বক্তা বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা কোচ। যিনি কাপ-রক্ষার অভিযানে নামার আগে অকপট সাক্ষাৎকার দিলেন আর্জেন্টিনার এক সংবাদমাধ্যমে। যা হুবহু নিচে তুলে দেওয়া হল...
আর্জেন্টিনার প্রস্তুতি
আমাদের প্রিপারেশন দারুণ চলছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে, টুর্নামেন্টে পারফর্ম করার জন্য যে টিম বেস লাগে, তা রয়েছে আমাদের। তা ছাড়া গত বারের স্কোয়াডের ষাট-সত্তর শতাংশ প্লেয়ার এবারও খেলবে। প্লেয়াররা একে অন্যকে জানলে-চিনলে একটা সুবিধা তো হয়ই। কারণ, ওরা তখন একে অন্যকে জানবে যে কী করতে পারে না পারে। কিছু ভুলত্রুটি থাকলে, সেটাও শুধরে নেওয়া যায় দ্রুত। আর্জেন্টিনা ছাড়াও বাদবাকি টিম ভালো ‘শেপ’-এ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় একশো শতাংশ ফর্ম-ফিটনেস-দক্ষতা নিয়ে পৌঁছনো সম্ভব হয় না। তবে আমাদের প্রিপারেশন মন্দ চলছে না।
কোচিং নিয়ে পিতার পূর্বাভাস
আমার বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি কোনও কিছু নিয়ে ভয় পান না। যখন যা মনে হয়, সরাসরি বলে দেন। মনে আছে, আজ থেকে বারো-পনেরো বছর আগে উনি বলতেন, মিলিয়ে নিও একদিন আমার ছেলে আর্জেন্টিনার কোচ হবে! সেই সময় উনি মায়োর্কার কোচ। অথচ তখন থেকেই কথাটা বলে বেড়াতেন। ওঁর সাহস শিক্ষণীয়। বাবার সে গুণ আমিও কিছুটা পেয়েছি।
দেখুন, আমি জানতাম না সব কিছু জীবনে পাব কি না? কিন্তু নিজের স্বপ্নকে, নিজের লক্ষ্যকে তাড়া করার সাহস আমার সব সময় ছিল। যে কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস ছিল। নিজের কাজের দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা ছিল। আর দীর্ঘদিন কোচিংয়ে থাকার পর, যুব দলের দায়িত্ব পালনের পর আস্তে আস্তে আর্জেন্টিনা জার্সির মাহাত্ম্য বুঝতে পারবেন আপনি। আমি বুঝেছি, কোচ হল টিমের সবচেয়ে গুরুত্বহীন ব্যক্তি।
যাক গে, বাবাকে নিয়ে বলছিলাম। অনেক সময় এমন হয়েছে যে বাবাকে বলেছি, আগামী রবিবার অমুকের সঙ্গে খেলা। জানি না কী হবে? উনি কিন্তু প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমাকে বলতেন, “ভয় পেয়ো না। কিছুই হবে না। যা-ই হবে, সেটাকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।” বাবার কাছে সব সময় দেশ আগে। জাতীয় পতাকা আগে। বাবা যে বলতেন, এগিয়ে যাও– তার মধ্যে কিন্তু একটা অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল। উনি আমাকে প্রকারান্তরে বোঝাতেন যে, হার নিয়ে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ পরের দিন সূর্য ঠিকই উঠবে। জীবনও এগোবে। বাবার বয়স হয়ে গিয়েছে এখন। কিন্তু হার না মানা পুরনো সেই মানসিকতা আজও টাল খায়নি। আজও যোদ্ধার মানসিকতা নিয়ে ঘোরে বাবা। আমিও চেষ্টা করি, যাতে আমার সন্তানরা বদলে না যায়। স্পেনে জন্ম ওদের। কিন্তু আমি চেষ্টা করি, আর্জেন্টিনার সংস্কৃতি ওদের বোঝাতে।
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে স্কালোনি। ফাইল ছবি
বিশ্বকাপ রক্ষা করার চাপ
সেটা আর নতুন কী? যখনই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলতে যায়, তখনই মানুষের মধ্যে ট্রফি নিয়ে প্রত্যাশা জন্ম নেয়। সবাই ধরেই নেয় যে, আমরাই বিশ্বকাপ জিতব। সেই ধারণা বদলানোর কোনও সম্ভাবনা নেই। আমাকে কেউ একজন বলল যে, এটা আমার চতুর্থ বিশ্বকাপ হতে চলেছে। ব্যক্তিগত ভাবে বলব, ২০০৬ সালে আমাদের টিমটা দারুণ ছিল। প্রত্যাশাও ছিল প্রচুর। তবু আমরা সেবার লক্ষ্যপূরণ করতে পারিনি। তবু আমার কাছে ২০০৬ বিশ্বকাপ টিমটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকবে। তা সে যতই বিশ্বকাপ আমরা সে বার জিততে ব্যর্থ হই না কেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা বরাবর কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল বিশ্বকাপের, আগামীতে থাকবেও। পৃথিবীর যে ক’টা টিম বিশ্বকাপকে আলোকিত করে, আর্জেন্টিনা তার একটা। যা ভবিষ্যতেও করবে।
বিশ্বকাপের দশ ফেভারিট
দশ? কারও নাম বাদ-টাদ পড়ে গেলে বলবেন। দেখুন, বিশ্বকাপ যখন আর্জেন্টিনা খুব স্বাভাবিক ভাবেই ফেভারিট। আমি জানি না, আমার টিম বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) জিততে পারবে কি না? কিন্তু ফাইনালে ওঠার জন্য টিমের এগারো-বারো জন যে প্রাণপণ লড়বে, সেটুকু গ্যারান্টি। স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, কলম্বিয়া জিততে পারে কাপ। এমনকী উরুগুয়েও পারে। আর্জেন্টিনা রয়েছে। মরোক্কো রয়েছে। দেখলেন, ঠিক ক্রোয়েশিয়ার নাম ভুলে গেলাম। আরও কয়েকটা নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। আসলে বিশ্বকাপ জেতা সহজ নয়। শুধুমাত্র ভালো টিম হলে চলে না। টুর্নামেন্টের আলোকবর্তিকা হলে চলে না। একই সঙ্গে একাধিক ফ্যাক্টর আপনার পক্ষে গেলে তবে বিশ্বজয়ী হতে পারবেন।
বাবার বয়স হয়ে গিয়েছে এখন। কিন্তু হার না মানা পুরনো সেই মানসিকতা আজও টাল খায়নি। আজও যোদ্ধার মানসিকতা নিয়ে ঘোরে বাবা। আমিও চেষ্টা করি, যাতে আমার সন্তানরা বদলে না যায়। স্পেনে জন্ম ওদের। কিন্তু আমি চেষ্টা করি, আর্জেন্টিনার সংস্কৃতি ওদের বোঝাতে।
আমাদের গত বারের টিমটাই দেখুন। কম দুর্গম পথ আমাদের সামনে অপেক্ষা করে ছিল? গত বার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটা আমরা হেরে গিয়েছিলাম। নেদারল্যান্ডস আমাদের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে গোল করে খেলায় সমতা ফিরিয়ে এনেছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা পেনাল্টি শুট আউটে জিতি। ফাইনালেও তো। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আমরা ২-০ জিতছিলাম। কিন্তু ওরা ঠিক শেষ দিকে ২-২ করে দিল। সব কিছু মাথায় রেখেই বলছি, কাতার বিশ্বকাপে আমাদের সবচেয়ে বেশি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তাই বলছি, আমরা যোগ্য হিসেবেই বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিলাম। যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্বজয়ী হয়েছিলাম। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে হেরে গেলেই আমাদের বিশ্বকাপ জেতা হত না।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যৎ
সব ঠিকই রয়েছে। সব ঠিকঠাকই চলছে। আমার যদি কারও সঙ্গে বসে কথা বলতে হয়, শ্রেষ্ঠ সমাধানই খুঁজে নেব। তবে এটা ঠিক যে, যে দিন আমি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব ছেড়ে দেব, তার পরের দিন থেকে সেটাকে মিস করব। আক্ষেপ কাজ করবে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল এক স্বপ্নের জায়গা। আমি বরাবর তাই মনে করে এসেছি। বিশ্বকাপটা যাক। মিটুক। তার পর নিজের ভবিষ্যৎ ভাবব। তবে দেখতে হবে, দু’পক্ষের আগ্রহ সমান রয়েছে কি না? সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যা-ই হবে, বিশ্বকাপের পরে হবে।
দেশের সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা
নিজেদের সর্বস্ব দেব আমরা। কারণ, আমাদের টিমের ক্ষমতা রয়েছে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার। আবারও বলছি, বিশ্বকাপ আমরা জিততেও পারি, না-ও জিততে পারি। কিন্তু আর্জেন্টিনার অসম্মান আমরা হতে দেব না। প্রতিটা প্লেয়ার, যারা মাঠে নামবে, জীবনপাত করবে বিশ্বজয়ের। তার পর হলে হবে। নইলে হবে না।
