বয়স বাড়লে একটু-আধটু ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ভুলে যাওয়া যখন ক্রমশ দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে শুরু করে, পরিচিত কাজ কঠিন হয়ে যায়, এমনকী কাছের মানুষকেও চিনতে সমস্যা হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুই বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন নয়।
ভারতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়াও আগামী দিনে বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণার পূর্বাভাস, ২০৩৬ সালের মধ্যে ভারতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণের সংখ্যা ১ কোটি ৬৯ লক্ষে পৌঁছতে পারে।
ডিমেনশিয়া কোনও একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়। স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, ভাষা, বিচারবুদ্ধি এবং সমস্যা সমাধানের মতো মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষমতা কমে যাওয়ার একাধিক অবস্থাকে ডিমেনশিয়া বলা হয়। এই পরিবর্তন যখন দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তখন মানুষের স্বনির্ভরতা ও জীবনযাত্রার মানও ব্যাহত হয়।
শুধু ভুলে যাওয়া নয়। ছবি: সংগৃহীত
শুধু রোগ শনাক্ত করলেই শেষ নয়
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকদের গবেষণার উঠে এসেছে এমনই পূর্বাভাস। চিকিৎসকদের মতে, আগামী কয়েক দশকে ডিমেনশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু রোগটিকে চিহ্নিত করাই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাঁর পরিবারের প্রয়োজনের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
দ্রুত রোগ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডিমেনশিয়া ধরা পড়ার পরেই শুরু হয় দীর্ঘ পরিচর্যার পর্ব। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবারের সহায়তা, রোগীর নিরাপত্তা, দৈনন্দিন জীবন সামলানোর ব্যবস্থা এবং পরিচর্যাকারীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সাহায্য।
ডিমেনশিয়া ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রমণী সুন্দরমের কথায়, ভারতে ডিমেনশিয়া পরিচর্যা কেন্দ্রের সংখ্যা এখনও ৫০টিরও কম। ফলে চিকিৎসক, পরিচর্যাকারী, পরিবার, সমাজ এবং প্রশাসনকে একসঙ্গে নিয়ে আরও পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বার্ধ্যকের সমস্যা। ছবি: সংগৃহীত
ভুলে যাওয়া মানেই কি ডিমেনশিয়া?
ডিমেনশিয়ার শুরুর লক্ষণ অনেক সময়ই বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে মনে হয়। বারবার একই কথা জিজ্ঞাসা করা, সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, পরিচিত কাজ করতে সমস্যা হওয়া, আচরণে পরিবর্তন বা দৈনন্দিন কাজ সামলাতে অসুবিধা, এ ধরনের পরিবর্তন নিয়মিত হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকদের কথায়, ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ রয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত কিছু পরিবর্তনযোগ্য কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
জরুরি পাশে থাকা। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
ডিমেনশিয়ার সব কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মস্তিষ্কের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা, মানসিক ভাবে সক্রিয় থাকা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা- সবই গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমেনশিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় এখনও সম্ভব নয়। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন নিয়ে আগেভাগে পরিকল্পনা করতে পারেন। তাই ভারতের প্রবীণ সমাজের জন্য ডিমেনশিয়া মোকাবিলার প্রস্তুতি মানে শুধু চিকিৎসা নয়- সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং পরিবারের পাশে থাকা।
