ব্রাজিল। বিশ্বফুটবলের এক নক্ষত্রের নাম। যে দল প্রত্যেকটি বিশ্বকাপ খেলার নজির গড়েছে। যে মাটি যে কোনও পরিস্থিতিতে পায়ে বল নিয়ে লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে গোটা বিশ্বকে। দারিদ্রকে উপেক্ষা করে যে ভূমিতে ফুটবলই হয়ে উঠেছে ধর্ম। যে দেশ জন্ম দিয়েছে পেলে, গ্যারিঞ্চা, রোনাল্ডো, রোমারিও, রোনাল্ডিনহোর মতো স্বপ্নের সওদাগরদের। যে দেশকে এককথায় ফুটবলের মক্কা বলে মেনে নিয়েছে দুনিয়া। সবচেয়ে বেশি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডও তারই ঝুলিতে। যে দেশের পতাকা বুকে জড়িয়ে ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরের কোনও ভারতীয় সমর্থকও রাত জাগে। জোগা বোনিতো দেখার লোভে। সেলেকাওদের নতুন কোনও ইতিহাস গড়তে দেখার আকাঙ্ক্ষায়। হেক্সার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে পড়শি দেশের (পড়ুন আর্জেন্টিনা) ভক্তের সামনে কলার তুলে ঘোরার। কিন্তু ২০০২-এর পর থেকে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়নের ব্যবধান ক্রমেই দীর্ঘায়িত হয়েছে। দুয়োরানির মতোই মুখ ফিরিয়েছে সোনালি কাপ। নেপথ্যে কি ইউরোপীয় ফুটবলের দাপট? বিশ্বমঞ্চে কি ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে লাতিন-আমেরিকার ফুটবল শৈলী?
২০০২-এর পর এখনও ব্রাজিলের কাছে অধরা মাধুরী। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ বিশ্বকাপের দিকে যদি তাকানো যায়, ইইরোপীয় ফুটবলের দাপট সেখানে স্পষ্ট। খেলার টেকনিক থেকে স্ট্র্যাটেজি, কখনও আলোচনায় উঠে এসেছে তিকি-তাকা তো কখনও চর্চায় পাওয়ার আর প্রেসিং ফুটবল। ক্রমেই যেন ফিকে হয়েছে লাতিন-আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবলের আকর্ষণ। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল এবারের বিশ্বকাপে নেইমারদের হেডস্যরের আগমন।
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেনরা যে ফর্মে রয়েছে, তাতে বিশ্বজয়ের দৌড়ে যে আরও একবার ইউরোপ মহাদেশই এগিয়ে, তা বলা অত্তুক্তি হবে না। জৌলুস হারিয়েছে এককালের বিশ্বজয়ী উরুগুয়ের খেলা।
উত্তরসূরি তৈরিতে চিরকাল দেশীয় প্রতিভাতেই ভরসা রেখে এসেছে ব্রাজিল। ফিলিপ স্কোলারি থেকে আলবার্তো পেরেইরা, দুঙ্গাদের তত্ত্বাবধানেই সম্বৃদ্ধ হয়েছে দল। কিন্তু এই প্রথমবার ইউরোপের কোনও কোচকে ফুলটাইম কোচ হিসেবে পেল সেলেকাও। কার্লো আন্সেলোত্তি। কোচ হিসেবে যাঁর অতীত পরিসংখ্যান রীতিমতো ঈর্ষণীয়। কার্যত তারকাহীন ব্রাজিল তাঁর হাত ধরেই ঘটাবে মিরাকল। তেমনই আশা ছিল অগণিত ভক্তের। জোগা বোনিতোকে অতীত করে খেলার স্টাইলেও ঘটান বদল। যেখানে খেলার সৌন্দর্যের থেকে জয়ই প্রধান লক্ষ্য। চেনা ছক ভেঙে দল সাজান। ফ্রান্স-স্পেন-জার্মানি-পর্তুগাল-নরওয়ের মতো ইউরোগীয় ফুটবলের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠতেই তো নীল-হলুদ শিবিরে আন্সেলোত্তি। কারণ ওই বিপক্ষদের ছন্দকে তো হাতের তালুর মতোই চেনেন ইটালীয় কোচ। কিন্তু দুর্বল মাঝমাঠ আর চোট-আঘাতে জর্জরিত ব্রাজিলকে নিয়ে বেশি দূর এগোতে পারলেন না তিনি। আরও একবার সেই ইউরোপীয় ফুটবলেই আহত পাঁচবারের বিশ্বজয়ীরা। এই নিয়ে ছ'বার। যে বিপর্যয়ে আবার প্রতিবার জয়ীদের সারিতে ছিল নরওয়ে। তাও আবার ১৯৯০-এর পর এই প্রথম শেষ ১৬ থেকেই ছিটকে গেলেন ভিনিরা।
চলতি বিশ্বকাপে (FIFA world cup 2026) ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেনরা যে ফর্মে রয়েছে, তাতে বিশ্বজয়ের দৌড়ে যে আরও একবার ইউরোপ মহাদেশই এগিয়ে, তা বলা অত্তুক্তি হবে না। জৌলুস হারিয়েছে এককালের বিশ্বজয়ী উরুগুয়ের খেলা। ভেনেজুয়েলা, প্যারাগুয়ে, চিলির মতো দলগুলি দীর্ঘদিন বিশ্বকাপে নিজেদের ছাপ ফেলতে ব্যর্থ। লাতিন আমেরিকার গড় যেন একাই সামলাচ্ছে আর্জেন্টিনা। বলা ভালো লিওনেল মেসি নামক এক মহামানব। তাঁর অবসরে দেউল-টিতে আদৌ আলো জ্বলবে তো? প্রশ্নটা কিন্তু উঁকি দিতে শুরু করেছে।
তবে কি আগামী প্রজন্মের বিস্মৃতির পাতায় চলে যাবে বিশ্বকাপের জন্মকালের চ্যাম্পিয়নরা? মন জুড়ে কেবল রাজত্ব করবে ইউরোপ? অদৃশ্য 'হেইল ইউরোপীয় ফুটবল' স্লোগানের মাঝে বদলে যাবে চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ? হয়তো অনেকটাই বদলে যাবে। হয়তো সবটা বদলাবে না। আবার বিশ্বকাপের আসর বসবে। আমার-আপনার মতো অগুনতি ব্রাজিল ভক্তরা আবেগে ভাসবে, গলা ফাটাবে, রাত জেগে কাঁদবেও। বিশ্বাস করবে, খোঁচা খাওয়া বাঘ আবারও জ্বলে উঠবে। আর আগামীর নেইমারদের বলবে, তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও। আমরা ছিলাম-আছি-থাকব।
