এ তো চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের অ্যাকশন রিপ্লে। নিয়ম হচ্ছে, ম্যাচের আগে কোচের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে আসবেন দলের অধিনায়কও। তবে মারাত্মক কিছু সমস্যা হলে অধিনায়কের জায়গায় অন্য ফুটবলারও আনতে পারেন কোচ। আর মাচের সেরা ফুটবলার হলে, ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে আসতেই হবে। কিন্তু ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে কবে আর শুনছেন কার কথা? কাতার বিশ্বকাপে সাংবাদিক সম্মেলনে না এসে দিনের পর দিন আর্থিক জরিমানা দিয়েছেন। সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু চলবেন তিনি নিজের মর্জিমতো। এটা ঠিক যে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ মানেই একটা স্নায়ুর যুদ্ধ। কিন্তু প্রথম ম্যাচ মাঠে বল গড়ানোর আগেই যদি খোদ ফরাসি (France) শিবিরের অন্দরমহল থেকে বারুদের গল্প বার হতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে মহানাটকের স্ক্রিপ্ট তৈরি। আর সেই নাটকের কেন্দ্রে যথারীতি সেই একজনই, কিলিয়ান এমবাপে।
ম্যাচের আগের দিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সরকারি সাংবাদিক সম্মেলনে অধিনায়কের চেয়ারে এমবাপেকে দেখার জন্য যখন বিশ্বের সংবাদমাধ্যম উন্মুখ হয়ে বসে আছে, তখন পরিবর্ত হিসেবে মঞ্চে এলেন কন্তে! কিন্তু এমবাপে কোথায়? আসলে এমবাপে খুব ভালো করেই জানেন, পিএসজি-র বকেয়া নিয়ে গোলমাল আর রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে হাতের কাছে পেয়ে সাংবাদিকরা এমন সব বাউন্সার ছুঁড়বেন, যাতে ফোকাস নড়ে যেতে পারে। তাই প্রথম ম্যাচের আগে নিজেকে আড়ালে রেখে এগিয়ে দিলেন কন্তেকে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম কি আর অত সহজে সন্তুষ্ট হয়? ব্যাপারটা টের পাওয়া গেল, যখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনের মঞ্চে এসে বসলেন কোচ দিদিয়ের দেশঁ। অবধারিতভাবেই ফরাসি সাংবাদিকদের প্রথম প্রশ্নটাই ধেয়ে গেল এমবাপের অনুপস্থিতি নিয়ে।
দেশঁ অবশ্য চিরকালই ড্রেসিংরুমের চোরাস্রোত সামলাতে দারুণ ডিফেন্ডারের ভূমিকা নিয়ে থাকেন। এবারও মেজাজ না হারিয়ে বললেন, "এমবাপে কেন আসেনি, তা নিয়ে জলঘোলা বন্ধ করুন। এটা সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত ছিল। মিডিয়ার সামনে সময় নষ্ট না করে ও মাঠের ভিতর নিজের খেলায় মন দিক, সেটাই চাই। এমবাপে দলের অধিনায়ক। ও জানে কখন কী করতে হয়।" দেশঁ যতই ড্যামেজ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করুন না কেন, সাংবাদিক সম্মেলনে এমবাপেকে নিয়ে ফিসফাসটা চলতেই লাগল। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্ন এসেছিল, পিএসজি বনাম আর্সেনাল কোন্দলের গুঞ্জন নিয়েও। সব প্রশ্নই উড়িয়ে দিলেন দেশঁ। একটু হালকা হেসে বললেন, "ক্লাব ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। সবাই পেশাদার ফুটবলার। ড্রেসিংরুমে কোনও ফাটল বা দলাদলি নেই, সবাই একটা পরিবার। যে পরিবারের একটাই লক্ষ্য, ফ্রান্সকে ফের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করা।"
অলিখিত নিয়ম হল, যে ফুটবলার ব্যালন ডি'অর পান, পুরো দলটা তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু ফ্রান্সের এই দলে নিয়মটা আলাদা। দেম্বেলে ব্যালন ডি'অর পেলেও এই দলে তিনি আসলে এমবাপের ছায়া! পুরো দলটা চলে এমবাপের ইশারায়। এর উপর আবার মাইকেল ওলিসে প্রস্তুতি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে দেম্বেলের ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলছেন। এই 'ব্যালন ডি'অর বনাম এমবাপের ছায়া'-র দ্বৈরথ নিয়ে যখন দেশঁ-কে জিজ্ঞাসা করা হল, ফুটবলারদের ব্যক্তিগত ইগো এক ঝটকায় সরিয়ে তিনি বললেন, "ব্যালন ডি'অর একটি দারুণ ব্যক্তিগত সম্মান। কিন্তু আমি এখানে কোনও ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো দল নিয়ে এসেছি। দেম্বেলে আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ও খুব ভালো করেই জানে। বাইরে কে কী গল্প বানাচ্ছে, কে কার ছায়ায় ঢাকা পড়ছে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমাদের নেই।"
মাঠের বাইরের খবর, মাঠের বাইরেই থাক। দেশঁর তারকখচিত স্কোয়াড যে প্রথম ম্যাচে ফেভারিট হিসেবেই বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) অভিযান শুরু করাতে চলেছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। দেশঁ নিজে না বললেও, ফরাসি সাংবাদিকরা বলছিলেন, ৪-৩-৩ ছকেই প্রতিপক্ষকে ধধ্বংস পরিকল্পনা করেছেন দেশঁ। সেনেগালের (Senegal) বিরুদ্ধে বারের নিচে লরিসের উত্তরসূরি মাইক মাইগনান নিশ্চিত। ডিফেন্সে জুল কুন্দের সঙ্গে জুটি বাঁধছেন বায়ার্নের উপামেকানো এবং বাঁ-দিকে গতি বড়াতে তৈরি থিও হার্নান্ডেজ। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তি, ডিফেন্সিভ হিসেবে দাঁড়াবেন সেই উইলিয়াম সালিবা। মাঝমাঠের দখল নিতে থাকছেন চুয়ামেনি এবং এনগোলো কন্তে। আর ফাইনাল থার্ডের আসল চমক। ডানদিকে ব্যালন ডি'অর জয়ী উসমান দেম্বেলে, মাঝখানে স্ট্রাইকার মার্কাস থুরাম এবং অবশ্যই বাঁ-প্রান্ত দিয়ে চিতার গতিতে বক্সে ঢুকে পড়ার জন্য তৈরি স্বয়ং কিলিয়ান এমবাপে।
কাগজে কলমে এই কুন্দে-সালিবা-এমবাপের দল যে কোনও প্রতিপক্ষের রাতের ঘুম উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দেশঁ নিজেই তো সাংবাদিক সম্মেলনে হুঙ্কার দিয়ে গেলেন, "আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে বা গ্রুপ পর্ব পার করতে আসিনি। আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার। ফের ট্রফিটা তুলে ধরা।" কিন্তু এসবের মধ্যেও সব থেকে বড় প্রশ্ন, এমবাপের এই 'মৌনব্রত' আর দেশঁ-র এই চতুর 'মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট কি মাঠে গোল হয়ে ফুটবে? নাকি ফরাসি ড্রেসিংরুমের এই চোরাস্রোত গ্রাস করবে বিশ্বজয়ের স্বপ্নকে? উত্তরটা সময়ের হাতে, এদিন ফরাসি ঘিয়েটারে বিশ্বকাপ নামক নাটকের সবে প্রথমাঙ্ক।
