সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ। একের পর এক মিটিং, ডেডলাইন, ফোন কল। দিনের শেষে হঠাৎ মনে হয়, হাতে যেন আগের মতো জোর নেই। কলমটা ঠিকমতো ধরা যাচ্ছে না, কফির মগ তুলতেও কষ্ট হচ্ছে। আবার কারও কারও হাতের তালু এমনভাবে ঘেমে যায় যে কিবোর্ডে টাইপ করা বা মোবাইলের স্ক্রিনে স্পর্শ করাও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
বেশিরভাগ সময়ই এসব লক্ষণকে কাজের চাপ, মানসিক উদ্বেগ বা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব বলে ধরে নিই। কিন্তু এই সমস্যাগুলো যদি বারবার ফিরে আসে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে সেগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ অনেক সময় এগুলো স্নায়ুতন্ত্রের কোনও অন্তর্নিহিত সমস্যার প্রথম সংকেত হতে পারে।
সারাক্ষণ কম্পিউটারে কাজ? ছবি: সংগৃহীত
সাধারণ উপসর্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় সমস্যা
অনেকে দীর্ঘদিন ধরে হাতের দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ঘামকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে উপেক্ষা করেন। কিন্তু কিছু স্নায়বিক রোগের শুরুই হয় এমন আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ উপসর্গ দিয়ে। সময়মতো কারণ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়।
হাতের দুর্বলতার নেপথ্যে কারণ কী?
হাতের দুর্বলতা সাধারণত আচমকা দেখা দেয় না। প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন চোখে পড়ে। আগে যেটা সহজে করা যেত, সেটাই ধীরে ধীরে কঠিন মনে হতে শুরু করে। বাজারের ব্যাগ তুলতে কষ্ট হয়, বোতলের ঢাকনা খুলতে সমস্যা হয় বা একটি হাত অন্য হাতের তুলনায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই সমস্যার উৎস অনেক সময় পেশিতে নয়, বরং ঘাড় থেকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত স্নায়ুগুলোতে। মেরুদণ্ডের সার্ভাইক্যাল অংশ থেকে বের হওয়া স্নায়ুগুলোতে কোনও কারণে চাপ পড়লে বা ক্ষতি হলে হাতে শক্তি কমে যেতে পারে।
হাতে ব্যথা বা দুর্বলতা? ছবি: সংগৃহীত
আধুনিক কর্মজীবনের প্রভাব
আজকের কর্মজীবনে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার বা ল্যাপটপ সামনে ঝুঁকে বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে বসা, একই ধরনের হাতের কাজ বারবার করা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা নড়াচড়া না করার অভ্যাস ঘাড় ও উপরের মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ বজায় থাকলে তা স্নায়ুর উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু দুর্বলতা নয়, আরও কিছু লক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ
হাতের দুর্বলতার সঙ্গে যদি ঘাড় থেকে কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, ঝিনঝিনি অনুভূতি, অবশভাব বা সূঁচ ফোটার মতো অনুভূতি থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এসব উপসর্গ চিকিৎসকদের কাছে স্নায়ুজনিত সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
হাতের তালু অতিরিক্ত ঘামছে? এটিও হতে পারে স্নায়ুর সংকেত
অনেকেই হাতের তালু ঘেমে যাওয়াকে শুধুই দুশ্চিন্তা বা নার্ভাসনেসের ফল বলে মনে করেন। বাস্তবে মানসিক চাপ এর একটি কারণ হলেও, সব ক্ষেত্রে তা নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পালমার হাইপারহাইড্রোসিস নামে পরিচিত এই সমস্যার পেছনে কখনও কখনও সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের অতিসক্রিয়তাও দায়ী থাকতে পারে। ফলে শুধু অস্বস্তিই নয়, গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা, গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করা, করমর্দন বা টাচস্ক্রিন ব্যবহার করার মতো দৈনন্দিন কাজও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তালু ঘামছে? ছবি: সংগৃহীত
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি হাতের দুর্বলতা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, হঠাৎ করে শুরু হয় বা এর সঙ্গে ঘাড়ে ব্যথা, অবশভাব, শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা সমন্বয়ের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সময়মতো চিকিৎসাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
সবসময় হাতের দুর্বলতা বা হাত ঘেমে যাওয়ার পেছনে গুরুতর অসুখ থাকে না। তবে কারণটি সঠিকভাবে নির্ণয় করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই ফিজিওথেরাপি, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, সঠিক ভঙ্গিতে কাজ করার অভ্যাস, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা বিশেষ কোনও থেরাপির মাধ্যমে সমস্যার সফল সমাধান সম্ভব।
শরীর কখনও হঠাৎ করে বিপদের মুখে ঠেলে দেয় না। তার আগে ছোট ছোট সংকেত পাঠায়। সেই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
