মদ্যপানে শারীরিক ক্ষতির কথা উঠলে প্রথমেই মনে আসে লিভার সিরোসিস বা হৃদ্রোগের আশঙ্কা। কিন্তু চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, অ্যালকোহলের ক্ষতিকর প্রভাব লিভারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরাসরি পৌঁছে যায় মস্তিষ্কেও। নিয়মিত বা অতিরিক্ত মদ্যপান ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, বিচারবোধ, ঘুমের মান এবং শেখার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। প্রথম দিকে এই পরিবর্তনগুলি খুব একটা বোঝা না গেলেও, সময়ের সঙ্গে তা দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা এবং মানসিক দক্ষতার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
অ্যালকোহল মস্তিষ্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে। ফলে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
স্মৃতিশক্তির উপর প্রথম আঘাত
অ্যালকোহল সবচেয়ে আগে প্রভাব ফেলে হিপোক্যাম্পাসে, যা নতুন স্মৃতি তৈরি এবং শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে স্বল্পসময়ের কোনও স্মৃতিকে দীর্ঘদিনের স্মৃতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এর ফলেই অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন ব্যক্তি সচেতন অবস্থায় কথা বলেন, চলাফেরা করেন বা নানা কাজ করেন, কিন্তু পরে সেই সময়ের কোনও স্মৃতিই আর মনে থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় অ্যালকোহল-ইনডিউসড ব্ল্যাকআউট।
শারীরিক ক্ষতির অন্ত নেই। ছবি: সংগৃহীত
কমে মনোযোগ, দুর্বল হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা
অ্যালকোহল মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই অংশটি মনোযোগ, পরিকল্পনা, যুক্তিবোধ, বিচারক্ষমতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত।
ফলে নিয়মিত মদ্যপানের কারণে কথোপকথন অনুসরণ করা, মানুষের নাম মনে রাখা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সাধারণ সমস্যার সমাধান করতেও সময় বেশি লাগতে পারে। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ঘুম হয়, কিন্তু বিশ্রাম হয় না
অনেকেই মনে করেন, মদ খেলে দ্রুত ঘুম আসে। এই ধারণার কিছুটা সত্যতা থাকলেও পুরো ছবিটা ভিন্ন। অ্যালকোহল ঘুমের গভীর স্তর এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা রেম স্লিপে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ এই পর্যায়েই মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ করে এবং নিজেকে পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করে।
ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, ধীর চিন্তাশক্তি এবং শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন বি১-এর ঘাটতি বাড়ায় বিপদ
বারবার অতিরিক্ত মদ্যপান শরীরে ভিটামিন বি১ (থায়ামিন)-এর ঘাটতি তৈরি করতে পারে। এই ভিটামিন মস্তিষ্কের কোষ সুস্থ রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
থায়ামিনের ঘাটতির কারণে ওয়ার্নিক এনসেফালোপ্যাথি এবং করসাকফ সিনড্রোমের মতো গুরুতর স্নায়বিক রোগ হতে পারে। এসব রোগে স্থায়ী স্মৃতিভ্রংশ, বিভ্রান্তি এবং মানসিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সুস্থ থাকতে এড়িয়ে চলাই ভালো। ছবি: সংগৃহীত
সবার ঝুঁকি সমান নয়
অ্যালকোহলের প্রভাব প্রত্যেকের শরীরে একরকম হয় না। বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য, আগে থেকে থাকা রোগ, খাদ্যাভ্যাস এবং কতদিন ও কতটা মদ্যপান করা হচ্ছে, তার উপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে। তবে নিয়মিত ও অতিরিক্ত মদ্যপান দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ক্ষতির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
কীভাবে কমাবেন ঝুঁকি?
ভুলে যাওয়া, মনোযোগে ঘাটতি, চিন্তাভাবনার গতি কমে যাওয়া বা সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে সেটিকে শুধু বয়সের প্রভাব বা অতিরিক্ত কাজের চাপ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এর নেপথ্য কারণ হতে পারে মদ্যপান।
মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে মদ্যপান থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন, পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম নিশ্চিত করা, সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে ভিটামিন বি১-সহ অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। সময়মতো সচেতন হলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের ক্ষতি এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
