আমেরিকায় বসেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের আসর। যে মহাযজ্ঞের আঁচ ভারতীয় ফুটবলের মক্কা কলকাতাতেও। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে রাত জেগে গলা ফাটাচ্ছেন টলিপাড়ার তারকারাও। তার মাঝেই ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা জানালেন সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে। আজ কলম ধরলেন তথাগত মুখোপাধ্যায়।
ছোটবেলায় বিশ্বকাপ দেখা মানে একসঙ্গে জ্যেঠুর ঘরে বসে খেলা দেখা। আমি ছোট থেকে যৌথ পরিবারেই মানুষ। তাই সবাই একসঙ্গে খেলার আনন্দ উপভোগ করতাম। কেউ ব্রাজিলের তো কেউ আবার আর্জেন্টিনার সমর্থক। কেউ আবার পতুগার্লের জন্য গলা ফাটাত। যে দল হেরে যেত সেদিন সেই দলের সমর্থকদের নিয়ে আমরা হাসি ঠাট্টা করতাম। আর বিজয়ী দলের সমর্থকরা একেবারে আনন্দে মেতে উঠত। ছোটবেলায় ফুটবল খুব একটা বুঝতাম না কিন্তু, সকলের সঙ্গে আনন্দে শামিল হতাম। ওইদিনগুলো সত্যিই দারুণ ছিল। তখন অবশ্য ভারতীয় সময় অনুযায়ী মধ্যরাতে ম্যাচ হত না। বিকেল-সন্ধ্যাতেই বেশিরভাগ ম্যাচ হত। রাতের দিকেও থাকত, তবে খুব কম। যখন বড় হয়েছি তখন নিজের মতো করে বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ করেছি। এখন আর ছোটবেলার দিনগুলোর মতো একসঙ্গে খেলা দেখা হয় না। কাজের ব্যস্ততার জন্য এবার খেলা দেখাটাও একটু কম হচ্ছে।
তবে আলমবাজারে, মানে যেখানে আমার যৌথ পরিবার ছিল, সেখানে মারাদোনাকে নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছিল। সেই মারোদনার জন্যই হয়তো আজ আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। এই দলের নাম, বিশেষ করে মারাদোনা মনের ভিতর এমনভাবে গেঁথে গিয়েছে যেন মনে হয় আর্জেন্টিনা নিজেদের দল। এখন তো জনপ্রিয়তার নিরিখে ব্রাজিলের থেকেও আর্জেন্টিনা এগিয়ে। মেসির দশ নম্বর জার্সিটা একটা আবেগ। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আগের ম্যাচে রেফারি একটু টেনে খেলিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। সেই ম্যাচের হাইলাইটস দেখেছি। রাত জাগা সত্যিই হচ্ছে না। কারণ পরদিন শুটিং থাকছে। তবে আমার পরিচিতদের দেখছি ওরা রাত জেগে খেলা দেখে আবার সকালে কাজে যাচ্ছে। ফুটবলের প্রতি ওদের প্যাশন নিঃসন্দেহে আমার থেকে অনেক বেশি। ছোটবেলায় ব্রাজিলের হলুদ জার্সিটার প্রতি একটা অমোঘ আকর্ষণ ছিল। আসলে ওই উজ্জ্বল হলুদ রংটার জন্য।
মেসি-মারাদোনা
তবে একটা মনখারাপের জায়গা, বিশ্বকাপে কোনও টিমের নামই ভারতবর্ষ নয়। জানি না কবে ভারতীয় ফুটবলকে এই জায়গায় দেখব। এটা তো ভারতীয় ফুটবলারদের দোষ নয়। পরিকাঠামোগত দিক, অনুপ্রেরণা জোগানের মতো আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অথচ একটা সময় খালি পায়ে ভারতবর্ষের খেলোয়াড়রাই অলিম্পিকে ফুটবল খেলেছেন! সেই ভারতীয় দলকে কবে লিস্টে দেখতে পাব! আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, ব্রাজিলের জন্য নয়, নিজেদের দেশের জন্য গলা ফাটাতে পারব! এই বিষয়টা আমাকে খুব ভাবায়। নিজের দেশের জন্য চিৎকার করতে চাই, ঘটনাচক্রে যে দেশ আমার জন্মভূমি। সেদিন হয়তো সত্যিই রাত জাগব। সারা রাত জেগে খেলা দেখে পরদিন সকালে আবার নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দেব। যেদিন ভারতবর্ষ বিশ্বকাপ খেলবে সেদিন রাত তিনটের সময়ও সম্পূর্ণ এনার্জি নিয়ে খেলা দেখব। এখন রাত না জাগার এটাও অন্যতম একটা কারণ, নিজের দেশটাই তো নেই। সেটার জন্যই হয়তো বিশ্বকাপের সঙ্গে একটা অদৃশ্য দূরত্ব আছে।
তথাগত মুখোপাধ্যায়
কিন্তু, ফুলবলের প্রতি ভালোবাসা নেই এমনটা নয়। নব্বই মিনিটের টানটান উত্তেজনা। ছোট দলগুলো যে বড়মাপের দলগুলোকে হারিয়ে দিচ্ছে, এটা সত্যিই দারুণ। যে কোনও মঞ্চেই তুলনামূলক দুর্বলরা যখন শক্তিরূপেন হয়ে উঠে আসে তখন প্রত্যেকে খুশি হয়। আমার বিশ্বাস এরকম পরিস্থিতিতে যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন তাঁদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। আর যাঁরা ক্ষমতায় নেই তাঁদের মনের জোর আরও বেড়ে যায়। শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দিচ্ছে দেখে তারাও নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস পায়। আগামী দিনে চ্যাম্পিয়ন কোনও দলকে হারানোর অনুপ্রেরণা পাবে। আমি মনেপ্রাণে চাই এভাবেই কম শক্তিশালী দলগুলোর উত্থান হোক। আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়েও বলছি, চলতি মরশুমে বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) যেন তুলনামূলক কম শক্তিশালী দলই চ্যাম্পিয়ন হয়। এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যেন সেই জয় দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারে। নিজেদের জীবন, কর্মক্ষেত্রেও বাঁচার একটা নতুন দিশা খুঁজে পান।
