ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নজর থাকে বিশ্বের সেরা তারকাদের দিকে। গোল, রেকর্ড, দুরন্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাপন, ফিটনেস রুটিন ও স্বাস্থ্য-অভ্যাসও হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়। এবার সেই তালিকায় উঠে এসেছে নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের (Erling Haaland) একটি অভ্যাস। ঘুমানোর সময় মুখে টেপ লাগান তিনি। এক সাক্ষাৎকারের ভিডিও ভাইরাল হতেই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে 'মাউথ টেপিং' ট্রেন্ড।
অনেকেরই বিশ্বাস, এই অভ্যাসেই নাকি লুকিয়ে আছে ভালো ঘুম, দ্রুত রিকভারি এবং ফিটনেস রহস্য। টেনিস তারকা ইগা শভিয়ন্তেকও ঘুমের সময় মুখে টেপ ব্যবহার করেন। ব্যস, 'মাউথ টেপিং' রাতারাতি পরিণত হয়েছে নতুন স্বাস্থ্য-ট্রেন্ডে। কিন্তু চিকিৎসক ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবটা এতটা সহজ নয়। বরং হালান্ডকে অনুকরণ করার আগে জানা জরুরি, এই পদ্ধতির পক্ষে বিজ্ঞানের প্রমাণ ঠিক কতটা।
মাউথ টেপিং আসলে কী?
মাউথ টেপিং বলতে ঘুমানোর সময় ঠোঁটের উপর বিশেষ ধরনের টেপ লাগিয়ে মুখ বন্ধ রাখা বোঝায়। এর উদ্দেশ্য একটাই, যাতে মুখের বদলে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া। নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কিছু প্রমাণিত উপকারিতা রয়েছে। নাক বাতাসকে ছেঁকে উষ্ণ করে এবং আর্দ্র করে ফুসফুসে পাঠায়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস তুলনামূলক ধীর ও নিয়ন্ত্রিত হয়, যা ঘুম ও বিশ্রামের সময় শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে এখানেই একটি বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া উপকারী মানেই মুখে টেপ লাগানোও সমান উপকারী, এমনটা নয়।
আর্লিং হালান্ড। ছবি: সংগৃহীত
গবেষণা কী বলছে?
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে মাউথ টেপিং ক্রীড়া দক্ষতা বাড়ায়, শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায় বা দ্রুত রিকভারিতে সাহায্য করে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই। এলিট অ্যাথলিটদের সাফল্যের পেছনে ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ফিজিওথেরাপি এবং মানসিক প্রস্তুতির মতো অসংখ্য বিষয় কাজ করে। তাই শুধু মুখে টেপ লাগানোর কারণে তাঁদের পারফরম্যান্স ভালো হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
ব্যায়ামের সময় মুখে টেপ লাগানো কি নিরাপদ?
অনেকেই এখন ব্যায়াম করার সময়ও মুখে টেপ লাগাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়। ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়লে শরীরের অক্সিজেনের চাহিদাও দ্রুত বেড়ে যায়। তখন নাকের পাশাপাশি মুখ দিয়েও শ্বাস নেওয়া শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। জোর করে মুখ বন্ধ রাখলে শ্বাসকষ্ট, অস্বস্তি এবং ব্যায়ামের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই অভ্যাস অনুসরণ করা উচিত নয়।
কারা একেবারেই এড়িয়ে চলবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের সমস্যাগুলির যেকোনও একটি থাকলে মাউথ টেপিং ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—
- হাঁপানি
- দীর্ঘদিনের অ্যালার্জি বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিস
- সাইনাসের সমস্যা
- নাক সবসময় বন্ধ থাকা
- নাকের হাড় বাঁকা (ডিভিয়েটেড সেপটাম)
- শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ
- অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া
- অতিরিক্ত নাক ডাকা বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া
এসব ক্ষেত্রে মুখে টেপ লাগালে সমস্যা কমার বদলে আরও বেড়ে যেতে পারে।
ঘুমের সময় মুখে টেপ! ছবি: সংগৃহীত
মুখে টেপ লাগালেই কি বদলে যাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস?
অনেকে মনে করেন, নিয়মিত মাউথ টেপিং করলে স্থায়ীভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমান গবেষণা এই দাবিকে সমর্থন করে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া কোনও রোগ নয়। এটি সাধারণত অন্য সমস্যার লক্ষণ। যেমন নাক বন্ধ, অ্যালার্জি, স্লিপ অ্যাপনিয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের ভুল কৌশল, ডায়াফ্রামের দুর্বলতা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু মুখে টেপ লাগানো দীর্ঘমেয়াদে কোনও কার্যকর সমাধান নয়।
হালান্ডকে অনুকরণ করার আগে যা জানা জরুরি
হালান্ড বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদরা নিয়মিত চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, ঘুম বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের তত্ত্বাবধানে থাকেন। তাঁদের শরীরের অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত অভ্যাস সবার জন্য সমান নিরাপদ হবে, এমন ধারণা ভুল।
যাঁদের নাক ডাকার সমস্যা রয়েছে, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, সকালে উঠে অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগে বা মাথাব্যথা হয়, তাঁদের আগে ইএনটি বা স্লিপ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
মাউথ টেপিং এখন সোশাল মিডিয়ার অন্যতম আলোচিত স্বাস্থ্য-ট্রেন্ড। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর জনপ্রিয়তা যত দ্রুত বেড়েছে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ততটা শক্তিশালী নয়। ভালো ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনে সঠিক শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনই এখনও সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
