ঋতুস্রাব কয়েক দিন দেরিতে হলেই অনেক নারী ধরে নেন, এর জন্য দায়ী মানসিক চাপ। অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব বা ব্যক্তিগত উদ্বেগ, সব কিছুর প্রভাবই শরীরের উপর পড়ে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, স্ট্রেস ঋতুচক্রে প্রভাব ফেললেও সেটিই সব সময় একমাত্র কারণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র ব্যথা শরীরের কোনও গুরুতর সমস্যার প্রথম সংকেত হতে পারে।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কথায়, ঋতুচক্রের পরিবর্তনের নেপথ্যে থাকতে পারে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), জরায়ুর অন্য কোনও অসুখ বা অন্যান্য প্রজনন-সংক্রান্ত জটিলতা। তাই শুধুমাত্র স্ট্রেসকে দায়ী করে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
স্ট্রেসের প্রভাব আছে, তবে সব দায় তার নয়
মানসিক চাপ শরীরের সেই হরমোনগুলির উপর প্রভাব ফেলে, যেগুলি ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মাসিক কিছুটা এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে। তবে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে থাইরয়েডের সমস্যা, হরমোনজনিত গোলমাল, পিসিওএস বা জরায়ুর গঠনগত সমস্যার কারণেও। তাই প্রকৃত কারণ জানা না গেলে সঠিক চিকিৎসাও সম্ভব নয়।
তীব্র ব্যথা হতে পারে অন্য কোনও রোগের ইঙ্গিত। ছবি: সংগৃহীত
বয়স জানলেই মিলতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণ খুঁজতে চিকিৎসকেরা প্রথমেই রোগীর বয়স ও ঋতুচক্রের ইতিহাস জানতে চান। ১৮ বছরের আগেই যদি ঋতুচক্রে অনিয়ম শুরু হয়, অথবা ৪৫ বছরের পর হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দেয়, তার কারণ ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে মেনোপজের আগের সময়ে হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামার জন্যও মাসিকের ধরণ বদলে যেতে পারে।
এ ছাড়াও চিকিৎসকেরা খোঁজ নেন, আগের তুলনায় রক্তপাত বেড়েছে কি না, মাসিকের ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠেছে কি না বা নিয়মিত ঋতুচক্র হঠাৎ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে কি না। এই পরিবর্তনগুলি অনেক সময় জরায়ুর গঠনগত সমস্যা বা হরমোনের অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়।
অতিরিক্ত রক্তপাতকে কখনও স্বাভাবিক ভাববেন না
অনেক নারীই অতিরিক্ত রক্তপাতকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, যদি প্রতি এক থেকে দু'ঘণ্টার মধ্যে একটি স্যানিটারি প্যাড পুরোপুরি ভিজে যায় বা বড় আকারের রক্তের জমাট বের হয়, তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন চললে শরীরে রক্তের ঘাটতি তৈরি হয়ে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তীব্র ব্যথা বা তলপেটে গাঁট? হতে পারে জরায়ুর অসুখ
মাসিকের সময় অসহনীয় তলপেটের ব্যথা, তলপেটে গাঁট অনুভব হওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকলে তা ফাইব্রয়েড, অ্যাডেনোমায়োসিস বা ডিম্বাশয়ের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
অন্যদিকে পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় মুখ বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো, বারবার ব্রণ হওয়া, দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন মাসিক না হওয়ার মতো উপসর্গ। অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক মাস ঋতুস্রাব বন্ধ থাকার পর হঠাৎ অত্যধিক রক্তপাতও হতে পারে।
জরুরি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ। ছবি: সংগৃহীত
জীবনযাপনের অভ্যাসও প্রভাব ফেলে
স্ট্রেস ছাড়াও আরও অনেক কারণ ঋতুচক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, থাইরয়েডের সমস্যা, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া, স্থূলতা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস। তাই সমস্যার কারণ খুঁজতে চিকিৎসকেরা জীবনযাত্রার নানা দিক খতিয়ে দেখেন।
গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পরের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা জানতে চান গর্ভধারণের সম্ভাবনা আছে কি না, সম্প্রতি সন্তান জন্মেছে কি না বা শিশুকে স্তন্যপান করান কি না। কারণ এই সময় শরীরে হওয়া স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের জন্যও ঋতুচক্র সাময়িকভাবে বদলে যেতে পারে। মেনোপজের কাছাকাছি বয়সে জরায়ুর ভেতরে জন্মনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও তার প্রভাব ঋতুচক্রে পড়তে পারে।
অনিয়মিত? অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
কী কী পরীক্ষা করতে হতে পারে?
অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি কিছু রক্তপরীক্ষা ও ইমেজিং টেস্টের পরামর্শ দেন। এর মধ্যে থাকতে পারে হিমোগ্লোবিন, থাইরয়েড ফাংশন, রক্তে শর্করা, ফাস্টিং ইনসুলিন, প্রয়োজন হলে গর্ভধারণ পরীক্ষা এবং পেলভিক আলট্রাসোনোগ্রাফি। আলট্রাসোনোগ্রাফিতে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই-সহ আরও কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
মাঝেমধ্যে মাসিকের তারিখ কয়েক দিন এদিক-ওদিক হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বারবার ঋতুচক্র অনিয়মিত হওয়া, অতিরিক্ত রক্তপাত, অসহনীয় ব্যথা, দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ব্রণ, শরীরে অস্বাভাবিক লোম গজানো বা তলপেটে ব্যথা থাকলে তা কখনও অবহেলা করা উচিত নয়।
স্ট্রেসের দোহাই দিয়ে সমস্যাকে দীর্ঘদিন চেপে না রেখে সময়মতো স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে রোগের প্রকৃত কারণ দ্রুত ধরা পড়ে। আর যত তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় হবে, তত দ্রুত শুরু করা যাবে সঠিক চিকিৎসা।
