নিজেকে শাড়িপ্রেমী পরিচয় দিলে জানতেই হয় ভারতের এই ৫ GI-স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইলের কথা (GI-Tagged Indian Sarees)। বর্তমানে হরহামেশাই অতিসাধারণ মানের কাপড়কে ভারিক্কি নাম দিয়ে বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষত অনলাইন শপিংয়ের ক্ষেত্রে রয়ে যায় এমন সম্ভাবনা। বিপত্তি এড়াতে চাইলে সময় থাকতে চিনে নিন ভারতের এই ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইলগুলিকে।
ভারতীয় বুননশিল্প নিঃসন্দেহে প্রসংসনীয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতিরা এমন সব কাপড় তৈরি করে আসছেন, যার নকশা, বুনন ও কারিগরি কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সংস্কৃতির বাহক। এই আঞ্চলিক পরিচয়কে স্বীকৃতি দিতেই ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI স্বীকৃতির ব্যবহার হয়।
কাঞ্জিভরম সিল্ক। চন্দেরি।
বেনারসি
বিয়ের পোশাক বললেই বেনারসি শাড়ির নাম সবার আগে আসে। উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই শাড়ি ২০০৯ সালে GI স্বীকৃতি পায়। বেনারসির আসল সৌন্দর্য তার জরি-সমৃদ্ধ বুননে। রেশমের জমিতে সোনালি বা রুপালি জরি দিয়ে তৈরি হয় ফুল, লতা, পাতা ও নানা জ্যামিতিক নকশা। মুঘল শিল্পের প্রভাবও বেনারসির নকশায় স্পষ্ট।
কাঞ্জিভরম সিল্ক
তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরম অঞ্চলের সঙ্গে এই শাড়ির ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত। ২০০৫–০৬ সালে তা GI স্বীকৃতি পায়। দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য, ধর্মীয় প্রতীক ও প্রকৃতিই এই শাড়ির নকশার মূল অনুপ্রেরণা। যেমন, রুদ্রাক্ষম (রুদ্রাক্ষের নকশা), গোপুরম (মন্দিরের প্রবেশদ্বারের আদল), ময়িলকান (ময়ূরের চোখ), কুইলকান (কোকিলের চোখ) প্রভৃতি।
বুননপ্রক্রিয়াতেও রয়েছে বিশেষত্ব। কাঞ্চিভরমের শাড়ির মূল অংশ এবং আঁচল আলাদাভাবে বোনা হয়ে, পরে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে পাড় ও আঁচলের গঠন হয় বেশ দৃঢ় এবং শাড়িটি পায় তার স্বতন্ত্র ভার ও সৌন্দর্য।
চন্দেরি
মধ্যপ্রদেশের চন্দেরি অঞ্চলের এই শাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল তার স্বচ্ছ বুনন। শরীরে জড়ালে মনে হয় যেন কাপড়টি বাতাসের মতো হালকা। চন্দেরি শাড়ি ২০০৫ সালে GI স্বীকৃতি পায়। নকশাতেও রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্য। ছোট মুদ্রার মতো নকশা, ফুল, ময়ূর এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক মোটিফ চন্দেরিতে দেখা যায়। অতীতে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজপরিবারে এই কাপড়ের বিশেষ কদর ছিল।
পোচমপল্লি ইকত
তেলেঙ্গানার ভুদান পোচমপল্লি অঞ্চলের এই বুননশিল্প ২০০৪ সালে GI স্বীকৃতি পায়। ইকতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর বুননপদ্ধতি। প্রথমে সুতোকে নির্দিষ্ট জায়গায় শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর সুতো রং করা হয়। বাঁধা অংশে রং ঢুকতে পারে না। এরপর বিভিন্ন রঙের সুতো তাঁতে বসিয়ে বোনা হলে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে নির্দিষ্ট নকশা। অর্থাৎ নকশাটি পরে কাপড়ের উপর ছাপা হয় না। নকশাটি তৈরি হয় সুতোতেই। সামান্য ভুল হলেই নকশা বেঁকে যেতে পারে।
পোচমপল্লির নকশায় হীরে, জ্যামিতিক আকৃতি, ফুল, পাখি ও হাতির মতো মোটিফ দেখা যায়। উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারও এই শাড়ির অন্যতম আকর্ষণ।
পোচমপল্লি ইকত। পাটন পাটোলা।
পাটন পাটোলা
সবচেয়ে জটিল ও সময়সাপেক্ষ বুননশিল্পগুলির অন্যতম এটি। গুজরাটের পাটন শহরের সঙ্গে যুক্ত এই রেশমি শাড়ি তৈরি হয় ডবল ইকত পদ্ধতিতে। অর্থাৎ তাঁতের লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি—দুই ধরনের সুতোই নকশা অনুযায়ী বাঁধা ও রং করা হয়। তারপর তাঁতে বসিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মিলিয়ে বোনা হয়। পাটন পাটোলা ২০১৩ সালে GI স্বীকৃতি পায়।
এই শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। একসময় পাটোলা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং অভিজাতদের পোশাক। আজও একটি উন্নতমানের পাটন পাটোলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে রেখে দেওয়ার মতো পারিবারিক সম্পদ।
