৬৫ বছর বয়সে ফোর্থ স্টেজ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার। রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল লিভার, ওমেন্টাম, পেরিটোনিয়াম এবং কোলনেও। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় একসময় বিছানা থেকে ওঠার শক্তিটুকুও হারিয়েছিলেন শ্যামলকুমার সরকার। কিন্তু হাল ছাড়েননি বাংলা ও পূর্বাঞ্চলের প্রাক্তন এই বাস্কেটবল খেলোয়াড়। খেলার মাঠে বছরের পর বছর লড়াই করে তৈরি করা মানসিক দৃঢ়তাকেই সম্বল করে শুরু করেছিলেন ক্যানসারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই। দীর্ঘ চিকিৎসার পর আজ তিনি আবার হাঁটছেন, দৈনন্দিন কাজ করছেন, এমনকী বাড়ির চারতলা পর্যন্ত সিঁড়িও ভাঙছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শ্যামলের ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হয়। ততদিনে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল লিভার, ওমেন্টাম, পেরিটোনিয়াম এবং কোলনেও। পাশাপাশি তাঁর ছিল ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েডের সমস্যা এবং কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা।
চিকিৎসার জন্য শুরু করা হয় ফলফিরিনক্স কেমোথেরাপি। অ্যাডভান্স স্টেজে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে ব্যবহৃত এই চিকিৎসা অনেক সময়ই সহ্য করা কঠিন। শ্যামলের ক্ষেত্রেও দেখা দেয় একের পর এক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তীব্র ডায়রিয়া, বমি এবং দুর্বলতায় ভেঙে পড়ছিল শরীর। ক্যানসারের কারণে পেটে জল জমে যাওয়ায় দু’বার তা বের করতে হয়। ৯ নম্বর কেমোথেরাপির পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরও বেড়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
সেই কঠিন সময়ের কথা মনে করে শ্যামল বলেন, 'একটা সময় আমি পুরোপুরি বিছানায় শুয়ে থাকতাম। পেট ফুলে গিয়েছিল, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। মনে হয়েছিল, সব শেষ। তখন আমার খেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ঠিক করি, আমি হাল ছাড়ব না।'
ডা. সায়নী ভঞ্জ। ছবি: নিজস্ব
কলকাতার এইচসিজি ক্যানসার সেন্টারের কনসালট্যান্ট মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা. সায়নী ভঞ্জ বলেন, অ্যাডভান্স স্টেজ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে ফলফিরিনক্সের মতো কেমোথেরাপি সহ্য করা যথেষ্ট কঠিন হতে পারে। শ্যামলের শারীরিক সক্ষমতা, নিয়মশৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তা চিকিৎসার এই কঠিন পর্ব সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা এবং সীমিত শরীরচর্চাও তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার পথে সহায়ক হয়েছে।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এসেছে স্বস্তির খবর। সাম্প্রতিক পেট-সিটি স্ক্যানে দেখা গিয়েছে, শ্যামলের রোগ এখন রেমিশনে রয়েছে। পেটে জল জমার সমস্যা মিটেছে, কমেছে পেটের ভারীভাবও। আপাতত মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে মেইনটেন্যান্স থেরাপি চলবে।
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন শ্যামল। এখন নিজে দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন, নিয়মিত হাঁটছেন। এমনকী বাড়িতে চারতলা সিঁড়িও উঠতে পারছেন। কিছুদিন আগেও যিনি শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতায় বিছানায় পড়ে ছিলেন, তাঁর এই ফিরে আসা চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তারও এক বড় উদাহরণ।
এইচসিজি ক্যানসার হসপিটালের রিজিওনাল বিজনেস হেড, ডা. রূপালি বসু বলেন, শ্যামলের যাত্রা দেখিয়ে দেয়, অত্যন্ত কঠিন চিকিৎসার মধ্যেও মানসিক দৃঢ়তা ও নিয়মশৃঙ্খলা একজন রোগীকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। তাঁর অভিজ্ঞতা নতুন করে আশার কথাও বলে।
ক্লিনিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব পরিষেবা ও ক্রীড়া এবং ভোক্তা বিষয়ক দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ডা. ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন, খেলাধুলো মানুষকে শৃঙ্খলা, দলগতভাবে লড়াই করার মানসিকতা এবং কঠিনতম মুহূর্তেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস শেখায়। ক্যানসারের চিকিৎসাতেও উপযুক্ত চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা ও ধারাবাহিক সহায়তা। ক্যানসার মানেই জীবন শেষ নয়। শ্যামলের সক্রিয় জীবনে ফিরে আসাই তার প্রমাণ।
