বাইশ বছর। সময়টা নেহাত কম নয়। একটা আস্ত প্রজন্ম বদলে যাওয়ার জন্য এই দু'টো দশক যথেষ্ট। ২০০৪ সালে যখন আর্সেন ওয়েঙ্গারের সেই আর্সেনাল থিয়েরি অঁরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা আর ডেনিস বার্গক্যাম্পদের নিয়ে অপরাজিত থেকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগটা পকেটে পুরেছিল, ময়দানের লাল-হলুদ তাঁবু তখন সুবাস ছড়াচ্ছে অন্য এক সাফল্যের। সালটা মনে করে দেখুন, ২০০৪। ঠিক বাইশ বছর আগে সুভাষ ভৌমিকের সেই স্বপ্নের ইস্টবেঙ্গল ব্যাক-টু-ব্যাক জাতীয় লিগ ঘরে তুলছে। বাইচুং ভুটিয়া গোল করছেন, ডগলাস ডি সিলভা মাঝমাঠ শাসন করছেন আর মাইক ওকোরোকে আটকানো যাচ্ছে না। টেমসের পাড় আর গঙ্গার পাড় তখন যেন একই সমান্তরালে সাফল্যের চওড়া হাসিতে ভাসছিল। তারপর? তারপর শুরু হল এক অন্তহীন, বুকফাটা মরুদ্যান।
লন্ডনের উত্তর ভাগে গানার্সদের ট্রফি ক্যাবিনেটে যেমন মরচে পড়তে শুরু করেছিল, ঠিক একইভাবে কলকাতার ময়দানে লাল-হলুদ মশালটাও জ্বলছিল, কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্রফিটার আলো আর ছড়াতে পারছিল না। কত কোচ এলেন, কত গেলেন। এমিরেটসে ওয়েঙ্গারের বিদায়ের পর উনাই এমরি হয়ে মিকেল আরতেতার বিপ্লব যেমন সময় নিয়েছে, তেমনই ইস্টবেঙ্গলে ট্রফির খরা কাটাতে কত বিদেশি কোচ, কত ইনভেস্টর এল আর গেল। মাঝে তো একটা সময় লাল-হলুদ সমর্থকদের কাছে ‘লিগ জয়’ শব্দটাই একটা দূর আকাশের তারা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আই লিগ হাতছানি দিয়ে চলে গিয়েছে, আইএসএলে এসেও প্রথম কয়েকটা বছর কেটেছে ঘোর অমাবস্যায়।
অন্তিম সীমান্ত অতিক্রমের আগে ইস্টবেঙ্গলের 'হৃদয়' মিগুয়েল।
কিন্তু ফুটবল দেবতা বোধহয় স্ক্রিপ্টটা আড়ালে বসেই লিখছিলেন। বাইশ বছর পর বৃত্তটা সম্পূর্ণ হতে চলেছে। যদি সব কিছু ঠিকঠাক চলে।
লন্ডনে ক’দিন আগেই মিলেল আরতেতার আর্সেনাল সেই ট্রফি খরা কাটিয়েছে। বার্নলিকে হারিয়ে যখন এমিরেটস উৎসবে মাতল, তখন যেন কোথাও একটা ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল। নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা! ঠিক বাইশ বছর পরেই আর্সেনালের পথ অনুসরণ করে ইস্টবেঙ্গলও আজ দাঁড়িয়ে আছে সেই পরম আরাধ্য লিগের ট্রফিটার সামনে। ব্যবধান ঘুচে যাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ।
আর্সেনালের আরতেতা যদি হন ট্যাকটিক্যাল মাস্টারমাইন্ড, তবে লাল-হলুদের ডাগআউটের জাদুকর অস্কার ব্রুজোও কম যান না। দলটাকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে, ভাঙা একটা মানসিকতাকে জোড়া লাগিয়ে আজ চ্যাম্পিয়নের সিংহাসনের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছেন তিনি। আর্সেনালের যেমন বুকায়ো সাকা বা মার্টিন ওডেগার্ডরা মাঝমাঠ আর উইংয়ে আগুন ঝরিয়েছেন, ইস্টবেঙ্গলের ইউসেফ, আনোয়ার, প্রভসুখান গিলরাও তেমনই মাঠে রক্ত জল করছেন সেই হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনতে।
মিলটা আরও এক জায়গায়। আর্সেনাল যখন বার্নলিকে হারিয়ে ট্রফি নিশ্চিত করছিল, গ্যালারিতে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ সমর্থককে কাঁদতে দেখা গেছে, যিনি ২০০৪ সালের পর আর লিগ জয়ের আনন্দ পাননি। নিশ্চিতভাবে বৃহস্পতিবারের কিশোরভারতীর গ্যালারিতে বা ময়দানের ক্লাবের গ্যালারিতে চোখ রাখলে হুবহু একই দৃশ্য দেখা যাবে। যে সমর্থকটি ২০০৪ সালে কুড়ি বছরের তরুণ ছিলেন, আজ তিনি মধ্যবয়সি, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু আবেগের তীব্রতা কমেনি এক ফোঁটাও।
লন্ডন আর কলকাতার দূরত্ব কয়েক হাজার মাইলের হতে পারে, কিন্তু বাইশ বছরের কান্নার ভাষাটা এক। বুক ভাঙা যন্ত্রণার পর ট্রফি ছুঁয়ে দেখার আকুলতাটাও এক। আর্সেনাল পেরেছে। এমিরেটসের লাল-সাদা রঙে বসন্ত এসেছে। এবার যুবভারতীর আকাশে লাল-হলুদ আবির ওড়ার পালা। ফুটবল রূপকথা বোধহয় একেই বলে - দু'টি ভিন্ন মহাদেশ, দু'টি ভিন্ন লিগ, কিন্তু বাইশ বছরের অভিশাপ মুক্তির গল্পটা হুবহু এক তুলির টানে আঁকা।
কিন্তু তীরে এসে তরী ডোবার উদাহরণও তো প্রচুর রয়েছে বিশ্বফুটবলে। ২০০১-০২-এ শেষ ম্যাচে লাজিওকে হারালেই সিরি আ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত ইন্টার মিলান। ম্যাচটা হেরে যায় ২-৪ গোলে। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় জুভেন্টাস। মাত্র ১০ বছর আগের কথা। শেষ ম্যাচে টটেনহ্যাম যদি চেলসিকে হারিয়ে দিত, তাহলে লিগ পকেটে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল দাঁড়ায় ২-২। লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় লেস্টার সিটি। হয়তো এসব কারণের জন্যই এদিন প্র্যাকটিসের পর ইমামি কর্তারা যখন ফুটবলারদের নিয়ে মিটিং করে কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে চাইছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ম্যানেজমেন্টকে আটকান অস্কার ব্রুজো। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আগে ইস্টবেঙ্গল আইএসএল ট্রফি নিশ্চিত করবে। তারপর যা কিছু ঘোষণা, পরিকল্পনা। তার আগে ইন্টার কাশী ম্যাচের প্রতি শুধুই ফোকাস, ফোকাস আর ফোকাস।
মোহনবাগান অনুশীলনে দিমিত্রি, ম্যাকলারেন, কামিংস। নিজস্ব চিত্র।
সবচেয়ে ফ্যাসাদে পড়েছেন ফেডারেশন কর্তারা। প্রথমে ভেবেছিলেন, ২২ মে চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে আইএসএল ট্রফি তুলে দেবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সায়েন্স সিটি অঞ্চলে রাখা হবে আইএসএল ট্রফি। যুবভারতীতে যদি মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে সায়েন্স সিটি থেকে ট্রফির গন্তব্য হয়ে যুবভারতীর ক্রীড়াঙ্গন। আর কিশোরভারতীতে যদি ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে সায়েন্স সিটি থেকে ট্রফি যাবে কিশোরভারতীর দিকে। আর ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দু'টো দলই যদি আইএসএল ট্রফি পেতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরের দিন ট্রফি চলে যাবে মুম্বই কিংবা পাঞ্জাবে।
হয়তো আন্ডারডগ। তাই একটু চুপ চাপ। কিন্তু তবুও পাশাপাশি প্র্যাকটিসে এদিনও ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানের অনুশীলেন সমর্থক সংখ্যা বেশি। হালকা হলেও মোহনবাগানের পক্ষে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দু'টো সম্ভাবনা তো আছেই। ইস্টবেঙ্গল পয়েন্ট হারাল। আর জিতে গেল মোহনবাগান। অথবা, ইস্টবেঙ্গলও জিতল। কিন্তু মোহনবাগান জিতল তার থেকেও ৬ গোল বেশিতে। ফলে হালকা হলেও মোহনবাগান নামক একটা কাঁটা কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের গলায় বেঁধে আছে। ফলে অ্যাডভান্টেজ ইস্টবেঙ্গল হলে হবে কী, মোহনবাগানও কিন্তু ফের আইএসএল ট্রফি ঘরে তোলার জন্য সবরকম ভাবে প্রস্তুত। বলা তো যায় না, এই মোহনবাগানই হয়তো সিরি আ-র জুভেন্টাস হয়ে গেল। অথবা ১০ বছর আগের ইপিএলের লেস্টার সিটি!
