সদ্য আড্ডা টাইমসে মুক্তি পেয়েছে গৌরব চক্রবর্তী অভিনীত 'ব্যোমকেশ বক্সী'। কেমন হল? লিখছেন স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ভৌমিক।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে হাজির আরও এক ‘ব্যোমকেশ বক্সী’। সাদা-কালো যুগকে বাদ দিলে গত দেড় দশকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট চরিত্র ‘ব্যোমকেশ’কে নিয়ে প্রায় দেড় ডজন ছবি, ধারাবাহিক এবং সিরিজ হয়ে গিয়েছে। তবু আবারও এক সত্যান্বেষীর আবির্ভাব বাঙালির মনে আদৌ কোনও ঢেউ তুলতে পারবে কি না সে নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অরিত্র সেনের পরিচালনায় সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিরিজ ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ এই সব প্রশ্নকে আমল দেওয়ার সুযোগ দেবে না।
প্রথম সিজনের ছয়টি এপিসোড জুড়ে রয়েছে দুটি গল্প, ‘সত্যান্বেষী’ ও ‘অর্থমনর্থম’। দুটি গল্পের মধ্যে বিশেষ কোনও যোগসূত্র না থাকলেও একটিতে প্রথমবার ব্যোমকেশের সঙ্গে অজিতের সাক্ষাৎ এবং দ্বিতীয়টির সূত্রে ব্যোমকেশের জীবনে সত্যবতীর আবির্ভাব সূচিত হয়। গৌরব চক্রবর্তী এর আগেও ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছেন। প্রায় বছর দশেক পার করে আবারও একই চরিত্রে টেলিভিশন থেকে সিরিজে গৌরবের উত্তরণ অবশ্যই বহু দর্শকের কাছে নস্টালজিয়ার কাজ করবে। পুরনো সেই স্বাদই আবারও সফলভাবে ফিরিয়ে এনেছেন গৌরব। বুদ্ধিদীপ্ত ও আত্মবিশ্বাসী সত্যান্বেষী হিসেবে বহু আগেই তিনি দর্শকের মন জয় করেছেন। এখানেও তার অন্যথা হয়নি।
কেমন হল ব্যোমকেশ?
সেই অর্থে প্রথমবার ব্যোমকেশের দুই আইকনিক চরিত্রের পরীক্ষায় বসতে হয়েছে অজিতরূপী অর্ণ মুখোপাধ্যায় এবং সত্যবতী চরিত্রে শ্রুতি দাসকে। সিরিজের প্রেক্ষাপট এগিয়ে আনা হয়েছে ১৯৬৪ সালে। অর্থাৎ ভারত-চিন যুদ্ধের পর বছর দুই কেটে গিয়েছে। সীমান্ত বন্ধ সরকারিভাবে। বর্মা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ঘুরপথে মাদক ঢুকছে পশ্চিমবঙ্গে। ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা দেশে। কলকাতার চায়না টাউন থেকে সরাসরি সেই কোকেন ও হেরোইন নিয়ে লুকনো ব্যবসা ফেঁদে বসেছে কিছু বাঙালি দুষ্কৃতী। ভদ্রবেশী সেই শয়তানকে চিনে নিতে পুলিশ কমিশনার ব্যোমকেশকে নিযুক্ত করেন। এখন যেসব বাঙালির বয়স তিরিশের ওপর বা আশেপাশে তাদের বেশিরভাগই ব্যোমকেশ কাহিনির পাঠক।
কিন্তু তার নিচে যাদের বয়স তারা হয়তো মূল গল্পের সঙ্গে পরিচিত নন, সেই ভেবেই পরিচালক এমন কিছু দৃশ্য রেখেছেন যে ঘটনার উল্লেখ বইতে খুব হালকাভাবে রয়েছে বা যা নিজেকে বুঝে নিতে হয়। যেমন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে ব্যোমকেশের সাক্ষাৎ কিংবা অনুরাগী পাঠকদের সামনে অজিতের নিজের গল্প পড়ে শোনানো। সাহিত্যের কাহিনিকে সব ধরনের দর্শকের কাছে সহজ করে তুলতে এই দৃশ্যগুলির নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ। অনুকূল ডাক্তারের ভূমিকায় অভিজ্ঞ অভিনেতা অরিন্দোল বাগচী মানানসই অভিনয় করেছেন। এছাড়া দুই গল্পেই পুলিশ আধিকারিক বিধুবাবুর ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য মনে রাখার মতো। দ্বিতীয় কাহিনি করালীবাবুর মৃত্যু রহস্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
শহরের অন্যতম ধনী ব্যক্তিত্ব নিঃসন্তান করালীবাবু তাঁর উইলের ব্যাপারে বড়ই খামখেয়ালি। তাঁর পাঁচ পুষ্যির মধ্যে যখন যার ওপর বিরক্ত হন তাকেই তিনি উইল থেকে বাদ দিয়ে দেন। এই পর্বে মাখনলালের ভূমিকায় যুধাজিৎ সরকার এবং সুকুমারের ভূমিকায় জিৎ সুন্দর চক্রবর্তী চরিত্রের প্রয়োজন পূরণ করেছেন। ফণিভূষণের চরিত্রে দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায় অনবদ্য, সিরিজ শেষে মনে হবে চরিত্রটি যেন তঁার জন্যই লেখা হয়েছে। সত্যবতী চরিত্রে শ্রুতি যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন, মানতে বাধা নেই। তবে বড় তাড়াতাড়ি ব্যোমকেশের সাংসারিক জীবন শুরু হয়ে গেল যেন। অন্যদিকে অর্ণ ভালো অভিনেতা হলেও ঠিক চেনা অজিত হয়ে উঠলেন না।
গৌরব যখন ব্যোমকেশ
সিরিজ দেখতে বসে বোঝা যায় গল্পকে সময়ের নিরিখে অনেকটা এগিয়ে আনার সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে পরিচালক নির্মেদ করার চেষ্টা করেছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা প্রশংসনীয়, তবে স্মার্ট গতিতে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণে ব্যোমকেশের চিন্তাশীলতা আর তার সঙ্গে দর্শকের একাত্ম হওয়ার সুযোগ একটু কম। এটুকু বাদ দিলে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আবহ, আলো, দৃশ্যসজ্জা এবং অভিনয় সবটাই মানানসই। ‘আড্ডা টাইমস’-এর নতুন ব্যোমকেশ দর্শককে নিরাশ করবে না।
