প্রাক্তন আফগান পেসার শাপুর জাদরান (Shapoor Zadran) আর নেই। জন্মদিনের মাত্র একদিন আগে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে প্রাণ কাড়ল বিরল অসুখ হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ)। শোকস্তব্ধ ক্রিকেট দুনিয়া। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দিল্লির একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। জাদরানের মৃত্যু শুধু এক ক্রিকেটারের বিদায় নয়, এটি এমন এক বিরল রোগ, যার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই কম।
আফগান ক্রিকেট ইতিহাসে শাপুর জাদরানের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের হয়ে তিনি ৪৪টি একদিনের আন্তর্জাতিক এবং ৩৬টি টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৮০টি উইকেট। নিজের গতিময় বোলিং দিয়ে তিনি আফগানিস্তানের বিশ্ব ক্রিকেটে উত্থানের অন্যতম ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন।
এইচএলএইচ কী?
হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ) অত্যন্ত বিরল এক প্রাণঘাতী রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। স্বাভাবিক অবস্থায় ইমিউন সিস্টেম সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং কাজ শেষ হলে শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু এইচএলএইচ-এ সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাই অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে সুস্থ কোষ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করতে শুরু করে।
এর ফলে সারা শরীরে তীব্র প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত লিভার, প্লীহা, ফুসফুস, কিডনি, হার্ট এবং মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ক্ষতি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই রোগ কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের ব্যবধান। রোগ শয্যায় জাদরান। ছবি: সংগৃহীত
এইচএলএইচ কত ধরনের?
এইচএলএইচ মূলত দু'ধরনের।
প্রাইমারি বা জিনগত: এটি বংশগত এবং সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।
সেকেন্ডারি: ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, লিম্ফোমার মতো ক্যানসার, অটোইমিউন রোগ বা অন্যান্য রোগ প্রতিরোধজনিত সমস্যার কারণে এটি হতে পারে। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?
এইচএলএইচ-এর উপসর্গ অনেকটাই সাধারণ সংক্রমণ বা রক্তের রোগের মতো হওয়ায় রোগ নির্ণয়ে প্রায়ই দেরি হয়। তবে নিচের লক্ষণগুলি একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি-
- দীর্ঘদিন ধরে ১০২-১০৩ ডিগ্রি বা তার বেশি জ্বর
- প্রচণ্ড দুর্বলতা ও অবসাদ
- লিভার বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া
- ঘাড়, বগল বা কুঁচকির লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
- রক্তে লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও প্লেটলেট কমে যাওয়া
- শরীরে র্যাশ
- অকারণে রক্তক্ষরণ বা সহজে কালশিটে পড়া
- জন্ডিস
- গুরুতর ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা স্নায়বিক সমস্যা
রোগ নিশ্চিত করতে রক্ত পরীক্ষা, বোন ম্যারো পরীক্ষা, সিটি বা এমআরআই স্ক্যান এবং বিশেষ ইমিউনোলজিক্যাল পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত
কেন এত বিপজ্জনক?
এইচএলএইচ-এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল 'সাইটোকাইন স্টর্ম'। এই অবস্থায় শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পদার্থ (সাইটোকাইন) নিঃসৃত হয়। ফলে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে রক্ষার বদলে ক্ষতি করতে শুরু করে। এর ফলে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, রক্ত জমাট বাঁধার মতো জটিলতা, গুরুতর সংক্রমণ এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর চিকিৎসা কী?
এইচএলএইচ-এর চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল অতিসক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং যে কারণে রোগটি হয়েছে, তার চিকিৎসা করা। চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতে পারে-
- কর্টিকোস্টেরয়েড
- ইটোপোসাইডের মতো কেমোথেরাপির ওষুধ
- ইমিউনোথেরাপি
- ইনট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন
- টার্গেটেড বায়োলজিক ওষুধ
- প্রয়োজন হলে বোন ম্যারো বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন
রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগের তীব্রতা এবং এইচএলএইচ-এর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।
শাপুর জাদরানের মৃত্যু শুধু আফগান ক্রিকেটের নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেরও বড় ক্ষতি। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যু মনে করিয়ে দিল, বিরল হলেও এইচএলএইচ এমন এক রোগ, যা দ্রুত শনাক্ত না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন জ্বর, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা রক্তের পরীক্ষায় একাধিক অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
