হাসপাতাল থেকে ছুটি মিলেছে, অস্ত্রোপচারও সফল। অনেকের ধারণা, এখানেই চিকিৎসার ইতি। কিন্তু বাস্তবটা অনেকটাই ভিন্ন। অপারেশনের পর বাড়ি ফেরার পরই শুরু হয় শরীর ও মনের আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। ব্যথা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার দীর্ঘ পথ পেরিয়েই আসে প্রকৃত সুস্থতা।
সম্প্রতি নিজের ব্লগে হাসপাতাল, অস্ত্রোপচার এবং আইসিইউতে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন অমিতাভ বচ্চন। তবে কী ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি। তবে তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে অস্ত্রোপচারের পরের সেই বাস্তবতা, যা অসংখ্য রোগী নীরবে অনুভব করেন।
চিকিৎসকরাও তাঁর সঙ্গে একমত। তাঁদের মতে, অপারেশনের পর শরীর যেমন সময় নিয়ে সেরে ওঠে, তেমনই মানসিক সুস্থতাও এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চলুন জেনে নেওয়া যাক অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সময় একজন রোগীর কেমন কাটে?
ভালো থাকুন। ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্রোপচারের পর কেন এত ক্লান্ত লাগে?
অস্ত্রোপচারের পর শরীরের সমস্ত শক্তি ক্ষতস্থান সারিয়ে তোলার কাজে ব্যয় হয়। প্রদাহ কমানো, নতুন কোষ তৈরি এবং শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ায় রোগীরা প্রায়ই অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করেন। অনেকের খিদে কমে যায়, রাতে ভালো ঘুম হয় না, আবার কেউ কেউ হাঁটাচলাতেও অস্বস্তি বা দুর্বলতা অনুভব করেন। বয়স, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং আগে থেকে থাকা অসুস্থতার উপর নির্ভর করে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সুস্থতার সময়, যা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
শরীরের ক্ষতের পাশাপাশি তৈরি হয় মনের ক্ষতও
দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা বা আইসিইউ-তে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা অনেকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। সুস্থ হওয়ার আনন্দের পাশাপাশি থেকে যায় নানা উদ্বেগ। আবার যদি কোনও জটিলতা হয়, সেই ভয়ও অনেককে তাড়া করে। কেউ কেউ নিজেকে আগের মতো স্বাভাবিক মনে করতে পারেন না, অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার অনুভূতিও মানসিকভাবে সমস্যা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পোস্ট-ইনটেনসিভ কেয়ার সিনড্রোম (পিআইসিএস) দেখা দিতে পারে। এর ফলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
বাড়ি ফেরার পরও দরকার বাড়তি যত্ন। ছবি: সংগৃহীত
সুস্থ হয়ে ওঠার পথ কী?
চিকিৎসকদের মতে, অপারেশনের পর তাড়াহুড়ো করে আগের জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের কাছে ফলো-আপে যাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর যতটা অনুমতি দেয়, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ধীরে ধীরে হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়াম শুরু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মানসিক সমর্থনও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
তবে যদি টানা জ্বর, ক্ষতস্থানে লালচে ভাব বা ফোলা বেড়ে যাওয়া, পুঁজ বের হওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত বা অসহনীয় ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মন ভালো থাকাও চিকিৎসারই অংশ
চিকিৎসকদের মতে, অস্ত্রোপচারের পর শুধু শরীরের ক্ষত শুকিয়ে গেলেই সুস্থতা সম্পূর্ণ হয় না। মানসিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠাও সমান প্রয়োজন। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, গান শোনা বা ধীরে ধীরে পছন্দের কাজে ফিরে যাওয়া রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। আর যদি দীর্ঘদিন উদ্বেগ বা অবসাদ থেকে যায়, তাহলে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
অমিতাভ বচ্চনের অভিজ্ঞতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, অস্ত্রোপচার একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং সুস্থ হয়ে ওঠার নতুন অধ্যায়ের শুরু। সেই পথ সহজ করতে প্রয়োজন সময়, ধৈর্য, সঠিক চিকিৎসা এবং পরিবার-পরিজনের আন্তরিক পাশে থাকা।
