এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লংজাম্প। পাঁচ বছরের শিশুদের ক্যাটাগরিতে লংজাম্পের রেকর্ডটা কিন্তু এখনও তাঁর পকেটে। তাঁর বলতে, আর্লিং হালান্ডের (Erling Haaland) কথা বলছি। বিশ্বাস হল না বুঝি?
মাত্র পাঁচ বছরে ১.৬৩ মিটার লংজাম্প দিয়েছিলেন। এখনও যা কোনও শিশু টপকাতে পারেনি। সেই ছোট্ট বয়সের অভ্যাস। যে বয়সে বাচ্চা ড্রইংরুমে ট্রাইসাইকেল শেখে, সেই বয়সেই হালান্ড ঠিক করে নিয়েছিলেন লম্বা লাফ দেবেন। সেই লাফে একদিন সবাইকে ছাপিয়ে যাবেন। তাঁর লাফ এখন এতটাই লম্বা যে, মাটিতে দাঁড়িয়েও আকাশে উড়তে থাকা ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্নের ফানুস টেনে হিঁচড়ে অনায়াসে নামিয়ে আনতে পারেন। যেমন রবিবার নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে করলেন।
মাঠের ভিতর প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া ‘খুনে’ মানসিকতার হালান্ডের মনের অতলে এক শিল্পী সত্ত্বা বাস করে। জানেন? নরওয়ের অনূর্ধ-১৭ দলের হয়ে খেলছিলেন। হালান্ডের আরও দুই সতীর্থ, এরিক বোথেইম আর এরিক টোবিয়াস তাঁরাও সেই দলে। তিন বন্ধু ঠিক করলেন, ফুটবল খেলার বাইরে ‘ফ্লো কিং’ নামে একটি ব্যান্ড তৈরি করবেন। গান গাইবেন। স্ট্র্যাটেজি তৈরি করলেন হালান্ড। সেই গান এখন ইউটিউবে কয়েক বিলিয়ন ভিউ।
হালান্ড রাজি থাকলে নরওয়ে কেন, এই বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) হ্যারি কেনের সঙ্গেই জুটি বেঁধে খেলতে পারতেন। তাঁর বাবা খেলতেন, লিডস ইউনাইটেডে। সেই সময়েই তাঁর জন্ম লিডসে। জন্মগত সূত্রেই ইংল্যান্ডের হয়ে খেলায় কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু সেই ছোট্ট থেকে জানতেন, তাঁর দেশ আসলে নরওয়ে। মাতৃভূমির টানের থেকে বড় কিছুই হয় না। মাত্র ২৫-২৬ বছরের মধ্যেই হালান্ড এমন এমন সব গোলস্কোরিং রেট তৈরি করে ফেলেছেন, নরওয়ের কিংবদন্তি ফুটবলার, একদা ম্যানইউ তে খেলা ওলে গানার সোলজায়ার, জন আর্নে রিসারা, অনেক পিছনে পড়ে গিয়েছেন।
সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ইতিমধ্যেই নরওয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ক্লাব ফুটবলেও গোলের যা তাণ্ডব তিনি দেখিয়েছেন, সেখানেও ম্যাচ প্রতি গোল রয়েছে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর, তাঁর হাত না কি ‘পা’ ছুঁয়েই তো নরওয়ে ফের বিশ্বকাপে। সঙ্গে ইতিহাসে প্রথম বারের জন্য কোয়ার্টার ফাইনালেও। ২৮ বছর আগে রোনাল্ডো, রবার্তো কার্লোসদের ব্রাজিলকে হারালেও শেষ ষোলোয় হেরে যায় ইতালির কাছে। সেই সময় নরওয়েতে একজন হালান্ড ছিলেন না। যে পেপ গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে প্রথম বছরেই ইপিএলের পরিসংখ্যানবিদদের বাধ্য করেন তাঁর জমানায় আবার নতুন করে পরিসংখ্যানের হিসাব রাখতে। এক মরশুমে ৩৬ গোল করে এখনও পর্যন্ত এক মরশুমে ইপিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গেলাদাতা তিনিই। এ হেন স্ট্রাইকার নিয়ে আন্সেলোত্তির আধুনিক কোচিং ব্যাকরণে কেন আলাদা করে কোনও চ্যাপ্টার থাকবে না সেটাই তো আশ্চর্যের।
গোলের পর হালান্ড। ছবি: সংগৃহীত।
দ্বিতীয়ার্ধের ছোট্ট একটা স্পেলে ব্রাজিলের ডিফেন্সে এমন দুটো মিসাইল ছুঁড়লেন, সেখানেই ব্রাজিল ফুটবলের ওখানেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। তারপরেও নায়কের মনে হচ্ছে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যা হল, তা ‘অবিশ্বাস্য।’ বলছিলেন, “২৮ বছর পর শুধু বিশ্বকাপ খেলে সন্তুষ্ট থাকতে চাইনি। বিশ্বফুটবলকে দেখাতে চেয়েছিলাম, সাফল্যর লক্ষ্য নিয়েই আমরা আমেরিকা এসেছি।’ দুটো গোল যেন ব্রাজিল ডিফেন্সে আছড়ে পড়া দুটো মিসাইল। হালান্ড বলছিলেন, “জানতাম, ওডেগার্ড ঠিক সময়ে আমাকে পাস বাড়াবে। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। আমি আমার কাজটুকু ঠিক করে করেছি মাত্র। দ্বিতীয় গোলটির কথা যদি বলেন, শট নেওয়ার মুহূর্তে একটাই কথা মাথায় ঘুরছিল। বলটা জালের এমন জায়গায় রাখতে হবে, যাতে আলিসন সেভ করার কোনও সুযোগ না পায়। সেটাই করেছি।” কিন্তু তা বলে ম্যাচ শেষে, ‘ওয়েল, ওয়েল, ওয়েল’ সোশ্যাল মিডিয়াতে এই একটি শব্দ তিনবার লিখে ব্রাজিল ফুটবলকে এভাবে হেয় করবেন?
মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ম্যাচের নায়ক বলেন, “আমার পোস্টের মাধ্যমে কোনওভাবেই ব্রাজিলকে হেয় করার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। ব্রাজিল ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে আমি ভীষণই সম্মান করি। আসলে ম্যাচের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন, মাঠের মধ্যে ব্রাজিল আমাদের নিয়ে ছেলেখেলা করবে। বিশ্বকাপের বাইরে ছিটকে দেবে। বলতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়ার আমার বার্তা ওই সমালোচকদের জন্য।” হালান্ড নিয়ে সারাবছর যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে রাতে ঘুমোনোর কিছুক্ষণ আগে বিশেষ ধরণের একটা চশমা পরেন তিনি। এই চশমার গ্লাসে এমনভাবে ফিল্টার করা থাকে, যাতে টিভি, কিংবা মোবাইল, কোনওরকম আলোই তাঁর চোখকে প্রভাবিত করতে না পারে। নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার জন্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাঁর এই চশমা তৈরি।
খালি ভাবছি, ইংল্যান্ড আর মেক্সিকোর ডিফেন্ডারদের কথা। এদের মধ্যে যারা জিতবে, তারাই কোয়ার্টার ফাইনালে হালান্ডের তান্ডবের মুখে পড়বেন। তার আগে সেই ডিফেন্ডাররা প্রার্থনা করতে শুরু করুন। হালান্ডের সেই বিশেষ চশমাটা যেন বিশ্বকাপের মধ্যে হারিয়ে যায়। না হলে নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর পর কী তান্ডব তিনি করতে পারেন, ব্রাজিলের গ্যাব্রিয়েল নিশ্চয়ই বুঝেছেন!
