তিনি মোহনবাগান রত্ন, ক্লাবের প্রাক্তন সচিব, সবুজ-মেরুনের দীর্ঘকালীন সভাপতি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই পার্থিব পদ বা খেতাবের গণ্ডিতে হয়তো তাঁকে বেঁধে রাখা যায় না। টুটু বোস স্রেফ মোহনবাগান ক্লাবের সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রশাসক নন, টুটু বোস ময়দানের সেই মহীরুহ যাকে কেন্দ্র করে মোহনবাগান ক্লাবের ডালপালা মেলা, যাকে কেন্দ্র করে বহু সবুজ-মেরুন সমর্থকদের স্বপ্ন দেখা, যাকে কেন্দ্র করে কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রশিক্ষা।
ফাইল ছবি।
মোহনবাগানের জন্য টুটুবাবুর অবদান হয়তো নতুন করে বলার কিছু নেই। ১৯৯১ থেকে প্রায় ৩ দশক প্রত্যক্ষভাবে মোহনবাগান ক্লাব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ৩ দশকে বহু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছেন। ময়দানের উপর দিয়ে, মোহনবাগান ক্লাবের উপর দিয়ে বহু ঝড় বয়ে গিয়েছে। প্রশাসক হিসাবে শুধু সেসব চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়াই নয়, মোহনবাগানকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে একের পর এক যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে গিয়েছেন। ধীরেন দে-র মতো প্রবাদপ্রতিম প্রশাসকের জুতোয় পা গলানো মোটেই সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু টুটুবাবু নিজেই এত সহজ সরল মানুষ ছিলেন, যে কোনও কাজই তাঁর কাছে কঠিন বলে মনে হয়নি কোনওদিন।
দুঃসময়ে যেমন তিনি এবং বন্ধু অঞ্জন মিত্র- কুম্ভ হয়ে মোহনবাগানের গড় রক্ষা করেছেন, তেমনই সুসময়ে ক্লাবের ভবিষ্যতের ভিত গড়েছেন। ক্লাবের বিপদে নিজের অর্থ ঢেলে দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। জরিমানার কোটি টাকা দিয়েছেন নিজের ঘর থেকে। যখনই মোহনবাগান আর্থিক সমস্যায় ভুগেছে, তখনই ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে এসেছেন টুটু বোস। দীর্ঘদিন স্পনসরহীন ক্লাবকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করেছেন। রসিকতা করে নিজেই বলতেন, "আমারও 'ম' দোষ আছে। সেই 'ম'-এ মোহনবাগান।" আবার যখন সময় এসেছে পদ আঁকড়ে বসে না থেকে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে সবুজ-মেরুন পতাকাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন।
ফাইল ছবি।
স্রোতের বিপরীতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে কখনও পিছপা হননি টুটুবাবু। তা সে যতই সমালোচনা হোক, যখন বিদেশি ফুটবলার আনার সিদ্ধান্ত অনেকেই বিরোধিতা করেছিলেন, তখন তিনি ভবিষ্যৎ পড়ে ফেলেছিলেন। মোহনবাগানের প্রথা ভেঙে বিদেশি চিমা ওকেরিকে বাগানে আনা, কৃশানু-বিকাশকে সই করানো, ইস্টবেঙ্গলের ঘরের ছেলে মনোরঞ্জনকে সবুজ-মেরুনে খেলানো, এসবই তিনি করেছেন ক্লাবের ভবিষ্যৎ ভেবে। পরবর্তীকালে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমাদৃত ও প্রশংসিত। যখন কর্পোরেট অংশীদারিত্ব নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল, তখনও তিনি ছিলেন সময়ের আগে। আজ মোহনবাগান ভারতসেরা। সেটার শিকড়ও টুটুবাবুর সময়ই গ্রথিত। আসলে তিনি পদ বা ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকেননি কখনও। ক্লাবের ভালোর জন্য অনায়াসে রাজপাট তুলে দিয়েছেন কর্পোরেটের হাতে। এসবের অনেক আগে মোহনবাগানের নির্বাচনে স্বচ্ছ্বতা আনার জন্য তিনি যে লড়াইটা করেছেন, সেটা আজও মনে রেখেছে মানুষ।
ফাইল ছবি।
আসলে টুটু বোসের কাছে মোহনবাগান শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, মোহনবাগান শুধু ক্লাব নয়। সেটাই ছিল প্রথম প্রেম। সেই ছোট্টবেলায় বন্ধু অঞ্জনকে সঙ্গে নিয়ে ময়দানে যাতায়াত শুরু। সেখান থেকে আমৃত্যু তিনি শুধু সবুজ-মেরুনের। দিলখোলা মানুষ টুটু বোস আজন্ম গোটা ময়দানকে মাতিয়ে রেখেছেন। প্রতিপক্ষের 'বক্স' থেকে ঢু মেরে ফুটবলার ছিনিয়ে নেওয়া হোক, কিম্বা লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তাঁর ছোটখাট টিপ্পনি। কখনও যে বেফাঁস কিছু বলেননি তা নয়, কিন্তু টুটুবাবুর কোনও কথায় কেউ কখনও আঘাত পাননি। আসলে মানুষটা বরাবরই সমালোচনার ঊর্ধ্বে। সবার জন্য অবারিত দ্বার। ইস্ট-মোহন নির্বিশেষে 'টুটুদা' বরাবরই সমর্থকদের খুব কাছের। কেউ কেউ বলেন, যে গুটিকয়েক প্রশাসক ময়দান থেকে কিছু নিতে নয়, বরং ময়দানকে নিজের সবটা উজাড় করে দিতে এসেছিলেন, টুটুবাবু তাঁদের সকলের মধ্যে অগ্রগণ্য। যে মোহনজনতার জন্য আপনার জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মোহনজনতা আপনাকে মিস করবে 'টুটুদা'।
