বয়স বাড়া জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু একই বয়সের দু'জন মানুষের শরীর কি একই গতিতে বুড়িয়ে যায়? বিজ্ঞান বলছে, সবসময় নয়। খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ঘুমের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় বার্ধক্যের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আর সেটি হল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে থাকা বা নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা ঘুরে দেখা, সিনেমা দেখা বা কনসার্ট উপভোগ করার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশ নিলে শরীরের জৈবিক বার্ধক্য (Slower Ageing) তুলনামূলক ধীরে এগোতে পারে। অর্থাৎ, বয়স বাড়লেও শরীর দীর্ঘদিন তরুণের মতো কর্মক্ষম থাকতে পারে।
গবেষণাটি করেছেন ব্রিটেনের 'ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন' (ইউসিএল)-এর গবেষকেরা। তাঁদের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে 'অ্যানালস অফ দ্যা নিউ ইয়র্ক অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস'-এ।
উচ্ছ্বাস। ছবি: সংগৃহীত
বয়স শুধু সংখ্যায় নয়, শরীরেও ধরা পড়ে
আমরা সাধারণত জন্মতারিখ অনুযায়ী বয়স হিসাব করি। একে বলা হয় ক্রোনোলজিক্যাল এজ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে, সেটি হল ফিজিওলজিক্যাল এজ বা শরীরের কর্মক্ষমতার বয়স।
এই বয়স নির্ভর করে হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, বিপাকক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা-সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কতটা ভালোভাবে কাজ করছে তার উপর। অনেকের বয়স ৬৫ হলেও শরীর ৬০ বছরের মানুষের মতো সুস্থ থাকতে পারে। আবার কারও বয়স ৫৫ হলেও শরীরের অবস্থা হতে পারে আরও বেশি বয়সি মানুষের মতো।
কীভাবে হয়েছিল এই গবেষণা?
গবেষকেরা ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সি ৪,৪৬৭ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা ইংলিশ লংজিটিউডিনাল স্টাডি অব এজিং-এর অংশ ছিলেন। প্রায় ১০ বছর ধরে তাঁদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এই সময়ে অংশগ্রহণকারীরা কত ঘন ঘন মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালায় গিয়েছেন, সিনেমা দেখেছেন বা কনসার্ট বা নাটকের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, তার সঙ্গে তাঁদের ফিজিওলজিক্যাল এজের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, যারা অন্তত প্রতি কয়েক মাসে একবার এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের শরীরের কার্যক্ষমতার বয়স গড়ে ২.২ বছর কম ছিল, তুলনায় যাঁরা কখনও বা খুব কম অংশ নিয়েছেন।
সংগ্রহশালায়। ছবি: সংগৃহীত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিক্ষা, আয়, ধূমপান, শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগের মতো বিষয়গুলির প্রভাব বাদ দিয়েও এই সম্পর্ক বজায় ছিল। চার বছর এবং আট বছর পরের ফলো-আপেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
কেন উপকারী?
গবেষকদের মতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হল এগুলো একই সঙ্গে শরীর ও মনের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটি সংগ্রহশালা ঘুরে দেখতে হাঁটতে হয়, নতুন কিছু জানতে হয়, মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। কনসার্টে গেলে বহু মানুষের সঙ্গে মেলামেশা হয়, আনন্দ পাওয়া যায় এবং মানসিক চাপ কমে। এসব অভিজ্ঞতা একাকীত্ব কমাতে, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক মানসিক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, লাইভ কনসার্ট বা নাটকে অংশ নেওয়ার সঙ্গে ধীর জৈবিক বার্ধক্যের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে সিনেমা দেখা এবং সংগ্রহশালা যাওয়া। পাশাপাশি, যত বেশি নিয়মিত মানুষ এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তত কম দেখা গেছে তাঁদের ফিজিওলজিক্যাল এজ।
পর্যবেক্ষণ। ছবি: সংগৃহীত
সুস্থ জীবনের পরিপূরক, বিকল্প নয়
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই গবেষণা কেবল একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে। অর্থাৎ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই যে সরাসরি বয়স কমিয়ে দেয়, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আগে থেকেই সুস্থ মানুষদের এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে।
তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক হিসেবেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে দেখা উচিত। কারণ সুস্থ বার্ধক্য শুধু ওষুধ বা ব্যায়ামের উপর নির্ভর করে না, আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক মেলামেশাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
