'বাঙালি ব্যবসা বোঝে না, জানে শুধু হিংসে করতে' - এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করতেন না টুটুবাবু। দিকে-দিকে বাঙালি উদ্যোগপতির সংখ্যা বাড়ছে। এঁদের মধ্যে থেকেই যে ভবিষ্যতের মহীরুহ উদ্যোগপতিরা উঠে আসবেন না, কে বলতে পারেন? দ্বারকানাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা, বাঙালি উদ্যোগপতিদের আদি প্রোটোটাইপ। পরাধীন ভারতে উনি ব্যবসায় ব্রিটিশদের টক্কর দিয়েছিলেন। মহারানি ভিক্টোরিয়া স্বয়ং ছিলেন তাঁর গুণগ্রাহী। তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার ৭৫ বছর পরে কেন বাঙালিরা পারবে না ব্যবসায় সফল হতে? বুদ্ধি, বিবেচনা-শক্তি, পরিশ্রম করার মানসিকতা, নির্ভুল অনুমান-ক্ষমতা, কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং হৃদয়বান হলে বাঙালিরাও পারবে ব্যবসা করে দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করতে। পুঁজি ছাড়া ব্যবসা হয় না, এই কথাটিও যে সবসময় খাটে না, টুটু বোসের জীবন কি তার জ্বলন্ত উদাহরণ নয়? যিনি আক্ষরিক অর্থেই শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে। সেই তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির পাওনিয়ার।
ফাইল ছবি।
কিন্তু কেবল ক্রীড়াপ্রশাসক হিসাবে নয়, বাঙালি ব্যবসায়ী হিসাবেও যার জুড়ি মেলা ভার। নিজের আত্মজীবনী 'শূন্য থেকে শুরু'-তে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, "শখ এবং ব্যবসা - দু'টোকে কখনও একসঙ্গে মেশাতে নেই। তাহলে কী হয়, এর দৃষ্টান্ত আমি নিজে। আমার মতো শম্পারও দার্জিলিঙে বেড়াতে যাওয়ার খুব শখ ছিল। একবার অঞ্জন বলল, এমপি আগরওয়াল বলে একজনকে ও নাকি চেনে। দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ে তাঁর হোটেল আছে। অঞ্জন চাইল, আমিও যেন দার্জিলিঙে একটা হোটেল বানাই। দার্জিলিঙে ম্যালের উপর একটা জমি ছিল ফাঁকা। একজন ভালো লোকাল আর্কিটেক্টকে দিয়ে হোটেল বানাতে শুরু করলাম। স্বল্প জমি। তা-ও এত সুন্দর হোটেল বানিয়ে দিলেন, বলার নয়।"
হোটেলটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল সেখান থেকে দেখা অপূর্ব কাঞ্চনজঙ্ঘা আর লেবং রেসকোর্সের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে সেখানে সময় কাটাতে যেতেন তিনি। তবে ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, শুধু শখের জায়গা হিসাবে হোটেল রাখা আর নিয়মিত ব্যবসা চালানো এক বিষয় নয়।
শুরুর দিকে হোটেলটিতে ছিল মোট ১৬টি ঘর। পরে দুই ছেলের কথা ভেবে আরও দু’টি ঘর তৈরি করেছিলেন তিনি, যাতে দার্জিলিং গেলে পরিবারের সবাই আরাম করে থাকতে পারেন। হোটেলটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল সেখান থেকে দেখা অপূর্ব কাঞ্চনজঙ্ঘা আর লেবং রেসকোর্সের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে সেখানে সময় কাটাতে যেতেন তিনি। তবে ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, শুধু শখের জায়গা হিসাবে হোটেল রাখা আর নিয়মিত ব্যবসা চালানো এক বিষয় নয়। বিশেষ করে বড় পরিসরের হোটেল না হলে দূর থেকে সবকিছু সামলানো কঠিন। সেই বাস্তবতা বুঝেই ব্যবসা ক্ষতির মুখে যাওয়ার আগেই হোটেলটি সত্যম রায়চৌধুরীর হাতে বিক্রি করে দেন তিনি। সম্প্রতি আবার সেখানে গিয়ে দেখেছেন, হোটেলের ছাদে তৈরি হয়েছে দারুণ একটি কফি শপ। ‘দ্য রিট্রিট’, যা জায়গাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফাইল ছবি।
দার্জিলিঙে যে-বাড়িতে রুশি মোদি থাকতেন, সে বাড়ির নাম ছিল 'ম্যাটারহর্ন'। তবে তাঁর আরও একটি বাড়ি ছিল, ‘টাটা হাউস’। টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের কারণে বাড়িটি তিনি অত্যন্ত কম দামে টুটুবাবুকে থাকার জন্য দিয়েছিলেন। কিন্তু টুটুবাবুর হোটেল ব্যবসার সঙ্গীর তখন দার্জিলিঙে নিজস্ব কোনও বাড়ি ছিল না। তাঁর আসল বাড়ি ছিল সিকিমে। সেই কারণে অনুরোধ করায় ‘টাটা হাউস’ তাঁকে দিয়ে দেন টুটু। পরে অবশ্য সেই বাড়িটি আর নিজের কাছে রাখতে না পারার আক্ষেপ বারবার প্রকাশ করেছেন তিনি। জীবনের অন্যতম বড় আফসোস হিসাবেই দেখেছেন এই সিদ্ধান্তকে।
দার্জিলিঙের গণ্ডি পেরিয়ে টুটুবাবুর ব্যবসার বিস্তার ঘটেছিল আফ্রিকার মাটিতেও। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর নতুন উদ্যোগের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল কেতন সোমাইয়ার। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সোমাইয়ার সুসম্পর্কের সূত্রে একটি ওয়াইল্ড লাইফ জোনকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ মিলেছিল। সেই সময় ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (এএনসি)-এর নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। নানা আশ্বাস মিলেছিল। টুটুবাবুও ভেবেছিলেন, এই ব্যবসা থেকে বড় মুনাফা আসবে। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে ব্যবসার ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। সময় বদলালে প্রতিশ্রুতিও অনেক সময় বদলে যায়।
টুটুবাবুর ব্যবসার বিস্তার ঘটেছিল আফ্রিকার মাটিতেও। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর নতুন উদ্যোগের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল কেতন সোমাইয়ার। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সোমাইয়ার সুসম্পর্কের সূত্রে একটি ওয়াইল্ড লাইফ জোনকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ মিলেছিল।
আত্মজীবনীতেও আফ্রিকার নানা অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন তিনি। একবার গিয়েছিলেন পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বি। সঙ্গে ছিলেন কিশলয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দরে তাঁদের নিতে এসেছিল এক তরুণ। অত্যন্ত যত্ন করে লাগেজ গাড়িতে তুলছিল সে। পরে কিশলয় জানালেন, ছেলেটি আসলে সেই দেশের প্রেসিডেন্টের সন্তান। মুহূর্তে অস্বস্তিতে পড়ে যান টুটুবাবু। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, টাটা গোষ্ঠীর রেলপথ ব্যবহার করে সেখানকার খনি ব্যবসার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলার। কিন্তু বৈঠক চলাকালীন বারবার ঘুমিয়ে পড়ছিলেন তিনি। পাশে বসে কিশলয় তাঁকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে দিচ্ছিলেন। পরে বুঝেছিলেন, এর পিছনে কারণ ছিল তাঁর ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ সমস্যা, যে অসুখে ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায়।
আফ্রিকার আর এক দেশে, ইথিওপিয়ায় প্রায় ৭০০ হেক্টর জমি জুড়ে আলফানসো আমের ব্যবসাও শুরু করেছিলেন তিনি। সঙ্গী ছিলেন চামারিয়া সাহেব। বিশাল সেই জমির মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত নদী, চারপাশে ছিল মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু এত বড় এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ ছিল না। আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটত। ফলে সেই ব্যবসাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত জায়গাটি বন্ধু রাজ সিংয়ের হাতে তুলে দেন টুটুবাবু। পরে সেখানে আখের ব্যবসা ও সুগার মিলের ব্যবসা শুরু হয়। এই অভিজ্ঞতাও তাঁকে বুঝিয়েছিল, ব্যবসা থেকে দূরে সরে গেলে সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফাইল ছবি।
এখানেই শেষ নয়। একসময় অনিল সেনের সঙ্গে যৌথভাবে চিংড়ি রফতানির ব্যবসায় যুক্ত হন টুটুবাবু। অনিল সেন ছিলেন পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ চিংড়ি রফতানিকারক। সেই সূত্রে বহুবার বিদেশে ‘সি ফুড এক্সিবিশন’-এ অংশ নেন তিনি। পরে বেলজিয়ামের ব্রুজ শহরে একটি কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া নিয়ে সেটিকেই ইউরোপে তাঁদের ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলেন। পুরনো ব্যবসার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, পারাদ্বীপ, হলদিয়া ও ভাইজাগ এলাকায় প্রচুর চিংড়ি পাওয়া যায় এবং রফতানিতে লাভের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। তবে বারবার বেলজিয়াম যাতায়াত করতে গিয়ে অন্য ব্যবসায় সময় দিতে পারছিলেন না। তাই ১৯৯৯ সালের দিকে মাছের ব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসেন।
একসময় অনিল সেনের সঙ্গে যৌথভাবে চিংড়ি রফতানির ব্যবসায় যুক্ত হন টুটুবাবু। অনিল সেন ছিলেন পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ চিংড়ি রফতানিকারক। সেই সূত্রে বহুবার বিদেশে ‘সি ফুড এক্সিবিশন’-এ অংশ নেন তিনি। পরে বেলজিয়ামের ব্রুজ শহরে একটি কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া নিয়ে সেটিকেই ইউরোপে তাঁদের ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলেন।
পরে দিঘার শংকরপুরে চিংড়ির প্রসেসিং ফ্যাক্টরিও খুলেছিলেন তিনি। থাইল্যান্ডের এক মৎস্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে যৌথভাবে শুরু হওয়া সেই ব্যবসা প্রথমদিকে লাভজনক হলেও পরে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির মূল্যযুদ্ধের কারণে বড় লোকসানের মুখে পড়ে। তার উপর সুনামির প্রভাব পড়ে মাছের জোগানেও। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে দেন মেদিনীপুরের ব্যবসায়ী জানা সাহেবের কাছে। মএই অভিজ্ঞতা থেকেই টুটুবাবুর উপলব্ধি হয়েছিল, মাছের ব্যবসা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাঁর কথায়, 'Fish is a Fishy Business.' এরপর ধীরে ধীরে বিদেশের ব্যবসার মূল কেন্দ্র হিসেবে দুবাইকেই বেছে নেন তিনি।
নানান অভিজ্ঞতার পর টুটুবাবু ধীরে ধীরে মন দেন তাঁর মূল ক্ষেত্র জাহাজ ও নৌ-পরিবহণ ব্যবসায়। সেই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে ‘রিপ্লে অ্যান্ড কোং’। ২০০০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সংস্থার সদর দপ্তর। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বন্দর ও কার্গো পরিষেবার জগতে গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান। কার্গো হ্যান্ডলিং, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, স্টেভেডরিং থেকে শুরু করে বন্দর বার্থের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, নানা ক্ষেত্রেই কাজ করত তারা। সংস্থার প্রধান গ্রাহকদের তালিকায় ছিল স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া, টাটা স্টিল, টাটা কেমিক্যালস, রুনটা মাইন্স এবং কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট। ব্যবসার পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবর্ষে সংস্থার টার্নওভার প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও সংস্থাটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ধরে রাখে এবং ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে শত কোটির বেশি নিট মুনাফা অর্জন করে।
নানান অভিজ্ঞতার পর টুটুবাবু ধীরে ধীরে মন দেন তাঁর মূল ক্ষেত্র জাহাজ ও নৌ-পরিবহণ ব্যবসায়। সেই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে ‘রিপ্লে অ্যান্ড কোং’।
তবে টুটুবাবুর আগ্রহ শুধুই বন্দর বা পরিবহণ ব্যবসায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মিডিয়া জগতেও তিনি নিজের উপস্থিতি জানান দেন। তিনি পরিচালনা করতেন ‘রেডিও এশিয়া নেটওয়ার্ক’ এবং ‘ডলফিন রেকর্ডিং স্টুডিও’। পশ্চিম এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যে এই রেডিও নেটওয়ার্ক বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। মালয়ালম ভাষায় ‘রেডিও এশিয়া’ (এএম), হিন্দি-উর্দু ভাষায় ‘সুনো ১০২৪’ (এফএম) এবং মালয়ালম ও তামিল ভাষায় ‘সুপার ৯৪৭’ (এফএম) — এই চ্যানেলগুলির মাধ্যমে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে পৌঁছে যেত বিনোদন ও নিজভাষার টান।
সংবাদমাধ্যমের প্রতি তাঁর আগ্রহ অবশ্য আরও পুরনো। ১৯৯২ সালের আগস্টে 'সংবাদ প্রতিদিন' পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিডিয়া ব্যবসায় প্রবেশ করেন তিনি। পরে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশ শুরু হয় দ্য 'এশিয়ান এজ'-এর সংস্করণ। সেই উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। যদিও দশকের শেষ দিকে তিনি সংস্থা থেকে সরে দাঁড়ান এবং নিজের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে আসেন।
মোহনবাগান ক্লাব থেকে বের করা হচ্ছে টুটুবাবুর নিথর দেহ।
টুটুবাবুর বিশ্বাস ছিল, ব্যবসার আসল ভিত্তি শুধু অর্থ বা চুক্তি নয়, মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন, কাউকে সত্যিকারের সম্মান ও ভালোবাসা দিলে মানুষও নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়। তাঁর কাছে এটাই ছিল ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন। ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কের শক্তিকেই তিনি সব সাফল্যের ভিত বলে মনে করতেন। মানুষের মন জয়ের জন্য তাঁর ছিল এক সহজ অথচ অভিনব উপায় খাবার। নিজে খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন, আর অন্যকে খাওয়াতে তার থেকেও বেশি আনন্দ পেতেন। কার কী প্রিয় খাবার, তা মনে রাখতেন যত্ন করে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গুরুগম্ভীর মিটিংয়ের আগে যদি সুন্দর খাবার পরিবেশন করা যায়, তাহলে পরিবেশ অনেকটাই সহজ ও আন্তরিক হয়ে ওঠে। ইংরেজি প্রবাদ “The way to a man’s heart is through his stomach”, যেন তাঁর জীবনদর্শনেরই অংশ ছিল।
বিশ্বাস ছিল, ব্যবসার আসল ভিত্তি শুধু অর্থ বা চুক্তি নয়, মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন, কাউকে সত্যিকারের সম্মান ও ভালোবাসা দিলে মানুষও নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়। তাঁর কাছে এটাই ছিল ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন।
ব্যবসার জগতে চলার পথে বহু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি। তাঁদের কয়েকজনের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন টুটুবাবু। প্রথমেই আসে রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কার নাম, যাঁকে তিনি স্নেহ করে ‘রমাবাবু’ বলতেন। ব্রিটিশ সংস্থা সিইএসসি কিনে একসময় সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, সাবলীল বাংলা বলা রমাবাবুকে দেখে অনেকেই বুঝতে পারতেন না যে, তিনি অবাঙালি। সঞ্জীব গোয়েঙ্কা যাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। এছাড়াও শিল্পপতি কৃষ্ণকুমার বিড়লার কাছ থেকেও জীবনের ও ব্যবসার নানা শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। কলকাতায় এলেই তাঁকে মধ্যাহ্নভোজে ডাকতেন বিড়লা। সেই আড্ডা ও আলোচনা টুটুবাবুর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পিয়ারলেসের এসকে. রায় ছিলেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আবার বেঙ্গল পিয়ারলেসের শীর্ষকর্তা কুমারশঙ্কর বাগচীকে তিনি পরিবারের অভিভাবকের মতো মনে করতেন। তাঁর খুব প্রিয় ছিলেন বিস্ক ফার্মের কর্ণধার কেডি পাল। বিস্ক ফার্মের বিস্কুট তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকাতেও ছিল উপরের দিকে। পাশাপাশি ব্যবসার নানা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন তাঁর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হিসাবে পাশে ছিলেন পবনকুমার বুধিয়া এবং এনকে কাপুর। একটা পর্বে জীবন যেহেতু অসম্ভব অনিশ্চয়তা পেরনো মানুষটি এভাবেই ক্রীড়াজগতের পাশাপাশি ব্যবসায়িক জীবনেও বর্ণময় চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। ময়দানের অজাতশত্রু, দূরদর্শী টুটুবাবুকে মিস করবেন সকলে।
