নিউ ইয়র্কে প্রথমবারের মতো হদিশ মিলেছে বার্বন ভাইরাস (Bourbon Virus)-এর। আক্রান্ত হয়েছেন সাফোক কাউন্টির ৬৭ বছরের এক ব্যক্তি। বাইরে কাজ করার সময় রক্তচোষা ক্ষুদ্র পরজীবী, অর্থাৎ, লোন স্টার টিকের কামড়ে তিনি সংক্রমিত হয়েছেন বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
প্রথমে জ্বর, দুর্বলতা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখে লাইম ডিজিজ-সহ অন্যান্য পরিচিত রোগের চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আরও পরীক্ষা করা হলে ধরা পড়ে বার্বন ভাইরাসের সংক্রমণ। হাসপাতালে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
বার্বন ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের কারণ একটাই। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও কোনও অনুমোদিত টিকা নেই, নেই নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ, এমনকী সহজলভ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেই। ফলে উপসর্গ দেখা দিলেও অনেক সময় রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়।
যদিও বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ ব্যক্তি বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার নিতে পারে।
সতর্ক থাকুন। ছবি: সংগৃহীত
কী এই বার্বন ভাইরাস?
২০১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের বার্বন কাউন্টিতে প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে। এক ব্যক্তি একাধিক রক্তচোষা পরজীবীর কামড়ের পর রহস্যজনক জ্বরে মারা যান। অনুসন্ধানে নতুন এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সেই কাউন্টির নামেই ভাইরাসটির নাম রাখা হয় বার্বন ভাইরাস।
এটি থোগোটোভাইরাস গোষ্ঠীর সদস্য। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকলেও এটি বাতাসে বা একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না। সংক্রমণ হয় মূলত আক্রান্ত পরজীবীর কামড়ে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নথিভুক্ত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে। কারণ এর উপসর্গ অন্য রোগের সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল রোগ নির্ণয় হয়।
কী কী উপসর্গ দেখা দেয়?
- জ্বর
- প্রবল ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- মাথাব্যথা
- পেশি ও গাঁটে ব্যথা
- খিদে কমে যাওয়া
- বমি বমি ভাব বা বমি
- কিছু ক্ষেত্রে ত্বকে র্যাশ
সংক্রমণ গুরুতর হলে রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি লিভারের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
রোগ নির্ণয় এত কঠিন কেন?
বার্বন ভাইরাসের জন্য এখনও কোনও নির্দিষ্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। সাধারণত বিশেষ কিছু ল্যাবে এই পরীক্ষা করা হয়। ফলে চিকিৎসকেরা প্রথমে লাইম ডিজিজ বা অন্য কোনও পরিচিত পোকাবাহিত রোগের চিকিৎসাই শুরু করেন। রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে এবং পরীক্ষার রিপোর্টে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে তখন বার্বন ভাইরাসের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।
সংক্রমণের কারণ। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসা কী?
এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনও অনুমোদিত টিকা নেই। নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। রোগ সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার নির্দিষ্ট চিকিৎসাও নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখা। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন, জ্বর ও ব্যথা কমানোর ওষুধ, শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন এবং হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সংক্রমিত পোকার কামড়ে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। তবে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন—
- কৃষক বা কৃষিকাজে যুক্ত ব্যক্তিরা
- বাগান পরিচর্যা বা বাইরে কাজ করেন যাঁরা
- ট্রেকার বা শিকারিরা
- প্রবীণ ব্যক্তি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
- যেহেতু কোনও টিকা নেই, তাই পোকার কামড় এড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ
- দেশের সরকার অনুমোদিত কীটনাশক রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন
- বাইরে বেরনোর সময় লম্বা হাতা জামা, ফুলপ্যান্ট ও পা ঢাকা জুতো পরুন
- লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড় এড়িয়ে চলুন
- বাড়ি ফিরে শরীর, পোশাক বা পোষ্যের গায়ে কোনও পোকা আছে কি না ভালোভাবে পরীক্ষা করুন
- বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে যত দ্রুত সম্ভব স্নান করুন
- শরীরে পোকা আটকে থাকলে চিমটের সাহায্যে সাবধানে সরিয়ে ফেলুন
পোকার কামড়ের পর জ্বর, প্রবল ক্লান্তি, শরীরব্যথা বা ফ্লু-সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ বিরল হলেও বার্বন ভাইরাস দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে, আর এখনও পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা বা টিকা নেই।
