shono
Advertisement
Diet and Weight Loss Medicine

ওষুধে কমছে ওজন, ডায়েট কি তবে অতীত? ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ

ওজন কমানোর পথে নতুন আশার আলো GLP-1 RA। তা হলে কি ডায়েটের অধ্যায় শেষ? খিদে কমিয়ে দেওয়া এই আধুনিক ওষুধ কি একাই লিখে দিতে পারে সুস্থতার গল্প, না কি সেই গল্পের পাতায় এখনও সমান গুরুত্ব নিয়ে রয়ে গেছে সুষম খাদ্য ও পুষ্টির ছোঁয়া?
Published By: Pritimoy Roy BurmanPosted: 02:31 PM Jun 26, 2026Updated: 02:31 PM Jun 26, 2026

স্থূলতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে GLP-1 RA (Glucagon-Like Peptide-1 Receptor Agonist) শ্রেণির ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরের ওজন কমাতেও এই ইনজেকশনগুলির কার্যকারিতা আজ প্রমাণিত। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বাজারে সেমাগ্লুটাইড, লিরাগ্লুটাইড, টিরজেপাটাইড এবং ডুলাগ্লুটাইডের মতো একাধিক GLP-1 ওষুধ এসেছে। ফলে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—- যখন ওষুধই খিদে কমিয়ে ওজন কমাতে সাহায্য করছে, তখন কি ডায়েটের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে? উত্তর হল, ‘না’। বরং এই ওষুধ ব্যবহারের সময় সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ানের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Advertisement

GLP-1 RA কী এবং কীভাবে কাজ করে?
GLP-1 RA এমন এক ধরনের ওষুধ, যা শরীরের স্বাভাবিক GLP-1 হরমোনের কার্যকারিতা অনুকরণ করে। খাবার খাওয়ার পর এই হরমোন অগ্ন্যাশয়কে ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে এবং লিভার থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্তে মেশা কমায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই ওষুধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ‘স্লো গ্যাস্ট্রিক এম্পটিং’ বা পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি ধীর করে দেওয়া। পাশাপাশি এটি মস্তিষ্কের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে কাজ করে খিদে কমায় এবং তৃপ্তির অনুভূতি বাড়ায়। ফলে রোগী কম খাবার খেয়েও দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভব করেন।

GLP-1: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

ডায়েটিশিয়ানের ভূমিকা কেন অপরিহার্য?
অনেকেই মনে করেন, GLP-1 RA শুরু করার পর আর আলাদা করে খাদ্যনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উলটো। খিদে কমে যাওয়ার কারণে অনেক রোগী প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার খেতে শুরু করেন। এতে শরীরে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল এবং প্রয়োজনীয় ক্যালরির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একজন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান রোগীর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করেন। এর ফলে ওজন কমলেও শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে এবং দুর্বলতা, ক্লান্তি বা পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকি কমে।

কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত?
GLP-1 RA ব্যবহারের সময় এমন খাবার বেছে নিতে হবে যা সহজপাচ্য, পুষ্টিকর এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাতে সক্ষম। খাদ্যতালিকায় সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করা মাছ, চামড়াবিহীন মুরগির মাংস, ডিমের সাদা অংশ, ডাল, টক দই এবং পনিরের মতো উচ্চমানের প্রোটিন রাখা যেতে পারে। কার্বোহাইড্রেটের ক্ষেত্রে সাদা চাল, ময়দার বদলে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট লাল চাল, ওটস, সুজি এবং লাল আটার রুটি বেছে নেওয়া ভালো। পাশাপাশি মরসুমি ফল এবং সবুজ শাকসবজি শরীরকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল এবং ফাইবার সরবরাহ করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট, প্রসেসড ফুড, সফট ড্রিংকস এবং অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।

ওজন নিয়ন্ত্রণে ডায়েটেশিয়ানের ভূমিকা অপরিহার্য

তেল কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
ওজন কমানোর চেষ্টায় অনেকেই তেলকে সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে চান। কিন্তু শরীরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্যকর ফ্যাট প্রয়োজন। ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে-এর মতো ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিন শোষণের জন্য তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে তেল মানেই ভাজাভুজি নয়। অল্প পরিমাণ তেল রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন ডায়েটিশিয়ান ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিদিন কতটা তেল গ্রহণ করা উচিত তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা
GLP-1 RA ব্যবহারের ফলে অনেকের বমিভাব, গ্যাস, পেট ফাঁপা, ডায়েরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেহেতু ওষুধটি হজমের গতি কমিয়ে দেয়, তাই এসব উপসর্গ অস্বাভাবিক নয়। পর্যাপ্ত জলপান, সঠিক পরিমাণ ফাইবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চা এই সমস্যাগুলি কমাতে সাহায্য করে। সাধারণভাবে দিনে আড়াই থেকে তিন লিটার জল পান করা এবং সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

শুরুতেই বেশি প্রোটিন কেন নয়?
বর্তমানে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে উচ্চ-প্রোটিন ডায়েট খুব জনপ্রিয়। কিন্তু GLP-1 RA শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া সব সময় উপকারী নাও হতে পারে। কারণ এই ওষুধ পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি কমিয়ে দেয় এবং প্রোটিন এমনিতেই ধীরে হজম হয়। ফলে শুরুতেই প্রচুর মাংস, মাছ, ডিম বা প্রোটিন শেক খেলে বদহজম, বমিভাব বা পেটে অস্বস্তি বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রথম কয়েকদিন হালকা ও সহজপাচ্য খাবার দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোই ভালো।

ডায়েট ভুললে চলবে না

খুব কম ক্যালরি ডায়েটের ঝুঁকি
খিদে কমে যাওয়ার কারণে অনেক রোগী অজান্তেই অত্যন্ত কম ক্যালরিযুক্ত ডায়েট অনুসরণ করতে শুরু করেন। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে। অত্যধিক কম ক্যালরি গ্রহণের ফলে গলস্টোন, ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি, পেশি ক্ষয় এবং অপুষ্টির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলেও কখনওই নিজের ইচ্ছেমতো খাবার কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরি গ্রহণ এবং পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

মনে রাখুন
GLP-1 RA নিঃসন্দেহে স্থূলতা এবং ডায়াবেটিস চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী সংযোজন। তবে এই ওষুধ কোনও জাদুকাঠি নয়। ওজন কমানোর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শের উপর। তাই GLP-1 RA শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ ওজন কমানোর যাত্রায় ওষুধ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সঠিক ডায়েটও ঠিক ততটাই অপরিহার্য।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement