shono
Advertisement
Prehistoric Earth

ডাইনোসরের আগে পৃথিবী দাপাত ২৬ ফুটের আশ্চর্য জীব! বদলে যাবে বিবর্তনের ইতিহাস?

অতিকায় ডাইনোসরদের আমল তখনও আসেনি। জটিল বহুকোষী পৃথিবীর দিকে জীবজগতের যে যাত্রা, সেই যাত্রাপথে তার জলছাপ থেকে গিয়েছে। সাম্প্রতিক আবিষ্কারে আরও গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে প্রোটোট্যাক্সাইটদের!
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:55 PM Jan 24, 2026Updated: 05:59 PM Jan 24, 2026

সত্যজিৎ রায়ের 'আশ্চর্য প্রাণী' গল্পটি মনে পড়ে? ফ্লাস্কের ভিতরে প্রাণ সৃষ্টির সেই কাহিনিতে দেখা গিয়েছিল বিবর্তনের আশ্চর্য ছবি। সেখানে মানুষের উত্তরপুরুষ হিসেবে দেখা গিয়েছিল মাংসপিণ্ডের মতো প্রাণীকে! 'চ্যাপটা আঙুরের মতো' প্রাণীটির হাত-পা কিচ্ছু ছিল না। কিন্তু সে তো আমাদের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা। যদি বলা হয় ভবিষ্যৎ নয়, অতীতের পৃথিবীতেই ছিল বিচিত্রদর্শন জীব...! দীর্ঘ মিনারের মতো এই জীবই একসময় নাকি দাপিয়ে বেড়াত প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর বুকে। মানে তাদেরই প্রাধান্য ছিল আমাদের নীল রঙের গ্রহে। স্বাভাবিক ভাবেই বিবর্তনের 'কাহানি মে টুইস্ট' ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে বিজ্ঞানীমহলে।

Advertisement

আসলে মোটামুটি ভাবে মনে করা হয়, উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক, আণুবীক্ষণিক প্রাণ- এতেই বিভক্ত পৃথিবীর জীবজগৎ। কিন্তু এই নয়া উদ্ভাবন এমন এক জীবের কথা বলছে, যে এই সব বিভাগের কোনওটিরই প্রতিনিধিত্ব করছে না। মনে করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৬ ফুট লম্বা হত এরা। পৃথিবীর মাটিতে তাদের বিচরণ ছিল ৪০ কোটি বছর আগে। এতদিন প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছবিটা ছিল ডাইনোসরদের। অতিকায় টিরানোসরাস, ব্রন্টানোসরাসদের নিয়ে হলিউডে কত ছবি হয়েছে! সেই রোমাঞ্চকে এবার চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এই জীবন্ত মিনাররা?

কারও মতে এটা আসলে শৈবালের একটা স্তূপ

এই নয়া জীবদের নাম প্রোটোট্যাক্সাইট। তবে 'নয়া' বললেও আদৌ নয়া নয়। সেই কবে ১৮৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল ওই জীব! তখন থেকেই গবেষণা শুরু হয়েছিল ওই জীবদের গোত্র নিয়ে। কোনও কোনও জীবাশ্মবিদ মনে করতেন, এরা আসলে 'ছত্রাকের গডজিলা'! আবার কারও মতে এটা আসলে শৈবালের একটা স্তূপ। এমন কত! 'জীবাশ্মবিদ্যায় খুব কম জিনিসই এত রহস্যময়', বলেছিলেন উদ্ভিদ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান AMAP-এর এক জীবাশ্মবিদ অ্যান-লর ডেকম্বেক্স। কিন্তু এবার একদল বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, প্রোটোট্যাক্সাইট সেসব কিছুই নয়। এটা এক অজানা ধরনের বহুকোষী জীবন!

ভেবে দেখুন সেই আদিম পৃথিবী কেমন ছিল। বৃক্ষ বলতে যা বোঝায়, তেমন কিছু তখন ছিল না। স্তন্যপায়ীদের থাকার তো প্রশ্নই নেই। পৃথিবীর ত্বক জুড়ে লতাগুল্ম। আর তারই মাঝে বিচরণ করত আশ্চর্য জীব প্রোটোট্যাক্সাইট! কল্পবিজ্ঞান কাহিনিকেও হার মানাবে বলে মনে হয়। ঠিক কেমন ছিল এই জীবগুলি? একদম সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' নামের জার্নালে। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে অধুনালুপ্ত এই জীবেরা এতদিনের পরিচিত জীবজগতের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের অধ্যাপক বলেছেন, ''নিশ্চিত ভাবেই এগুলো জীবন্ত ছিল। কিন্তু আমরা এখন যেভাবে জীবনকে জানি, তেমন নয়। ছত্রাক বা উদ্ভিদ জীবন থেকে স্বতন্ত্র শারীরিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এই জীব বিবর্তনের শাখার এক সম্পূর্ণ বিলুপ্ত শ্রেণির জীব!''

সাম্প্রতিক আবিষ্কারে আরও গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে প্রোটোট্যাক্সাইটদের

গবেষকরা প্রোটোট্যাক্সাইটিস টাইটি নামের একটি প্রোটোট্যাক্সাইট প্রজাতির জীবাশ্মীভূত অবশেষ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এটিকে পাওয়া গিয়েছিল স্কটল্যান্ডের রাইনি চার্ট নামের একটি পাললিক স্তরে সংরক্ষিত অবস্থায়। এই প্রজাতিটি প্রোটোট্যাক্সাইটিসের অন্যান্য অনেক প্রজাতির চেয়েই ছোট! মাত্র কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। এদের অভ্যন্তরীণ গঠন পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন এদের ভিতরটা ছত্রাকের ভেতরের মতো একগুচ্ছ নল দিয়ে গঠিত। কিন্তু নলগুলি যেভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে ফের সংযুক্ত হয়েছে, এমন গড়ন আধুনিক কোনও ছত্রাকের সঙ্গেই মেলে না। অথচ একেবারে সেই প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীরই ছত্রাকের নমুনা বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন, যেগুলির অভ্যন্তরীণ গঠন মিলে যায় এযুগের ছত্রাকের সঙ্গে। এটাই প্রমাণ করে দেয় প্রোটোট্যাক্সাইট ছিল সকলের চেয়ে আলাদা। যে সব জিনগত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে তাদের ছত্রাকের সঙ্গে এদের মিল প্রায় নেই-ই। তবে ছত্রাক জাতীয় হোক বা অন্য কিছু, এই জীবগুলির তুলনীয় কিছুই এখন পৃথিবীতে নেই। কিন্তু জটিল বহুকোষী পৃথিবীর দিকে জীবজগতের যে যাত্রা, সেই যাত্রাপথে তার জলছাপ থেকে গিয়েছে। সাম্প্রতিক আবিষ্কারে আরও গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে প্রোটোট্যাক্সাইটদের!

মনে রাখতে হবে অতিকায় ডাইনোসরদের আমল তখনও আসেনি। পৃথিবীর বুকে ডাইনোদের সময় থেকেই অতিকায় জীবের উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু তারও আগে ওই সময়ে, যখন বেশির ভাগ প্রাণই তুচ্ছ আকারের, সেখানে প্রোটোট্যাক্সাইট অত বড় হল কী করে, এ এক আশ্চর্য ধাঁধা বইকি। এবং সেই উচ্চতা সত্ত্বে্ও এগুলি ভেঙে পড়ত না!

আর এখানেই প্রশ্ন জাগে, এরপরও তারা বিলীন হয়ে গেল কী করে? ৩৬ কোটি বছর আগেই এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর এর নেপথ্যে অন্যতম সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যায় আদিম জঙ্গলের সৃষ্টি! যেহেতু উদ্ভিদজগতে প্রতিযোগিতা ও বৈচিত্র দু'টোই বাড়তে শুরু করেছিল সেই প্রতিযোগিতায় আর এঁটে উঠতে পারেনি প্রোটোট্যাক্সাইট! পাশাপাশি পরিবেশও তাদের অস্তিত্বের পক্ষেও প্রতিকূল হয়ে উঠছিল। তবে প্রোটোট্যাক্সাইট সম্পর্কে এখনই শেষ কথা বলতে নারাজ বিজ্ঞানীরা। তাঁরা মনে করছেন, আগামী দিনে আরও গবেষণা হলে পরিষ্কার বোঝা যাবে ছত্রাক নয়... এরা একেবারে ভিন্ন ধরনের জীব! আপাতত সেই সব গবেষণাপত্রের অপেক্ষায় ওয়াকিবহাল মহল। মনে করা হচ্ছে, বিবর্তনের কাহিনিকে আরও নিখুঁত করে লিখতে গেলে যা একান্তই প্রয়োজন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement