গত শতকের প্রায় শেষ পর্বের তিরিশটা বছর ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত ইংরেজি পপ গানের 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' বলতে একজনই- মাইকেল জ্যাকসন। অজস্র গানে তিনি সারা পৃথিবীর তরুণ তরুণীদের আইকন হয়ে উঠেছিলেন। গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে তাঁর নাম এখনও জ্বলজ্বল করে। শুধু নিজের লেখা গান গাওয়া নয়, সঙ্গে নাচের শরীরী বিভঙ্গ, শ্রুতির সঙ্গে সঙ্গে চোখের আরাম তো বটেই, এমনকী সেসময়ে 'হিস্টিরিয়া'য় আক্রান্ত করে দিত তরুণ শ্রোতাদের। এহেন আইকনিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ছবি বানানোর অনেক ঝুঁকি। কিন্তু এই ছবির পেছনে জ্যাকসন পরিবারের আর্থিক দায় থাকায় এবং মাইকেলের ভাইপো জাফর জ্যাকসন মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার কারণে তাঁর জীবনের বিতর্কিত কোনও ঘটনাই ঠাঁই পায়নি। বরং একজন সঙ্গীত প্রতিভার জেদ, আত্মবিশ্বাস ও সংগ্রামের উপরই জন লোগান জোর দিয়েছেন। আাড়ালে রাখা হয়েছে মাইকেলের যৌনজীবনের অন্ধকার পর্ব! বরং কিশোর বয়স থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত গানের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা, সুর সাধনায় নিমজ্জিত থাকার দিকেই জোর দিয়েছেন পরিচালক আন্তয়েন ফুকুয়া।
মাইকেল জ্যাকসনের ভূমিকায় 'ভাইপো' জাফার জ্যাকসন। ছবি- সংগৃহীত
বাবা জোসেফ জ্যাকসন ছিলেন জবরদস্ত ব্যক্তিত্বের মানুষ। পাঁচ সন্তানকে তিনিই তৈরি করেন 'জ্যাকসন ফাইভ' নামের এক ব্যান্ড। যার মূল গায়ক ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ সন্তান মাইকেল। বাবার উদ্দেশ্য ছিল জ্যাকসন পরিবারকে সাদা চামড়ার সমাজে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। সেই ষাটের দশকে সাদা-কালো মানুষের বিভাজন ছিল বড়ই অপমানজনক। কিন্তু প্রায় শুরু থেকেই মাইকেলের গান এবং ব্যান্ড লোকের পছন্দ হতে শুরু করে। প্রথমে ছোটো রেকর্ড কোম্পানির হয়ে গান রেকর্ড করে সাফল্য এলে ডাক পড়ে সিবিএস কোম্পানি থেকে। ওখান থেকে বেরোনো 'থ্রিলার' সুপারহিট হলে সদ্য তরুণ মাইকেল উপলব্ধি করে তাঁর নিজস্ব ক্ষমতা। নিজের ইমেজ, নিজের গান, নিজের জনপ্রিয়তা কিছুতেই আর বাবাকে রাখতে চায় না সে। প্রথম ম্যানেজার বিল এবং পরবর্তী সময়ে জন ব্রানকা এসে তাঁর পেশাদার জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। বাবা-মা, ভাইরা আড়ালে চলে যায়। পরিচালক এই পর্বে মাইকেলের নিঃসঙ্গতাকেও সুন্দরভাবে এনেছেন পর্দায়। মাইকেলের ঘরে তখন 'বাবলস' নামের ছোট্ট শিম্পাঞ্জি, সাপ, ঘোড়া ইত্যাদির উপস্থিতি তাঁর জীবনের শূন্যতাকে যেন ঢেকে রাখে। মাইকেলের হিট আলবাম 'থ্রিলার', 'ব্যাড', 'রক উইথ ইউ' বা 'ডার্টি ডায়না' থেকে একাধিক গানের পিকচারাইজেশন এই ছবির প্রাণ। যাঁরা পুরনো মাইকেলকে দেখেছেন, তাঁরাও জাফরের 'মাইকেলে'র নাচ-গানের দৃশ্য দেখে নস্ট্যালজিয়ার সরণিতে হাঁটার সুযোগ পাবেন। আর নতুন প্রজন্ম কিঞ্চিৎ স্বাদ পাবে প্রকৃত মাইকেলের।
'মাইকেল' বায়োপিকে জাফার জ্যাকসন। ছবি- সংগৃহীত
এই ছবির সাফল্যই বুঝিয়ে দেয় মাত্র পঞ্চাশ ছুঁয়ে প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তায় আজও এতোটুকু ধুলো পড়েনি। এবং একই সঙ্গে অন্তত এই ছবির দুই অভিনেতাকে 'সাবাসি' দিতেই হবে। প্রথমজন ভাইপো জাফর জ্যাকসন, যিনি তাঁর কাকার চরিত্রটি দ্বিধা-দ্বন্দ এবং মানসিক দোদুল্যমান ছাড়াই যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনই নাচে-গানে, লিপ সিঙ্কিয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই সিনেমা কাকা মাইকেলের প্রতি তাঁর আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্যের এক দলিলও বটে।
বাবার চাপেই 'ভিক্ট্রি ট্যুর' করতে গিয়ে এক বড় দুর্ঘটনায় মাইকেল প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচেন। কিন্তু জটিল চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হলেও ভিতরে ভিতরে ক্ষয় হতে থাকে তাঁর। পরিচালক ফুকুয়া ছবি শেষ করেন লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে মাইকেলের শেষ অনুষ্ঠান দিয়ে। যেখানে তিনি দুটি গানের সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত 'মুন ওয়াকিং' এবং শরীরী বিভঙ্গে তীব্র আবেদনের এক আবেশ তৈরি করে দেন। সিনেমা শেষে পরিচালক উল্লেখ করেছেন- 'মাইকেল জ্যাকসন কন্টিনিউস...'। আক্ষরিক অর্থেই মাইকেল আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মনের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবেন। কিংবা এটা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সিক্যুয়েল তৈরির আভাস। সেখানে হয়তো বা মাইকেলের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন এবং অন্যান্য অভিযোগের ঘটনাও উঠে আসতে পারে।
পরিচালক ফুকুয়া ছবি শেষ করেন লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে মাইকেলের শেষ অনুষ্ঠান দিয়ে। ছবি- সংগৃহীত
যৌথভাবে 'মাইকেল' ছবির প্রযোজনায করেছেন পপ সম্রাটের পরিবার এবং ম্যানেজার জন ব্রাঙ্কা। এবং তাঁদেরই চেষ্টায় গত তিন বছরের পরিশ্রমের ফসল এই 'মাইকেল'। ব্যবসায়িকভাবেও দুর্দান্ত সফল ছবি। হলিউডের হিসেব বলছে, পশ্চিমী সিনেদুনিয়ায় বায়োপিকের তালিকায় এখনও পর্যন্ত বক্স অফিসের সর্বোচ্চ আয়ের তালিকায় শীর্ষে এই সিনেমা। এই ছবির সাফল্যই বুঝিয়ে দেয় মাত্র পঞ্চাশ ছুঁয়ে প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তায় আজও এতোটুকু ধুলো পড়েনি। এবং একই সঙ্গে অন্তত এই ছবির দুই অভিনেতাকে 'সাবাসি' দিতেই হবে। প্রথমজন ভাইপো জাফর জ্যাকসন, যিনি তাঁর কাকার চরিত্রটি দ্বিধা-দ্বন্দ এবং মানসিক দোদুল্যমান ছাড়াই যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনই নাচে-গানে, লিপ সিঙ্কিয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই সিনেমা কাকা মাইকেলের প্রতি তাঁর আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্যের এক দলিলও বটে। আর দ্বিতীয়জন হলেন বাবা জোসেফের চরিত্রে বর্ষীয়ান অভিনেতা কোলম্যান ডোমিঙ্গো। তাঁর অভিব্যক্তিতে ভালোবাসা, শাসন, বিরক্তি, ক্রোধ, অভিমান সবটাই জীবন্ত হয়েছে। এককথায় - দু'বার দেখার মতো ছবি 'মাইকেল'।
