shono
Advertisement
Mount Kailash

এভারেস্টের চেয়ে উচ্চতা কম, তবু কোন রহস্যে পৌঁছনো যায় না শিব-পার্বতীর বাসস্থান কৈলাসে?

Published By: Biswadip DeyPosted: 06:06 PM Mar 14, 2026Updated: 06:06 PM Mar 14, 2026

'কৈলাসে পর্বতে রম্যে নানারত্নোপশোভিতে।/ তত্র দেবো মহাদেবঃ পার্বত্যাঃ সহ তিষ্ঠতি।।'... শিব পার্বতীর সঙ্গে বাস করেন নানা রত্নে সজ্জিত কৈলাস পর্বতে। এই বর্ণনা আমরা পাই শিব পুরাণে। তিব্বতের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই পর্বত পৌরাণিক এক আশ্চর্য আলোয় ঢাকা রহস্যের কেন্দ্র। এমন রহস্যময় পর্বত সম্ভবত সমগ্র পৃথিবীতে আর একটিও নেই। মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করে ফেলেছেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু কৈলাস আজও দুর্লঙ্ঘ! এর শৃঙ্গে এখনও পর্যন্ত কেউই পা রাখতে পারেননি। কিন্তু কেন?

Advertisement

শুরুতে রাশিয়ার ডক্টর আর্নেস্ট মুল্ডাশেভের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৯৯ সালে তিনি ও তাঁর দল গিয়েছিলেন কৈলাস বিজয়ে। কয়েক সপ্তাহ পরে তাঁরা ফিরেও যান। আর ফিরে গিয়েই দাবি করেন, কৈলাস এক রহস্যময় পর্বত। এখানে সময় এক অন্য ছন্দে স্পন্দিত হতে থাকে। বয়স বাড়ে দ্রুত! কেবল মুল্ডাশেভ নন, এমন দাবি আরও বহু অভিযাত্রীই করেছেন। এখানে নাকি নখ-চুল হু হু করে বেড়ে চলে! মুল্ডাশেভ দাবি করেছিলেন, কৈলাস আসলে প্রাচীনতম পিরামিড! তা মোটেই প্রাকৃতিক নয়। এই পাহাড় নাকি ফাঁপা! ভিতরে রয়েছে অসংখ্য গুহা। যেখানে আজও ধ্যানস্থ আদিম সভ্যতার প্রতিনিধিরা। যেন পৃথিবীর মাঝেই এক অন্য ভুবন। ধরিত্রীর কোলেই অবস্থিত এক স্বর্গীয় অঞ্চল। এই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। কেবল আশ্চর্য সব লোকশ্রুতি ভেসে আসতে থাকে। কৈলাস নাকি ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রস্থল!

নেপালের ভাষায় গাং রিনপোচে। বাংলায় সেটাই কৈলাস। এর পাদদেশে রয়েছে মানস সরোবর ও রাক্ষসতাল হ্রদ। প্রথমটির জল স্বাদু মিষ্টি। দ্বিতীয়টির জল লবণাক্ত। মানস সরোবরে স্নান করেন দেবতারা। নাম থেকেই পরিষ্কার রাক্ষসতাল হ্রদে স্নান করেন রাক্ষসরা! এই হ্রদেই শিবের উদ্দেশে ধ্যান করেছিলেন কর্বুররাজ রাবণ। এশিয়ার চারটি প্রধান নদী— সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র এবং কর্ণালী এর অদূরেই উৎপত্তি লাভ করেছে। যা এর রহস্যময়তাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।

কেবল হিন্দুধর্ম নয়, অন্য ধর্মের সঙ্গেও যোগ রয়েছে কৈলাসের। বৌদ্ধদের বিশ্বাস এই পাহাড়েই ধ্যানস্থ দেবতা হেরুকা চক্রসাম্ভারা। পাশাপাশি জৈন কিংবা তিব্বতের স্থানীয় বন ধর্মেও রয়েছে কৈলাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। চির নৈঃশব্দ্যে ঢাকা ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার দীর্ঘ এই পর্বতকে ঘিরে তাই লোকশ্রুতির অবধি নেই। এর চেয়েও ২ হাজার মিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্য এভারেস্টের! কত মানুষ তো একাধিক বার সেখানে গিয়েছেন। কেবল এভারেস্টই বা কেন, কৈলাসের চেয়ে উচ্চ শৃঙ্গ আরও অসংখ্য রয়েছে। তাহলে কেন কৈলাসের শৃঙ্গে মানুষের পা পড়ল না আজও? অবশ্য শোনা যায়, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মিলারেপা নাকি অতীতে কৈলাসের শৃঙ্গে পা রেখেছিলেন। কিন্তু আসলে তা এক মিথ বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। এমনও মনে করা হয়, ওই আরোহণ আসলে আধ্যাত্মিক আরোহণ। একে 'বাস্তব' না ভাবাই শ্রেয়।

বলা হয়, কৈলাসে আপনি আরোহণ করতে গেলে কোনও না কোনও ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হবেন। হবেনই। নানা আশ্চর্য কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে। শোনা যায়, সাইবেরিয়ার একদল অভিযাত্রী নাকি পর্বতে ওঠার পর কিছুটা এগোতেই আচমকা বুড়ো হয়ে যেতে থাকেন! মাত্র ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানেই কেটে যায় বেশ অনেকগুলো বছর! অনেকটা সেই 'ইন্টারস্টেলার' ছবির গ্রহটির মতো। সত্যিটা কী জানা যায় না, কিন্তু রাতারাতি বুড়িয়ে গিয়ে তাঁরা পালিয়ে আসেন মাঝপথেই। কৈলাস থেকে যায় কৈলাসের মতোই। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

এমনও শোনা যায়, কৈলাসে আচমকা নাকি বদলে যায় আবহাওয়া! যাঁরা এগোতে চান শৃঙ্গের দিকে, তাঁরা দেখেন তুষারপাত শুরু হয়ে গিয়েছে! অথচ খানিক আগেও ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন! এমনকী আচমকাই এগোতে এগোতে দেখা যায় ফাটল! এই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হয় না। ফিরে আসতে হত দ্রুত।

অনেকেই মনে করেন আধ্যাত্মিকতার আবরণ অনেক সময়ই কৈলাসকে দুর্লঙ্ঘ করে তোলে। পর্বতারোহীদের মনের ভিতরে ছড়িয়ে থাকা ধর্মীয় আখ্যানের রহস্যময়তাই হয়ে উঠতে থাকে বড় ফ্যাক্টর। এমনকী এখানে গোপন কোনও চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে এমন দাবিও করেছেন অনেকে। যদিও বিজ্ঞানীরা তেমন কোনও প্রমাণ পাননি। তবে সেই অর্থে নাকচও করে দেওয়া যায়নি এই থিওরি। কিন্তু সবটাই রয়েছে 'সম্ভবত'র আড়ালে। আরেকটা বিষয় রয়েছে। কৈলাসের ঢালগুলি অত্যন্ত খাড়া (৬০ ডিগ্রিরও বেশি)। তাই এখানে আরোহণ এত কঠিন বলে বোধ হয়।

চিন প্রশাসন এই পাহাড়ে ওঠা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে অভিযাত্রীদের জন্য। তীর্থযাত্রীরা অনুমতি পান চারপাশে প্রদক্ষিণ করার। মানস সরোবর যাত্রা বা কৈলাস পরিক্রমার অনুমতি থাকলেও আরোহণ করার অনুমতি নেই। ধর্মীয় অনুভূতি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। তাই এখন এই পর্বতে উঠতে গেলে কার্যতই তা হবে বেআইনি প্রয়াস। আর এই কারণেই কৈলাসে আরোহণ হয়ে গিয়েছে আরও কঠিন। তাহলে কি কৈলাস নিজেই চায় সকলের স্পর্শরহিত হয়েই থাকতে? নিস্তব্ধতা ঘেরা প্রকৃতির একখণ্ড আশ্চর্য হয়েই থাকতে চায় সে। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর হয় না। কেবল নশ্বর পৃথিবীর সমান্তরালে অবিনশ্বর এক জগৎ উঁকি মেরে যায় যেন। যাকে হয়তো অনুভব করা যায়। জাগতিক ব্যাখ্যায় বুঝে ওঠা বা বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement