নরওয়ের ফুটবল তারকা আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland)-এর চোখে কমলা রঙের একটি চশমা। সাম্প্রতিক সময়ে সোশাল মিডিয়ায় এই ছবিই নতুন আলোচনার বিষয়। অনেকের ধারণা, এই চশমার নেপথ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর দুর্দান্ত ফিটনেস ও মাঠের অসাধারণ পারফরম্যান্সের রহস্য। কিন্তু সত্যিই কি ব্লু লাইট ব্লকিং গ্লাস রাতে ভালো ঘুম আনতে পারে? নাকি এটি শুধুই আরেকটি ভাইরাল ওয়েলনেস ট্রেন্ড?
হালান্ডের কাছে ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, পারফরম্যান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। তাই ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি নিয়ম করে ব্লু লাইট ব্লকিং চশমা পরেন। শুধু তিনিই নন, বিশ্বের বহু অলিম্পিয়ান, ফুটবলার এবং বাস্কেটবল খেলোয়াড়ও ঘুমের মান উন্নত করতে এই অভ্যাস অনুসরণ করেন। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের প্রকৃত পুনরুদ্ধার জিমে হয় না, হয় গভীর ঘুমের মধ্যেই।
আর্লিং হালান্ড। ছবি: সংগৃহীত
ব্লু লাইট আসলে কী?
ব্লু লাইট বা নীল আলো সূর্যের আলোতেই স্বাভাবিকভাবে থাকে। দিনের বেলা এই আলো আমাদের সজাগ রাখে, মনোযোগ বাড়ায় এবং শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
তবে রাতে এই একই আলো সমস্যার কারণ হতে পারে। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব বা টেলিভিশনসহ প্রায় সব ডিজিটাল স্ক্রিন থেকেই ব্লু লাইট নির্গত হয়। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে চোখ রাখলে মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামের 'ঘুমের হরমোন'-এর নিঃসরণ কমে যায় বা দেরিতে নিঃসরণ শুরু হয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়, আবার ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে।
কীভাবে কাজ করে ব্লু লাইট গ্লাস?
ব্লু লাইট ব্লকিং গ্লাসের বিশেষ লেন্স নীল আলোর একটি অংশ আটকে দেয়। এর ফলে সন্ধ্যের পর মস্তিষ্ক সহজে বুঝতে পারে যে শরীরকে এখন বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এতে স্বাভাবিকভাবে মেলাটোনিন নিঃসরণ শুরু হতে পারে এবং ঘুমানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়।
হালান্ডের মতো ক্রীড়াবিদদের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ গভীর ঘুমের সময় পেশি পুনর্গঠিত হয়, শরীরে শক্তি ফিরে আসে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং মস্তিষ্ক নতুন শেখা বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করে। তাই সামান্য ভালো ঘুমও পরের দিনের পারফরম্যান্সে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
সত্যিই উপকারী? ছবি: সংগৃহীত
সাধারণ মানুষেরও কি উপকার হবে?
হতে পারে, তবে অলৌকিক কোনও পরিবর্তনের আশা করা ঠিক নয়। যাঁরা রাত পর্যন্ত ল্যাপটপে কাজ করেন, শোবার আগে মোবাইল স্ক্রল করেন বা সিরিজ দেখে রাত জাগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্লু লাইট গ্লাস কিছুটা উপকারী হতে পারে। অনেকেই জানান, এটি ব্যবহার করলে তুলনামূলক দ্রুত ঘুম আসে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিষয়ে গবেষণার ফল এখনও একেবারে নিশ্চিত নয়। বেশ কয়েকটি বড় গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু ব্লু লাইট গ্লাস ব্যবহার করলেই সবার ঘুমের মান উন্নত হবে, এমন প্রমাণ এখনও মেলেনি। বরং এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয় যখন স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
শুধু চশমা নয়, বদলাতে হবে অভ্যাসও
হালান্ডের রুটিনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, শুধু একটি চশমাই তাঁর ভালো ঘুমের রহস্য নয়। তিনি নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যান, রাতের দিকে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলেন, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, শোবার ঘর ঠান্ডা ও অন্ধকার রাখেন এবং পর্যাপ্ত সময় ঘুমান। অর্থাৎ, ব্লু লাইট গ্লাস তাঁর পুরো ঘুমের রুটিনের একটি ছোট অংশ মাত্র।
শুধু চশমা পরলেই ঘুম ভালো হবে? ছবি: সংগৃহীত
তাহলে কি কিনবেন?
আপনার যদি রাতের বড় একটা সময় মোবাইল, ল্যাপটপ বা ট্যাবের সামনে কাটে, তাহলে ঘুমানোর ১ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে ব্লু লাইট গ্লাস ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এটি সাধারণত নিরাপদ এবং অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা উপকারও মিলতে পারে।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, রাত ২টো পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করে শুধু এই চশমা পরে ভালো ঘুমের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের সবচেয়ে কার্যকর উপায় এখনও খুবই সাধারণ, শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন, ঘরের আলো নিভিয়ে দিন, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন।
হালান্ডের ভাইরাল কমলা চশমা হয়তো নজর কেড়েছে, কিন্তু তাঁর রুটিনের আসল শিক্ষা একটাই, ভালো ঘুমকে প্রতিদিন অগ্রাধিকার দেওয়াই সুস্থ এবং ফিট শরীরের অন্যতম বড় চাবিকাঠি।
