বিমান বসু: মোহনবাগান যদি একটা আকাশ হয়, টুটু বোস সেই আকাশের সূর্য। সেই সূর্যের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের বয়স চার দশকেরও বেশি। এমন সজ্জন, পরিশীলিত, নান্দনিক মানুষ বিরল। এই তো সবে ও আশিতে পড়ল। আমি ওর চেয়ে প্রায় ৭ বছরের বড়। মাসখানেক পরে ৮৭-তে পড়ব। সেই হিসাবে আমাদের তো সমসাময়িকই বলা চলে।
যদিও ফোনে কখনও আমাকে ‘বিমানদা’ বলত না। ফোন করলে বলত, ‘‘দিস ইজ আ বোস টু বোস কনভারসেশন।’’
আজ, বন্ধু টুটু বোসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যে তিনটে জিনিসের কথা সবার আগে মনে আসছে, তা হল: ময়দান, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া।
আড্ডায় ১৪ রকম প্রশ্ন করত। সেই প্রশ্নের জবাবটা কী করে বের করে নিতে হয়, তা জানত টুটু বোস।
আমাদের সম্পর্কটা ছিল নিখাদ ভালোবাসার। আমি তো একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।
টুটু বোস নিজেও একটি দলের সাংসদ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের আড্ডায় কস্মিনকালে সেসব বিষয় আসেনি। সে-কারণে তৃণমূল সরকার আসার পরেও আমার সঙ্গে সম্পর্ক বিন্দুমাত্র নড়চড় হয়নি।
প্রথম কোথায় কীভাবে আলাপ হয়েছিল– সেদিনটা মনে নেই। তবে আমাদের একটা ‘কমন’ ভালোবাসা ছিল ফুটবল।
টুটু বোস ছিল মোহনবাগানের সর্বময় কর্তা। সবুজ-মেরুন অন্তপ্রাণ। আমার আবার তেমন কোনও পছন্দের দল নেই। যে দল ভাল খেলে, তার পক্ষে থাকি আমি। একবার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান খেলা হচ্ছে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। তখন যুবভারতী সবে সবে তৈরি হয়েছে। খেলা দেখতে গিয়েছি। ফার্স্ট হাফে মোহনবাগান একটা ভালো শট করল। ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার বাঁচিয়ে দিল। আমি হাততালি দিয়ে উঠেছি। হাফটাইমের পর ইস্টবেঙ্গলের একটা দুরন্ত শট মোহনবাগানের গোলকিপার বাঁচাল। তখনও আমি হাততালি দিচ্ছি। টুটু বুঝেছিল, একে মাঠে আনা বিপদ।
তখন যুবভারতী সবে সবে তৈরি হয়েছে। খেলা দেখতে গিয়েছি। ফার্স্ট হাফে মোহনবাগান একটা ভালো শট করল। ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার বাঁচিয়ে দিল। আমি হাততালি দিয়ে উঠেছি। হাফটাইমের পর ইস্টবেঙ্গলের একটা দুরন্ত শট মোহনবাগানের গোলকিপার বাঁচাল। তখনও আমি হাততালি দিচ্ছি। টুটু বুঝেছিল, একে মাঠে আনা বিপদ।
ফুটবল সম্বন্ধে খোঁজখবর আমি রাখতাম। এটা তো সত্যি টুটু বোসের আমলে মোহনবাগান সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল। অনেকেই জানে না, মোহনবাগান আমাকে লাইফ মেম্বারশিপ দিয়েছিল। সে খবরটাও ফোন করে আমাকে প্রথম জানিয়েছিল টুটু বোস।
ওর ময়দান বোঝার ক্ষমতা অতুলনীয়। এখনকার প্রজন্মের অনেকেই জানে না, বাংলার ফুটবলে বিদেশি আমদানি করার সংস্কৃতিও কিন্তু টুটু বোসের আমলে। তবে বিদেশি ফুটবলার আনার পাশাপাশি বাঙালি ফুটবলার খোঁজার দিকেও ওর ছিল অদম্য ঝোঁক। সেটার এখন অভাব দেখি। ফুটবল খেলার ব্যাকরণটা টুটু বোস জানত।
আর জানত কীভাবে মানুষকে অল্প সময়ে আপন করে নিতে হয়। এত মাটির কাছাকাছি। মুখভরা সারল্য। অথচ টুটু বোস কোন বাড়ির ছেলে! বিশ্বভারতীর উপাচার্য নিমাইসাধন বসু ওর কাকু। একবার সকালে ফোন করে বলল, ‘‘নিমাইদা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।’’ দুপুরে সল্টলেকে ওর বন্ধু অঞ্জন মিত্রর বাড়িতে দেখা হয়েছিল।
ওর স্ত্রী শম্পা বোসের সঙ্গেও আমার আলাপ ছিল। দু’জনের আতিথেয়তাই চমৎকার। আজ কত কথা মাথায় ভিড় করে আসছে। বছর ৪০ আগের একটা কথা মনে পড়ছে। ’৭১ সালে বাড়িঘরদোর ছেড়ে দিয়ে আমি চলে আসি পার্টি অফিসে। ’৮৩ সালে প্রমোদ দাশগুপ্ত মারা গেলেন।
ওর স্ত্রী শম্পা বোসের সঙ্গেও আমার আলাপ ছিল। দু’জনের আতিথেয়তাই চমৎকার। আজ কত কথা মাথায় ভিড় করে আসছে।
’৮৪ সালে প্রমোদ দাশগুপ্ত যেখানে থাকতেন, সেখানে আমি থাকতে শুরু করি। সেই ঘরে টুটু বোসের আনাগোনা লেগেই থাকত। একদিন ফোন করে বলল, ‘‘আপনার ওখানে সকালবেলায় আসছি। আপত্তি আছে?’ আমি বললাম, ‘প্রশ্নই নেই। নির্দ্বিধায় চলে আসো।’’ তখন সকালের দিকে চিকেন স্যুপ বানাতাম। এখনও মনে আছে সেদিনের কথা। টুটু বোস আসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘স্যুপ খাবে তো?’’ একগাল হেসে টুটুর উত্তর ছিল, ‘‘শুধু স্যুপে হবে না। আমি ব্রেকফাস্ট করব।’’ সে সময় অফিসে সস্ত্রীক সুখেন্দু। সুখেন্দুর স্ত্রী শমিতার কাছে টুটুর আকস্মিক আবদার– ‘‘লুচি-ছোলার ডাল খাব।’’ কী ভাগ্যি ছোলার ডাল ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘‘জলদি ভেজাও ছোলার ডাল।’’ ময়দা মাখা হল। তারপর দু’জন মিলে লুচি-ছোলার ডাল। এই যে অল্প সময়ের মধ্যে কাউকে নিজের করে নেওয়া– এটাই টুটু বোস। অবলীলাক্রমে সক্কলকে আপন করে নিত। কতবার এমন হয়েছে, আগের দিন আমাকে ফোন করে বলেছে– ‘‘কাল আসছি।’’ আমি জানতাম খেতে ভালোবাসে। গোবিন্দভোগ চাল, দুধ নিয়ে এসে পায়েস বানিয়ে দিতাম।
নিজের হাতে বাংলা সংবাদপত্র ‘সংবাদ প্রতিদিন’ তৈরি করল। আমি বলেছিলাম খুব কঠিন কাজে হাত দিয়েছ। অনেক টাকা লগ্নি করেছিল। ‘সংবাদ প্রতিদিন’ নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল।
দু'টো ঘটনা ওকে কষ্ট দিয়েছিল। এক, বন্ধু অঞ্জন মিত্রর চলে যাওয়া। অন্যটা, ওর স্ত্রী শম্পা বোসের প্রয়াণ। কত আড্ডায় ঘুরেফিরে আসত সে-কথা। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর একটু চুপচাপও হয়ে গিয়েছিল। সেটা অত্যন্ত স্বাভাবিকও।
এই তো সেদিনের কথা। ৬ মে গিয়েছিলাম ওর সঙ্গে দেখা করতে। শুনেছিলাম ওর শরীর খারাপ। কিন্তু সেদিন কথা বলতে বলতে একবারও মনে হয়নি ৭ দিন পর বন্ধু চলে যাবে। আমি মনে করি, টুটু বোসের চলে যাওয়ার সময় হয়নি। এখনও ওর অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।
