মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ধরা পড়ে অ্যাজমা। শ্বাসকষ্টের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে সঙ্গী করেই বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই রোগ কখনও তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বলিউড থেকে হলিউড, আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিশ্বসুন্দরীর মুকুট, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের সাফল্যের ছাপ রেখেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।
অভিনেত্রী বহুবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি অ্যাজমায় ভুগছেন। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প নয়, বরং লাখো মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। অ্যাজমা মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। সময়মতো রোগ ধরা পড়া, নিয়মিত চিকিৎসা, ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার এবং কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে এই রোগ নিয়েও স্বাভাবিক, সুস্থ ও কর্মব্যস্ত জীবন কাটানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ অ্যাজমায় আক্রান্ত। অথচ এখনও এই রোগ নিয়ে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, অ্যাজমা শুধু শিশুদের রোগ, ইনহেলার ব্যবহার করলে নেশা হয়ে যায় বা হাঁপানি থাকলে শরীরচর্চা করা উচিত নয়। এই ধরনের ভুল ধারণার কারণেই অনেক সময় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
'বারাণসী' ছবিতে প্রিয়াঙ্কা। ছবি: সংগৃহীত
অ্যাজমা আসলে কী?
অ্যাজমা হল শ্বাসনালির দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত একটি রোগ। এতে শ্বাসনালির ভেতরে প্রদাহ তৈরি হয় এবং তা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ধুলো, ধোঁয়া, ঠান্ডা হাওয়া, পরাগরেণু বা অন্য কোনও ট্রিগারের সংস্পর্শে এলেই শ্বাসনালির চারপাশের পেশি সঙ্কুচিত হয়ে যায়, শ্লেষ্মা বেড়ে যায় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
এটি কোনও সাময়িক সংক্রমণ নয়। অ্যাজমা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যার সম্পূর্ণ নিরাময় না থাকলেও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?
অ্যাজমার উপসর্গ ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলি হল—
- শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ
- বারবার বা দীর্ঘদিনের কাশি, বিশেষ করে রাতে
- শ্বাসকষ্ট
- বুকে চাপ বা ভারী লাগা
- হাঁটা, দৌড়ানো বা সিঁড়ি ভাঙার সময় দ্রুত হাঁপিয়ে যাওয়া
এই উপসর্গগুলিকে অবহেলা করা উচিত নয়। গুরুতর ক্ষেত্রে অ্যাজমার তীব্র আক্রমণ প্রাণঘাতীও হতে পারে।
অ্যাজমা কোনও বাধা নয়। ছবি: সংগৃহীত
অ্যাজমা নিয়ে প্রচলিত ৪টি ভুল ধারণা
ভুল ধারণা ১
অ্যাজমা শুধু শিশুদের রোগ
অনেকেরই ছোটবেলায় অ্যাজমা ধরা পড়ে। তবে এই রোগ যে কোনও বয়সে প্রথমবার দেখা দিতে পারে। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও বারবার শ্বাসকষ্ট বা কাশিকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ভুল ধারণা ২
অ্যাজমা থাকলে শরীরচর্চা করা যাবে না
এই ধারণাও ভুল। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিয়মিত শরীরচর্চা ফুসফুসকে আরও কার্যকর রাখতে সাহায্য করে। বিশ্বের বহু ক্রীড়াবিদ ও শিল্পী অ্যাজমা নিয়েই সফলভাবে নিজের কাজ করে চলেছেন।
ভুল ধারণা ৩
ইনহেলার ব্যবহার করলে নেশা হয়ে যায়
এটি সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি। অ্যাজমায় ইনহেলার কোনওভাবেই নেশা তৈরি করে না। বরং শ্বাসনালির প্রদাহ কমাতে এবং হঠাৎ শ্বাসকষ্টের সময় দ্রুত আরাম দিতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
ভুল ধারণা ৪
অ্যাজমা পুরোপুরি সেরে যায়
সঠিক ওষুধ, ইনহেলার এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগটিকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক রোগীই কোনও বড় সমস্যা ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।
অ্যাকশন মুডে। ছবি: সংগৃহীত
কী কী কারণে অ্যাজমা বাড়তে পারে?
সব রোগীর ক্ষেত্রে কারণ এক নয়। তবে সাধারণভাবে যে বিষয়গুলো অ্যাজমার উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে, সেগুলি হল—
- ধুলো বা ডাস্ট, মাইট
- ফুলের পরাগরেণু
- পোষ্য প্রাণীর লোম
- বায়ুদূষণ
- সিগারেটের ধোঁয়া
- ভাইরাসজনিত শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ
- ঠান্ডা হাওয়া
- তীব্র সুগন্ধি বা রাসায়নিকের গন্ধ
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম
- মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
নিজের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সমস্যা বাড়ায়, তা বুঝতে পারলে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় অ্যাজমা?
অ্যাজমার চিকিৎসা রোগীর উপসর্গের তীব্রতার উপর নির্ভর করে। সাধারণত চিকিৎসকেরা প্রতিদিনের জন্য প্রতিরোধমূলক ইনহেলার, প্রয়োজন হলে দ্রুত আরামদায়ক ইনহেলার, অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ট্রিগার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত ফলো-আপের পরামর্শ দেন।
একটি বিষয় সবসময় মনে রাখা জরুরি। উপসর্গ কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনও ইনহেলার বা ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
কাটুক মিথ। শিশুদের জন্য নিরাপদ। ছবি: সংগৃহীত
অ্যাজমা থাকলেই জীবন থেমে যায় না
প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার জীবন সেই কথাটাই বলে। ছোটবেলা থেকেই অ্যাজমার সঙ্গে লড়াই করেও তিনি নিজের স্বপ্নপূরণে কখনও পিছিয়ে যাননি। তাই হাঁপানি ধরা পড়লেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই। প্রয়োজন সচেতনতা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং নিজের শরীরের প্রতি যত্ন।
তবে বারবার কাশি, শ্বাসকষ্ট, শোঁ শোঁ শব্দ বা বুকে চাপ অনুভব করলে তা কখনও অবহেলা করবেন না। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, আর তাতেই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
