মাত্র ৩৩ বছর বয়সে প্রয়াত প্রাক্তন বক্সার প্রিচার্ড কলন। ২০১৫ সালে রিংয়ের ভিতরে পাওয়া ভয়াবহ মাথার আঘাতের পর থেকেই তাঁর জীবন আর আগের মতো ছিল না। একটি বক্সিং ম্যাচ, কয়েকটি গুরুতর আঘাত এবং তারপর দীর্ঘ ১১ বছরের লড়াই। শেষ পর্যন্ত থেমে গেল সেই লড়াই।
প্রিচার্ড কলনের মৃত্যু নতুন করে সামনে এনেছে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি বা মাথার আঘাতের ভয়াবহতা। মাথায় আঘাত লাগার পর বাইরে থেকে সবসময় ক্ষত দেখা যায় না। কিন্তু খুলির ভিতরে রক্তক্ষরণ বা মস্তিষ্কে ফোলাভাব তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
কী ঘটেছিল প্রিচার্ড কলনের?
২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্সে টেরেল উইলিয়ামসের বিরুদ্ধে বক্সিং ম্যাচে নামেন কলন। ম্যাচ চলাকালীন তাঁর মাথার পিছনে বারবার আঘাত লাগে। কলন রেফারির কাছে এই আঘাত নিয়ে অভিযোগও করেছিলেন।
বক্সিংয়ে মাথার পিছনে এ ধরনের আঘাতকে ‘র্যাবিট পাঞ্চ’ বলা হয়। এই ধরনের আঘাত নিয়মবিরুদ্ধ, কারণ মাথার পিছনে ও ঘাড়ের উপরের অংশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক কাঠামোতে জোরালো আঘাত গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।
বক্সিং রিংয়ে। ছবি: সংগৃহীত
নবম রাউন্ডে কলন দু’বার মাটিতে পড়ে যান। ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। তিনি বমি করে অচেতন হয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তাঁর মস্তিষ্কে সাবডিউরাল হেমাটোমা হয়েছে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের আবরণ ও মস্তিষ্কের মাঝের জায়গায় রক্ত জমেছে। সেই রক্ত মস্তিষ্কের উপর চাপ তৈরি করছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হয়নি। কলন ২২১ দিন কোমায় ছিলেন। জ্ঞান ফেরার পরও তাঁর গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা থেকে যায়। দীর্ঘদিন পরিবারের সদস্যদের সাহায্য ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয়েছিল।
ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি কী?
মাথায় হঠাৎ জোরালো আঘাত, ধাক্কা বা তীব্র ঝাঁকুনির কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলে তাকে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি বলা হয়।
বক্সিংয়ের মতো খেলায় বারবার মাথায় আঘাত লাগলে মস্তিষ্ক খুলির ভিতরে দ্রুত সামনে-পিছনে বা একদিকে থেকে অন্যদিকে নড়ে যেতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে অথবা মস্তিষ্কে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
মাথার আঘাত বদলে দেয় জীবন। ছবি: সংগৃহীত
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
মাথায় গুরুতর আঘাতের পর যে লক্ষণগুলিকে অবহেলা করা উচিত নয়-
- তীব্র বা বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
- বারবার বমি
- মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
- বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ
- স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা
- অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা জ্ঞান হারানো
- শরীরের কোনও অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
- কথা বলতে সমস্যা
- খিঁচুনি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আঘাতের পর প্রথমে রোগী স্বাভাবিক দেখালেও বিপদ কেটে গিয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা ফোলাভাব সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে। ফলে কয়েক ঘণ্টা পরেও অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
কেন মস্তিষ্কের আঘাত এত বিপজ্জনক?
মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ বা ফোলাভাব হলে খুলির ভিতরে জায়গা খুব সীমিত। ফলে অতিরিক্ত রক্ত বা ফোলা মস্তিষ্কের উপর চাপ তৈরি করে। এই চাপ বাড়তে থাকলে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মস্তিষ্কের কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে রোগীর কথা বলা, হাঁটা, স্মৃতি, সচেতনতা এমনকী শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও নষ্ট হতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে জমে থাকা রক্ত সরাতে বা মস্তিষ্কের উপর চাপ কমাতে জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অস্ত্রোপচার করলেই যে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে পক্ষাঘাত, স্মৃতিশক্তির সমস্যা, খিঁচুনি, চলাফেরায় অসুবিধা বা আচরণগত পরিবর্তন থেকে যেতে পারে।
চিকিৎসা-চলাকালীন সময়। ছবি: সংগৃহীত
প্রিচার্ড কলনের ঘটনা কী শেখায়?
প্রিচার্ড কলনের মৃত্যু শুধু একজন বক্সারের কেরিয়ার থেমে যাওয়ার গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, মাথায় আঘাতকে কখনও সাধারণ চোট হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে মাথায় জোরালো আঘাতের পর বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
রিংয়ের কয়েক মিনিটের ঘটনা প্রিচার্ড কলনের জীবনের পরবর্তী ১১ বছরকে বদলে দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, মস্তিষ্কের আঘাতের প্রভাব শুধু সেই মুহূর্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে তার ছাপ থেকে যেতে পারে বছরের পর বছর, কখনও বা সারাজীবন।
