shono
Advertisement
East Bengal

চ্যাম্পিয়ন টি-শার্টে কোচের বারণ, ইতিহাস ছোঁয়ার আগে মনস্তাত্ত্বিক খেলায় অস্কার

লড়াইটা মাঠের এগারো বনাম এগারোর ঠিকই, কিন্তু ডাগআউটের চাণক্য ইতিমধ্যেই নিজের ঘুঁটি সাজিয়ে ফেলেছেন।
Published By: Biswadip DeyPosted: 10:24 AM May 21, 2026Updated: 11:42 AM May 21, 2026

বাইশ বছর! সংখ্যাটা মুখে বলা যতখানি সহজ, গত দুটো দশক ধরে একটা ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের সমর্থকদের বুকে বয়ে বেড়ানোটা ঠিক ততটাই যন্ত্রণার। ২০০৪ সালের সেই সোনালি বিকেলের পর থেকে কত জল গড়িয়েছে গঙ্গায়, কত কোচ এলেন আর গেলেন (সংখ্যাটা নাকি এবার আঠাশ ছুঁয়েছে!), কিন্তু দেশের সেরা লিগের অধরা ট্রফিটা আর ময়দানের তাঁবুতে ফেরেনি।
আগামীকাল সেই অভিশপ্ত বৃত্তটা সম্পূর্ণ করার দিন। ইন্টার কাশির বিরুদ্ধে স্রেফ ৯০ মিনিটের একটা ম্যাচ। জিতলেই কেল্লাফতে, চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় উঠবে ইস্টবেঙ্গলের।

Advertisement

কিন্তু ম্যাচের আগের দিন প্রেস কনফারেন্সে এসে লাল-হলুদ হেড স্যার অস্কার ব্রুজো যা করলেন, তাকে স্রেফ ফুটবলীয় আলোচনা বললে ভুল হবে। ওটা ছিল আপাদমস্তক একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ‘সাইকোলজিক্যাল গেম’। ময়দানের চেনা হাওয়া বলে, ট্রফি ঘরের দোরগোড়ায় এলে কর্তাদের মধ্যে একটা আগাম উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়ে যায়। চ্যাম্পিয়ন টি-শার্ট তৈরি রাখা, শ্যাম্পেনের বোতল অর্ডার দেওয়া— এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু অস্কার ব্রুজো আজ সাফ জানিয়ে দিলেন, কর্তারা মাঠে এসে এই নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি স্রেফ ‘না’ করে দিয়েছেন। কোচের ভাষায়, “আমি যদি আজ থেকেই ট্রফি উদযাপন আর কে কাপটা হাতে তুলে দেবে তা নিয়ে ভাবতে শুরু করি, তবে আমি একজন লুজার।”

ইন্টার কাশির বিরুদ্ধে স্রেফ ৯০ মিনিটের একটা ম্যাচ। জিতলেই কেল্লাফতে, চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় উঠবে ইস্টবেঙ্গলের। কিন্তু ম্যাচের আগের দিন প্রেস কনফারেন্সে এসে লাল-হলুদ হেড স্যার অস্কার ব্রুজো যা করলেন, তাকে স্রেফ ফুটবলীয় আলোচনা বললে ভুল হবে। ওটা ছিল আপাদমস্তক একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা।

একেবারে খাঁটি পেশাদারের মতো কথা। একেই বলে ফোকাস। ডুরান্ড আর সুপার কাপের ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া স্প্যানিশ কোচ খুব ভালো করেই জানেন, ফুটবলে ‘ওভার-কনফিডেন্স’ বা অতি-আত্মবিশ্বাস কতটা মারাত্মক ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে ইন্টার কাশির মতো দল, যাদের হারানোর কিছু নেই এবং যারা দিনকয়েক আগেই মোহনবাগানকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছিল।

কোচের পাশেই বসেছিলেন ইউসেফ। মরশুমের একেবারে শেষলগ্নে এসে এই বিদেশি যেন বরফ-শীতল এক ভরসা। সাংবাদিকরা যখন তাকে আবেগের চাপ নিয়ে প্রশ্ন করছেন, ইউসেফের সটান জবাব—“আমরা পেশাদার। আবেগ থাকবেই, কিন্তু মাঠে আমাদের ১০০ শতাংশ উজাড় করে ৩ পয়েন্ট তুলে নেওয়াই আসল লক্ষ্য।”

তবে প্রেস মিটের আসল দ্রষ্টব্য ছিল অস্কারের কিছু অকপট স্বীকারোক্তি। মরশুমের শুরুতে দল যখন লিগ টেবিলের তলানিতে ধুঁকছিল, তখন সমর্থকদের ট্রফির স্বপ্ন দেখাটা কোচের কাছেও অবাস্তব মনে হয়েছিল। অস্কার নিজেই হাসতে হাসতে বললেন, "আমি ভাবতাম, লিগ টেবিলের নীচের একটা দল নিয়ে হঠাৎ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা কী করে বলে এরা? কিন্তু ইস্টবেঙ্গলে এসে বুঝলাম, এখানে ওইসব অজুহাতে পার পাওয়া যাবে না। ফলে শুরুতে প্রথম ন’টি দলের মধ্যে থাকার লক্ষ্য স্থির করলাম। তারপর এতদিনের অপেক্ষায় থাকা প্রথম ছ’য়ে। শেষে এসে প্রথম চারে। আমার মনে হয়, ইস্টবেঙ্গলের প্রথম চারে থাকাটা যথেষ্ট ভালো ফল।
আর ঠিক এখানেই অস্কার নিজেকে ময়দানের সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, এই ক্লাবটা কর্পোরেট কাঠামোর চেনা ছকে চলে না। এটা বাবা থেকে ছেলে, আর ছেলে থেকে নাতিতে বয়ে চলা এক আদিম ফুটবলীয় আবেগ। সুভাষ ভৌমিক এবং মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য—ইস্টবেঙ্গলের জাতীয় লিগ জয়ের ইতিহাসের পাশে এখনও পর্যন্ত এই দুটো নামই জ্বলজ্বল করছে। অস্কারের সামনে সুযোগ আঠাশ নম্বর কোচ হিসেবে এসে সেই তালিকার ‘তৃতীয়’ নাম হওয়ার। মালদ্বীপ ও বাংলাদেশে লিগ জেতার পর এবার ভারতের মাটিতে ইতিহাস ছোঁয়ার অপেক্ষায় তিনি।

কোচ অবশ্য তাস লুকোচ্ছেন। ইন্টার কাশি আল্ট্রা-ডিফেন্সিভ খেলবে নাকি অল-আউট আক্রমণে যাবে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে রেখেছেন বুকপকেটে। ‘‘ওরা যে স্ট্র্যাটেজিতেই খেলুক, আমরা নিজেদের মতো করে তৈরি। তবে মনে হয়, হারানোর কিছু নেই বলে ওদের নতুন কোচ, শেষ ম্যাচটা জিতে মরশুম শেষ করতে চাইবে।” আর আজ রাতের ঘুম? অস্কার বুক ঠুকে বলে গেলেন, “আমি আজ রাতে চমৎকার ঘুমোব। কারণ আমাদের চোখে একটা স্বপ্ন আছে।”

লড়াইটা মাঠের এগারো বনাম এগারোর ঠিকই, কিন্তু ডাগআউটের চাণক্য ইতিমধ্যেই নিজের ঘুঁটি সাজিয়ে ফেলেছেন। এখন দেখার, বাইশ বছরের সেই দীর্ঘশ্বাস বৃহস্পতিবার কিশোরভারতীর গ্যালারিতে উৎসবের সুনামি হয়ে আছড়ে পড়ে কি না। ময়দান কিন্তু চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। অস্কার তো তাঁর দলবল নিয়ে তৈরি। কিন্তু বৃহস্পতিবার ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় সমস্যা পড়তে হচ্ছে কর্তাদের। ৯ হাজারি স্টেডিয়ামে টিকিট কোথায়? তবুও যত পারছে টিকিট কেনার চেষ্টা করছেন লাল-হলুদ কর্তারা। অন্তত সদস্যদের যেন মাঠে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা যায়। বাকিদের জন্য ক্লাব মাঠে বড় স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement