে পারে না, তাই আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে চাষ করা ভালো।
নার্সারি তৈরি ও চারা রোপণ
বীজবপন: সাধারণত জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বীজ বপন করা হয়। বীজতলা আংশিক ছায়ায় তৈরি করা উচিত। বীজের দ্রুত অঙ্কুরোদগমের জন্য বীজতলায় জৈব সার (যেমন গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট) ব্যবহার করা যেতে পারে।
চারা রোপণ: প্রায় ৪০-৬০ দিন বয়সি চারা মূল জমিতে রোপণ করা হয়। পাহাড়ি এলাকায় সাধারণত বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসে চারা রোপণ করা হয়। সমতলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসেও চাষ করা যায়।
ব্যবধান: সারি থেকে সারি এবং গাছ থেকে গাছের মধ্যে সাধারণত ৭৫x৭৫ সেমি থেকে ৯০x১০০ সেমি দূরত্ব রাখা হয়।
৩. সার প্রয়োগ
জমি তৈরির সময় হেক্টর প্রতি ৯-১০ টন ভালোভাবে পচানো গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট প্রয়োগ করা উচিত।
রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার (যেমন অ্যাজোটোব্যাক্টর) ব্যবহার করলে ভালো ফলন পাওয়া যায় এবং মরিচের ঝাল বেশি হয়।
৪. পরিচর্যা
জলসেচ: নিয়মিত জলসেচ প্রয়োজন, বিশেষ করে ফুল ও ফল আসার সময়।
রোগ দমন: বীজ বপনের আগে ট্রাইকোডার্মা পাউডার দিয়ে বীজ শোধন করে নিলে রোগের আক্রমণ কম হয়।
আগাছা দমন: নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
৫. ফসল তোলা
চারা রোপণের প্রায় ৬০-৭০ দিন পর ফসল তোলার জন্য প্রস্তুত হয়।
ফলন জুন মাস থেকে শুরু হয় এবং প্রায় ৩ মাস ধরে চলতে পারে।
বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সবুজ, হলুদ বা সম্পূর্ণ পাকা অবস্থায় মরিচ সংগ্রহ করা যায়।
টবে নাগা মরিচ চাষ
নাগা মরিচ বা ভূত জলোকিয়া টবেও খুব ভালো হয়, সঠিক রোদ, মাটি ও যত্ন পেলেই প্রচুর ফল দেয়।
টব নির্বাচন
আকার: চাষিদের কমপক্ষে ১২–১৬ ইঞ্চি গভীর ও চওড়া টব নিতে হবে। দেখতে হবে যাতে নিচে ড্রেনেজ হোল থাকে।
চাষিরা যদি মাটির টব জোগাড় করতে পারে, খুব ভালো হয়।
মাটির মিশ্রণ যেন খুব ভালো হয়, তাতে জল নিয়ন্ত্রণ ভালো হয়(ড্রেনেজ ভালো হওয়া জরুরি)
আদর্শ মাটি তৈরি:
চাষিদের টবে চাষ করার আগে খুব ভালো করে মাটি তৈরি করে নিতে হবে।
৫০% দোআঁশ মাটি
৩০% পচা গোবর/কম্পোস্ট
২০% বালি বা কোকোপিট
এক মুঠো হাড়ের গুঁড়ো বা সরিষার খোলের সার মেশালে ফলন বাড়ে।
এই সব উপকরণ খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করে টবে চাষ করতে হবে।
বীজ বপন ও চারা রোপণ
চাষিদের বীজ ½ ইঞ্চি গভীরে বপন করতে হবে।
৭–১৫ দিনে চারা গজাবে।
চারা ৪–৬ ইঞ্চি হলে বড় টবে প্রতিস্থাপন করতে হবে
প্রতিটি টবে ১টি গাছ রাখাই ভালো, এটা চাষিদের লক্ষ রাখতে হবে, বেশি চারাগাছ দিলে উৎপাদন কমে যেতে পারে।
রোদ ও তাপমাত্রা
প্রতিদিন ৬–৮ ঘণ্টা সরাসরি রোদ পায় এমন কোনও জায়গা চাষিদের নির্বাচন করতে হবে ভালো উৎপাদন হবার জন্য
২০–৩০°C তাপমাত্রা ভালো এই চাষের জন্য
শীতে ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচাতে রোদযুক্ত স্থানে টব রাখতে হবে।
জল দেওয়া
মাটি শুকিয়ে এলে জল দিতে হবে, তার আগে না।
জল যেন টবে না জমে, এটি দেখতে হবে।
গরমে প্রতিদিন হালকা, শীতে ২–৩ দিনে একবার টবে জল দিতে হবে।
সার প্রয়োগ
১৫ দিনে একবার তরল জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
ফুল আসার সময় পটাশ সমৃদ্ধ সার দিতে হবে
বেশি নাইট্রোজেন দিলে পাতা বাড়বে, ফল কম হবে, এটি দেখতে হবে
পরিচর্যা ও রোগবালাই
শুকনো পাতা কেটে ফেলতে হবে
এফিড/মাকড়সা হলে নিম তেল স্প্রে করতে হবে
গাছ বড় হলে খুঁটি দিতে হবে
ফল সংগ্রহ
রোপণের ৯০–১২০ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহ করতে হবে
সবুজ থেকে লাল/কমলা হলে পাকা
ফল তোলার সময় হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
