'দিস টাইম ফর আফ্রিকা।’
তাহলে কি বিশ্বফুটবলের ভারসাম্যর মানচিত্রে ধীরে ধীরে ক্ষমতার হাত বদল হতে চলেছে? ফুটবলকে কেন্দ্র করে সেই ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাক্ষী হয়ে রইল বহু ইতিহাসের আঁতুড় ঘর, এই আমেরিকা। ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানচিত্রের একচ্ছত্র আধিপত্যে এবার যেন ‘জয়কেতন’ উড়িয়েছে কালো মহাদেশ। সংখ্যাতত্বের বিচারে শুধু অধিক দেশের অংশগ্রহণই নয়। এক বিশাল সংখ্যায় আফ্রিকার ফুটবল দেশগুলিকে ইউরোপিয়ানদের হারিয়ে কবে আর সেভাবে নক আউট স্টেজে খেলতে দেখেছে বিশ্বফুটবল?
এতদিন বিশ্বফুটবল মানেই, হয় লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল, যে ফুটবলের ছন্দে আমাদের হৃদয়ে দুলেছে। আর না হয় ইউরোপের কিক অ্যান্ড রান। ধর। ছাড়। জায়গা নাও। এর মাঝেই অন্য একধারা নিয়ে হাজির আফ্রিকা। বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এভাবে আফ্রিকার পতাকা তুলে ধরে আধিপত্য বিস্তার করা, এর কোনওটাই কিন্তু আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং পরিকিল্পনামাফিক ভাবেই এই পিরামিডের মাথায় ওঠা। যে পরিকল্পনা আমরা ভারতীয় ফুটবল কর্তারা করতেই পারি না, সেটাই বিশ্বফুটবলে পরাক্রমশালী ফুটবল শক্তিধর দেশগুলির চোখে চোখ রেখে এই বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) দাপট দেখিয়েছে আফ্রিকা।
বিশ্বকাপে সেনেগাল দল
এবারের বিশ্বকাপে অধিক দল সংখ্যায়, আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের কোটা বৃদ্ধিতে শুধুমাত্র যে সংখ্যাতাত্বিক ভাবে আফ্রিকার ১০টি দল খেলার সুবিধে পেয়েছে এরকম নয়। ১০টি দলের মধ্যে ৯টি দলই কিন্তু নকআউট পর্বের ৩২ তম রাউন্ডে খেলেছে। যার অর্থ, শুধুই যে অংশগ্রহণের কোটা সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে আফ্রিকার বেশি সংখ্যক দল খেলার সুযোগ পেয়েছে, ব্যাপারটা এরকম নয়। পারফরম্যান্স দেখিয়েই নক আউটে পৌঁছে অন্তত এটা প্রমাণ হয়েছে, ‘আফ্রিকারে আর দাবায়া রাখা যাবে না।’
৯০’র রজার মিল্লার নাচ মনে আছে? ৩৮ এর ক্যামেরুনের বুড়ো ঘোড়া যখন গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে কোমর দোলাতেন, হেলে গিয়েছিল বিশ্বফুটবল। কিংবা ২০০২-এ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে সেনেগালের সেই দৌড়। কাতার বিশ্বকাপে প্রথমে স্পেন। তারপর পর্তুগাল। সবাইকে এক এক করে টপকে সেমিফাইনালে মরক্কো। আফ্রিকার ফুটবলের সেই সাফল্য তখন তো আর শুধুই ফ্লুক হতে পারে না। ছিল বিশ্বফুটবলে ‘কালো মহাদেশের’ আগমনী বার্তা। তারপরেও তা ছিল, আফ্রিকার একটি বা দু’টি দেশ কেন্দ্রিক। কিন্তু আমেরিকা বিশ্বকাপে এসে তা হয়ে গেল আফ্রিকার ফুটবলের সর্বজনীন বিজ্ঞাপন।
লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল, যে ফুটবলের ছন্দে আমাদের হৃদয়ে দুলেছে। আর না হয় ইউরোপের কিক অ্যান্ড রান। ধর। ছাড়। জায়গা নাও। এর মাঝেই অন্য একধারা নিয়ে হাজির আফ্রিকা। বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এভাবে আফ্রিকার পতাকা তুলে ধরে আধিপত্য বিস্তার করা, এর কোনওটাই কিন্তু আকস্মিক ঘটনা নয়।
মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকা, ডিআর কঙ্গো, মিশর, আলজেরিয়া, ঘানা এবং কেপ ভার্দে এবং তিউনিসিয়া। একমাত্র তিউনিসিয়া বাদে বাকি ৯টি দলই পরের রাউন্ডে। এরমধ্যে আবার নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে মরক্কো চলে গিয়েছে রাউন্ড-১৬তে। বাকি দলগুলির মধ্যে কেউ রাউন্ড-৩২ থেকে বিদায় নিয়েছে। কেউ এখনও লড়াইয়ে রয়েছে। কেপ ভার্দের মতো ৫ লক্ষ অধিবাসীর একটি পুঁচকে দেশ যখন প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপ খেলেই নক আউটে আর্জেন্টিনাকে চ্যালেঞ্জের জায়গায় চলে গিয়েছে, তখন মানতেই হবে, বিশ্বফুটবলের সমীকরণটা কিন্তু এবার ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কিংবা কঙ্গো অথবা ঘানা’র দাপট? ইংল্যান্ডের কাছে হেরে ডিআর কঙ্গো বিদায় নিলেও, হ্যারি কেনদের বিরুদ্ধে লড়াই কি কেউ ভুলতে পারবেন?
বিশ্বকাপে মহম্মদ সালাহদের দৌড়।
আফ্রিকান ফুটবল বলতেই এতদিন সবাই ভাবতেন, অমানুষিক গতি আর শারীরিক শক্তি নির্ভর ফুটবল। আমেরিকা বিশ্বকাপ দেখাল, আফ্রিকার ফুটবল মানে শুধুই আর শক্তি নির্ভর ফুটবল নয়। জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ট্যাকটিক্সের ছল-চাতুরি। বিশ্বের সেরা লিগগুলোতে কখনও স্যামুয়েল এতো, কখনও জর্জ উইয়া, কখনও দিদিয়ের দ্রোগবা। কখনও বা সালাহ। একের পর এক তারকা আফ্রিকান ফুটবলার রাজত্ব করেছেন। কিন্তু সবই ব্যাক্তিকেন্দ্রিক। দল হিসেবে আফ্রিকার উথ্থান কোথায়? এবারের বিশ্বকাপে নক আউটে সেনেগাল যখন বেলজিয়ামের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী লড়াই করেছে, কিংবা আইভরি কোস্ট যেভাবে হালান্ডদের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল, সেই ফুটবলে কিন্তু আর কোনও হীনমন্যতা নেই। রযেছে আফ্রিকান ফুটবলের জয়ধ্বনি। ইউরোপিয়ান লিগগুলো যখন এই আফ্রিকান ফুটবলারদের উপর ভর করে একের পর এক সাফল্য ঘরে তুলছে, তখন সেই ফুটবলাররা এবার একত্রিত হয়ে নিজের দেশের পতাকার তলায় লড়াই করলে কী হয়, উদাহরণ হয়ে রইল এই মার্কিন মুলুকে।
নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আশরাফ হাকিমিরা
আফ্রিকার এই সাফল্যর পিছনে বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি যে কারণগুলি উঠে আসছে তা হল, আগে কয়েকজন মাত্র তারকা আফ্রিকান ফুটবলারই দাপট দেখাতেন ইউরোপিয়ান লিগে। আর এখন সেখানে ঘানা, মরক্কো, সেনেগাল কিংবা আইভরি কোস্টের ফুটবলাররা ছেয়ে গিয়েছে লা লিগা, প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেশলিগা সহ পৃথিবীর একাধিক প্রথম সারির লিগে। সারা বছর ধরে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার পর যখন বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে, মাঠের মধ্যে আগের সেই পিছিয়ে থাকার হীনম্মন্যতাটাই উধাও।
গতি আর শারীরিক শক্তি তো ছিলই। এরসঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের ট্যাকটিক্স। এরসঙ্গে সবচেয়ে বেশি যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই দ্বৈত নাগরিককত্ব। যা নিমেষে বদলে দিয়েছে আফ্রিকান ফুটবলের চেহারাটা। মরক্কো কিংবা ঘানার বেশিরভাগ ফুটবলারেরই জন্ম ইউরোপে। ফুটবলে উন্নত দেশগুলির অ্যাকাডেমিতে বড় হয়েছে। সেখানকার আধুনিক পরিকাঠামোয় ট্রেনিং নিয়েছে। আর তারপরেই বিশ্বকাপের সময় শিকড়ের টানে ফিরে এসেছে নিজেদের দেশে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে, ৬ বছর আগে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ফিফার বদলে দেওয়া নিয়মে।
আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ
আগে ছিল, কোনও ফুটবলার, একটি দেশের সিনিয়র টিমের হয়ে যদি একটাও ম্যাচ খেলে ফেলেন, তাহলে আর দেশের জার্সি বদলানোর সুযোগ পেতেন না। আর এখন বদলে নিয়ম হয়েছে, সর্বোচ্চ তিনটে ম্যাচ পর্যন্ত খেলা যাবে। তবে বয়স থাকতে হবে ২১-এর কম। বিশ্বকাপ কিংবা ইউরো বা কোপার মতো কোনও প্রতিযোগিতায় নাম নথিভুক্ত করা যাবে না। তাহলেই আর শিকড়ের টানে নিজের ভূমিতে ফিরতে কোনও বাঁধা নেই। সেই শিকড়ের টানেই বাঁধনমুক্ত হয়ে ঘরে ফিরেছেন আইয়ুব বুয়াদিরা। আর বদলে দিয়েছেন বিশ্বফুটবলের ভারসাম্যর খেলাটা। লাতিন আমেরিকা আর ইউরোপ ঘুরে দাদাগিরির ব্যানটা এখন আফ্রিকার হাতে ওঠার অপেক্ষায়। তারজন্য চাই বড় মঞ্চে একটা ট্রফি। এখনও তো টিকে আছে মরক্কো। দেখাই যাক না। বলা তো যায় না, ‘দিস টাইম ফর আফ্রিকা…।’
