কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আসার আগে তাঁর ২০২৩-এর ‘অর্ধাঙ্গিনী’ স্মৃতিতে সামান্য ঝালিয়ে নেওয়া যাক, যাতে সুতোটা ঠিক জায়গা থেকে তুলতে পারা যায়। ২০২৩-এর ‘অর্ধাঙ্গিনী’ও আমি রিভিউ করেছিলাম। সেই ছবির মূল তিনটি চরিত্র। এক, মেঘনা (জয়া আহসান), সুমনের (কৌশিক সেন) সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। দুই, শুভ্রা (চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়), সুমনের সতেরো বছরের স্ত্রী। এখন বিয়েবিচ্ছিন্না। সুমন কিছুতেই মেনে নেয়নি তার দুর্বার মেল ইগো বা ব্যর্থ পৌরুষের অহং থেকে তার বাবা হওয়ার অক্ষমতা। সমস্ত দোষ সে চাপিয়ে দেয় তার স্ত্রীর ঘাড়ে। কিন্তু সতেরো বছরের পুরনো স্ত্রী জানতে পারে, সুমন অপারগ পুরুষ। এবং সে এই ব্যর্থ বিয়ে এবং অপারগ পৌরুষের অসহনীয় অহং থেকে বিয়ে-বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তি পায়।
এ কথা ঠিক চূর্ণী বাংলা ছবিতে উপেক্ষিতা। এবং তার মূল কারণ হল চূর্ণীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের অভিঘাত। এই অভিঘাত মূলত চূর্ণীর সহজাত ‘ইন্টেলেকশন’-এর। এটা এক রকমের বুদ্ধিমত্তার বিদ্যুৎ প্রবাহ, যা বাংলা ছবির নায়িকাদের মধ্যে পরিচালকদের এক্সপ্লোর করতে দেখি না।
এরপর সুমন প্রেমে পড়ে বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা মেঘনার। তারা বিয়ে করে। এই বিয়ে মেনে নেয় না সুমনের জয়েন্ট-ফ্যামিলি। কারণ মেঘনা হিন্দু নয়। সুমন পরিবার থেকে দূরে সরে যায়। এবার একদিন কলকাতার একটা শপিং মল-এ সুমনের প্রবল স্ট্রোক হয়। সেই সময়ে মল-এ শুভ্রাও উপস্থিত। তার চোখের সামনে ঘটে ঘটনা। এবং শুভ্রাও জড়িয়ে পড়ে সুমনের চিকিৎসার সঙ্গে। কারণ মেঘনার পক্ষে একলা হাসপাতালের বিল দেওয়া সম্ভব নয়। শুভ্রা (চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়) এবং মেঘনার (জয়া) মধ্যে গড়ে ওঠে এক আকস্মিক মানবিক সখ্য প্রায় ব্যাখ্যার অতীত। কিন্তু শুভ্রার মনে খটকা মেঘনা ও সুমনের কন্যার বাবা আসলে কে? কেননা সে তো জানে, সুমনের পক্ষে সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়। যাঁরা ‘অর্ধাঙ্গিনী’ দেখেছিলেন এবং চমকে ছিলেন এহেন দুঃসাহসী বাংলা ছবি দেখে, তাঁরা তিন বছর অপেক্ষা করেছেন ‘অর্ধাঙ্গিনী’র দ্বিতীয় ভাগের জন্য। সেই দ্বিতীয় ভাগ, ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে। এবং প্রথম দিনই দেখেছি। গত বারো দিন এতই অসুস্থ ছিলাম, ‘ফিরে আসব ভাবিনি’। সুস্থ হয়ে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ দেখে, চূর্ণী, জয়া আর কৌশিকের অভিনয়ে আরও একবার মুগ্ধ হয়ে, মনে হল, ভাগ্যিস বেঁচে আছি, না হলে এমন একটা ‘ভয়ঙ্কর’ সুন্দর ছবি মিস করতাম।
'আজও অর্ধাঙ্গিনী' ছবিতে চূর্ণী-জয়ার সমীকরণ
পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া এই মুহূর্তের আর কোনও পরিচালককে আমি ভাবতে পারছি না, যিনি এমন এক দুর্বার ‘নারীবাদী’ ছবি ভাবতে পারেন, যে ছবি পুরাকালের গ্রিক ট্র্যাজেডির আলোক বর্ষ দূরের অলীক বিন্দু ছুঁলো। চূর্ণীর প্রসঙ্গে প্রথমেই আসি। এ কথা ঠিক চূর্ণী বাংলা ছবিতে উপেক্ষিতা। এবং তার মূল কারণ হল চূর্ণীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের অভিঘাত। এই অভিঘাত মূলত চূর্ণীর সহজাত ‘ইন্টেলেকশন’-এর। এটা এক রকমের বুদ্ধিমত্তার বিদ্যুৎ প্রবাহ, যা বাংলা ছবির নায়িকাদের মধ্যে পরিচালকদের এক্সপ্লোর করতে দেখি না। নারী-সৌন্দর্যের এই দিকটাকে শুভ্রার চরিত্রে চূর্ণীকে আরও একবার নিয়ে এসে পরিচালক কৌশিক নিয়ে গেছেন এক অবিকল্প গভীরতা ও বিততিতে। আমার মনে পড়ছে, সদ্য দেখা ব্রিটিশ ফিল্ম ‘দ্য চিলড্রেন অ্যাক্ট’-এর বহ্নিময়ী এমা টমসনকে। চূর্ণী কিন্তু সত্যি আমাদের বাঙালি এমা টমসন। ওর মধ্যে বুদ্ধিমত্তার বিদ্যুৎপ্রবাহটাই সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের উৎসার। এবং সেকারণেই অধিকাংশ পরিচালক এই নারীর নাগাল পায়নি।
'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আরও একবার মনে করিয়ে দিল, অপরাজেয় নেমেসিসের কাছে মানুষকে নত হতেই হয়। তবু শুভ্রাদের লড়াই চিরভাস্বর।
আমি কিছুতেই গল্প বলে ছবিটার সর্বনাশ করব না। শুধু এইটুকু বলব, গ্রিক ট্র্যাজেডি ছেঁকে পরিচালক কৌশিক তুলে এনেছে বিশুদ্ধ ‘নেমেসিস’ যা দুর্নিবার, কিছুতেই এড়ানো যায় না সেই ‘অন্যায়ের শাস্তি’, ‘পাপের ফল’। কৌশিকের অনেক ছবিতেই ‘নায়ক’ অপরাজেয় ‘নেমেসিস’। ‘নেমেসিস’-এর অবিকল্প মাস্টার কৌশিক। এবার আসি জয়া আহসানে। মেঘনার চরিত্রে জয়া একেবারে পারফেক্ট। জয়ার মধ্যে এমন তোলপাড়, কুলছাপানো লিকুইডিটি, তারল্য আছে, যা চোখে দেখার, অনুভবের এবং আমার মতো কিছু পুরুষের রোমান্টিক টানের। কৌশিকের কল্পনা, তাঁর রোমান্টিক স্বপ্ন এই তারল্যে সাঁতারু হতে পেরেছে। সমস্ত ছবিটাকে আচ্ছন্ন করে আছে জয়া আহসানের তারল্য– মেঘনা নদীর এবার-ওপার ছলাৎ ও বহতা। ছবির শেষে মেঘনা তার প্রেমিক রঞ্জনকে (ইন্দ্রাশিস) বলে- সে 'মেঘ' হতে চায় এবার। আর ছলাৎ নয়। এবার অনেক দূরের আকাশে ভেসে চলার তারল্য– কসমিক। মেঘনার শেষটা নাই বললাম। তবু এইটুকু বলি, সে তার অস্তিত্বের সই রেখে গেল তার তারল্যেই।
প্রাক্তন-বর্তমানের 'ভয়ংকর পুনর্মিলন' হবে 'আজও অর্ধাঙ্গিনী'তে
শেষে সুমনের চরিত্রে খঞ্জ কৌশিক সেন। স্বার্থপর। নিজেই পুড়ছে তার ব্যর্থ পৌরুষের বরফ-ঠান্ডা আগুনে। কেন জানি না, আমার বারবার মনে এসেছে কৌশিকের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভঙ্গুর দেহটাকে টেনে টেনে চলা দেখতে-দেখতে লরেন্সে অলিভিয়ের-এর রিচার্ড দ্য থার্ড-কে। ‘দ্য উইন্টার অফ ডিসকনটেন্ট’-এর অহংকারী শৈত্য ক্রমশ গ্রাস করছে সুমনকে। কী অসহায় ট্র্যাজিক এক চরিত্র যে ডেকে আনে ‘নেমেসিস’। ভালো কথা, কৌশিক সেন ইজ সিম্পলি ব্রিলিয়ান্ট। পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল, অম্বরীশ ভট্টাচার্যকে কৌশিকের ছোটভাইয়ের চরিত্রে। পারফেক্ট কোরিক ক্যারেক্টার। গল্পের শেষ পর্যন্ত লিপ্ত হয়েও দূরের। এ ছবির গান ও সুরে অনুপম সত্যিই অনুপম। ছবির মেজাজে মিশে গেছে তাঁর সৃজন। আর ইমনের গানে ইমনই গান হয়ে ওঠে। এ ছবিতেও। আমি তাঁর ক্লান্তিহীন ভক্ত। শেষ কথা, 'আজও অর্ধাঙ্গিনী' আরও একবার মনে করিয়ে দিল, অপরাজেয় নেমেসিসের কাছে মানুষকে নত হতেই হয়। তবু শুভ্রাদের লড়াই চিরভাস্বর। এই লড়াইয়ের শক্তি শুধু নারীরই আছে। নতজানু পুরুষকে স্বীকার করতেই হবে।
