বর্তমানে ডায়াবেটিসের ঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এই অবস্থায় শরীরের কোষগুলি ইনসুলিনের প্রতি ঠিকভাবে সাড়া দিতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ জমতে থাকে, যা ধীরে ধীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার, হৃদরোগ ও বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যার পথ প্রশস্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তনই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। আর সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে নিয়মিত শরীরচর্চা। তবে অনেকেরই প্রশ্ন—প্রতিদিন ১০ হাজার পদক্ষেপ হাঁটা বেশি উপকারী, নাকি মাত্র ২০ মিনিটের যোগব্যায়াম? উত্তরটা কিন্তু এতটা সহজ নয়।
হাঁটার কোনও বিকল্প নেই। ছবি: সংগৃহীত
হাঁটা কেন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র?
হাঁটা এমন একটি ব্যায়াম, যা প্রায় সব বয়সের মানুষের পক্ষেই করা সম্ভব। হাঁটার সময় শরীরের পেশিগুলি সক্রিয় হয় এবং জ্বালানি হিসেবে রক্তের গ্লুকোজ ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে এবং কোষগুলির ইনসুলিন গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার পা বা স্টেপ হাঁটলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি কমতে শুরু করে। বিশেষ করে পেটের ভেতরে জমে থাকা ‘ভিসেরাল ফ্যাট’ কমানো যায়, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের অন্যতম প্রধান কারণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হাঁটার প্রভাব হাঁটা শেষ হওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ বজায় থাকে। ফলে শরীর দীর্ঘ সময় ধরে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
যোগের অনেক উপকার। ছবি: সংগৃহীত
যোগব্যায়াম কীভাবে ভিন্ন পথে কাজ করে?
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শুধু খাবার বা ওজনের কারণে হয় না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং অনিয়মিত ঘুমও এর অন্যতম কারণ। এই জায়গাতেই রয়েছে যোগব্যায়ামের আলাদা গুরুত্ব। নিয়মিত যোগব্যায়াম করলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমে। কর্টিসল বেশি হলে লিভার অতিরিক্ত গ্লুকোজ তৈরি করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যোগব্যায়াম সেই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া বিভিন্ন আসন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে, ঘুমের মান উন্নত করে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন। ছবি: সংগৃহীত
তাহলে কোনটি বেশি উপকারী?
যদি লক্ষ্য হয় ক্যালরি খরচ, ওজন কমানো এবং পেটের মেদ ঝরানো, তাহলে হাঁটা এগিয়ে থাকবে। কারণ এটি সরাসরি শক্তি ব্যয় বাড়ায় এবং শরীরকে বেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, যদি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মূল কারণ হয়, তাহলে যোগব্যায়াম বেশি উপকার দিতে পারে।
অর্থাৎ, হাঁটা এবং যোগব্যায়াম আসলে একে অপরের বিকল্প নয়; বরং দুটি আলাদা সমস্যার সমাধান করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল হাঁটা এবং যোগব্যায়াম—দুটিকেই দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা।
দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার স্টেপ হাঁটার পাশাপাশি ১৫ থেকে ৩০ মিনিট যোগব্যায়াম করলে একদিকে যেমন শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে, অন্যদিকে মানসিক চাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে ইনসুলিন আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
বজায় রাখে শরীর ও মনের ভারসাম্য। ছবি: সংগৃহীত
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমানোর জন্য কোনও ‘ম্যাজিক এক্সারসাইজ’ নেই। হাঁটা শরীরকে সক্রিয় রাখে, অতিরিক্ত ক্যালরি খরচ করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। অন্যদিকে যোগব্যায়াম শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।
তাই ‘হাঁটা না যোগব্যায়াম’—এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন কি না। কারণ সুস্থ বিপাকক্রিয়া, নিয়ন্ত্রিত রক্তশর্করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের জন্য এই দুই অভ্যাসের যুগলবন্দিই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
